ক্রীড়াঙ্গনে শুরু হয়েছে সংস্কার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তরুণ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া গঠন করেছেন সার্চ কমিটি। যার নেতৃত্বে আছেন সাবেক ব্যাডমিন্টন তারকা জোবায়েদুর রহমান রানা। সার্চ কমিটির নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দ’র কাছে বলেছেন অনেক কথা
ব্যাডমিন্টনের রানাকে এখন সমগ্র ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। এত বড় কাজ কতটা উপভোগ করছেন?
জোবায়েদুর রহমান রানা : ভীষণ উপভোগ করছি। প্রতিদিনই কিছু না কিছু চ্যালেঞ্জ আসছে। আমরা ফুল টিম বেশ উপভোগ করছি। এটা গবেষণা করার মতো একটা ব্যাপার।
সার্চ কমিটি বেশ কিছুদিন ধরে ক্রীড়াঙ্গন সংস্কারে রূপরেখা তৈরিতে কাজ করছে। একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। কমিটির প্রধান হিসেবে সেই অভিজ্ঞতাটাই জানতে চাই।
রানা : এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। আগে তো অল্প কিছু ফেডারেশন সম্পর্কে ধারণা ছিল। এখন সব কিছু নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। আসলে এটা অনেক বড় একটা জায়গা। এখানে ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ আছে, একেবারেই ভিন্ন একটা জায়গা। ভালো লাগছে। অনেক নতুন কিছু জানছি, শিখছি। এখানে অনেক সমস্যা আছে। এই সমস্যাগুলো নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটা ভালো জায়গায় আনাই আমাদের দায়িত্ব।
কাজ করার ক্ষেত্রে নিশ্চয় অনেক রকম বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে? কীভাবে এগুলো মোকাবিলা করছেন?
রানা : খুব যে বাধা আসছে তা নয়। তবে কিছুটা তো মতভেদ থাকবেই। আমরা হয়তো ভাবছি এটা সঠিক। আবার কিছু মানুষ হয়তো মনে করবে এটা সঠিক নয়। কাজ করার ক্ষেত্রে তাই সমালোচনা
থাকবেই। আমি মনে করি সমালোচনা থাকতেই হবে। একেকজনের কাজের একটা ধরন থাকে। আমরা হয়তো একটা কৌশলে কাজ করছি। আবার আপনি হয়তো সেটা সঠিক মনে নাও করতে পারেন। এখন আমাদের কাজ হচ্ছে এই দুই ভাবনার মাঝামাঝি থেকে মঙ্গলজনক দিকটাই বের করে আনা। আমরা সবার কথা শুনতে চেষ্টা করছি। আমি একেবারেই বলতে রাজি না যে আমরা যেটা বলছি সেটাই সঠিক। সবার সঙ্গে কথা বলার, মতবিনিময় করার চেষ্টা করছি।
কাজের সুবিধার্থেই কি ফেডারেশনগুলোর সভাপতিদের অব্যাহতি দেওয়া? নাকি এর সঙ্গে সার্চ কমিটির কোনো সংযুক্তি নেই?
রানা : আসলে সংযুক্তি নেই এটা বলব না। বেশিরভাগ ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন সরকার মনোনীত এবং তাদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগসূত্র ছিল। ফলে অনেক প্রভাবও ছিল। পটপরিবর্তনের পর তো অনেক ফেডারেশনের সভাপতি পদত্যাগ করেছেন, অনেকে অনুপস্থিত। এর মধ্যে অনেক সাধারণ সম্পাদকও আছেন। তাই আমরা ওই কাজটা তখন করেছি যাতে সেখান থেকে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার না করা হয়।
ক্রীড়াঙ্গন সংস্কারের আলোচনা শুরুর পর ফেডারেশনগুলো স্থবির হয়ে গেছে। ফেডারেশন কর্তারা হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন, ভাবছেন শুধুই তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তাদের খেলাটা সক্রিয় করার ভাবনাই নেই। প্রায় তিন মাস হতে চলল খেলাধুলা বলতে গেলে বন্ধ...
রানা : এখানেই আমাদের জানা, বোঝা এবং ইচ্ছের ঘাটতি আছে। প্রথমেই জানা উচিত গঠনতন্ত্রে কী আছে। সভাপতি না থাকলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রথম সহ-সভাপতি দায়িত্ব নেবেন। সাধারণ সম্পাদক না থাকলে এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক দায়িত্ব নেবেন। এখন দেখা যাচ্ছে গঠনতন্ত্র পাশ কাটিয়ে তারা খেলাধুলা বন্ধ করে বসে আছেন। অথচ সরকার তো বলে দেয়নি খেলাধুলা বন্ধ রাখতে। সরকার বলেছে, খেলাধুলাও চলবে, পাশাপাশি সংস্কার কাজটাও করতে হবে। আমাদের মূল স্টেক হোল্ডার হলো খেলা ও খেলোয়াড়রা। সেদিকেই মনোযোগী হতে হবে। ফেডারেশনে যারা বসবে, তাদের মূল কাজ খেলা ও খেলোয়াড়দের দেখভাল করা।
তার মানে দাঁড়াচ্ছে ক্ষমতা হারানোর ভয়। ভয় থেকে হতাশা। আর হতাশা থেকেই নিষ্ক্রিয়তা?
রানা : এটাই হচ্ছে। আমরা যারা ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ, তাদের এতটা ভয়ের কিছু নেই। যারা যোগ্য, সক্রিয়ভাবে কাজ করবে, তাদের বাসা থেকে ডেকে এনে দায়িত্বে বসাবে সবাই।
বাফুফের নির্বাচন আসন্ন। ফুটবলের বিশ্ব সংস্থা ফিফা সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ মেনে নেয় না। তারপরও সার্চ কমিটির নিশ্চয় এই নির্বাচনকে ঘিরে একটা প্রত্যাশা আছে?
রানা : বাফুফের নির্বাচন ফিফার গাইডলাইন অনুযায়ীই হবে। তবে মনে রাখতে হবে এটা কিন্তু বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও। বাংলাদেশ আছে বলেই, এটা আমাদের সবার। আমরা সবাই চাচ্ছি এখানে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হোক এবং যোগ্যরাই দায়িত্বে আসুক। এটাই সবার কাম্য।
সেই সত্যিকারের যোগ্য মানুষদের কি দেখতে পাচ্ছেন? বাফুফে নির্বাচনেও তো হচ্ছে রাজনৈতিক মেরূকরণ?
রানা : এ রকম মানুষ যাতে না আসে, সেটাই সবার কাম্য। আবার ক্রীড়াঙ্গনের লোকও তো ছিল, তারপরও কি আমরা খুব একটা এগোতে পেরেছি? ফুটবল আসলে এমন একটা জায়গায় আছে, যা থেকে বের হয়ে আসতে সময় লাগবে। যোগ্য লোকদের সম্পৃক্ততা এখানে বাড়াতে হবে।
বিভিন্ন ফেডারেশনে চল্লিশ বছর, ত্রিশ বছর, বিশ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে বসে আছেন। সরছেনও না, খেলাটারও উন্নতি করছেন না। তাদের জন্য কি কোনো স্পষ্ট বার্তা থাকছে কি না আপনাদের পক্ষ থেকে?
রানা : ওনাদের জন্য একটাই বার্তা। নিজেরাই যেন সরে গিয়ে তরুণদের কাজ করার সুযোগ করে দেন। ওনাদের মানতে হবে, এটা পরিবর্তনের যুগ, তরুণদের যুগ। এতদিন যে সনাতনী চিন্তাধারা নিয়ে পড়েছিলাম, এখন সময় ধন্যবাদ বলে বিদায় নেওয়া। আমরা চাইব, একই সঙ্গে তরুণ, পরিশ্রমী এবং অভিজ্ঞদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিতে। সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে যদি কঠোর হতে হয়, সেটা হতেও রাজি। সেক্ষেত্রে পরিবারের কাউকেও যদি সরিয়ে দিতে হয়, সেটা আমরা করব।
সার্চ কমিটি নিয়েও কিছু সমালোচনা ও বিতর্ক হয়েছে এবং হচ্ছে। একজন সদস্যকে সরকার বিব্রত হয়েই অব্যাহতি দিয়েছে। আবার একজন সদস্যর অপসারণের দাবি উঠেছে হকি অঙ্গন থেকে। কমিটির প্রধান হিসেবে এই বিতর্কগুলো নিশ্চয় আপনাকেও বিব্রত করে?
রানা : এটা আসলে বিব্রতকর ব্যাপার। আমাদের কাজ নিয়ে সবারই হয়তো সমালোচনা থাকবে। আগেই বলেছি সমালোচনা হোক, তবে বিতর্ক কাম্য নয়। এটা দুঃখজনক যে আমরা দারুণ একটা দল হয়ে কাজ করছিলাম, এর মধ্যে এ রকম একটা ব্যাপার ঘটল। যা আবারও বলছি ভীষণ দুঃখজনক।
