দুনিয়ার সমস্ত ক্ষমতা, অস্ত্র, প্রোপাগান্ডাও ফিলিস্তিন নামের ক্ষতচিহ্ন লুকোতে পারবে না

আপডেট : ১৩ অক্টোবর ২০২৪, ০২:৩০ এএম

পৃথিবীর আদিতম এনজিও ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম- ইংলিশ পেন। নোবেলজয়ী ব্রিটিশ নাট্যকার হ্যারল্ড পিন্টারের (১৯৩০-২০০৮) সম্মানে তারা প্রতি বছর পিন্টার পুরস্কার প্রদান করে থাকে। ২০২৪ সালে এই পুরস্কারের জন্য ভারতীয় লেখক অরুন্ধতী রায়কে মনোনীত করা হয়। এই সংবাদ জানার পরই পুরস্কার থেকে প্রাপ্ত অর্থ ফিলিস্তিনি শিশুদের ত্রাণ ফান্ডে দান করার ঘোষণা দেন অরুন্ধতী রায়। ১০ অক্টোবর ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি যে বক্তব্য রাখেন তার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন রেজওয়ানুর রহমান কৌশিক

পেন পিন্টার পুরস্কার দিয়ে আমাকে সম্মানিত করার জন্য ইংলিশ পেন এবং বিচারকম-লীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ইংলিশ পেন ও পিন্টার প্যানেলের সভাপতি রুথ বর্থইউক এই সম্মাননার ব্যাপারে আমাকে প্রথম যে চিঠিটি দিয়েছিলেন তাতে লেখা ছিল, পিন্টার পুরস্কার সেই লেখককে দেওয়া হয় যিনি অবিচল, অনড় ও প্রবল বুদ্ধিবৃত্তিক দৃঢ়তার সঙ্গে ‘আমাদের জীবন ও সমাজের ব্যাপারে প্রকৃত সত্য’ নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন। নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় হ্যারল্ড পিন্টারের দেওয়া বক্তৃতা থেকে এই উক্তিটি নেওয়া হয়েছে। ‘অবিচল’ শব্দটি আমাকে মুহূর্তের জন্য থমকে দিয়েছিল, কারণ, আমি নিজেকে এমন একজন মানুষ মনে করি যে প্রায় সবসময়ই বিচলিত হয়।

‘বিচলিত’ ও ‘অবিচল’ শব্দ দুটো আরেকটু খোলাসা করতে চাই। বিষয়টা সম্ভবত সবচেয়ে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন হ্যারল্ড পিন্টার। তিনি বলেন : ‘‘১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে লন্ডনে মার্কিন দূতাবাসের একটি সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম। নিকারাগুয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কন্ট্রাদের কার্যক্রমে আরও অর্থায়ন করবে কি না সেটা নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে তখন আলোচনা চলছিল। নিকারাগুয়ার পক্ষে যে প্রতিনিধিদলটি কাজ করছিল আমি তার একজন সদস্য ছিলাম। তবে প্রতিনিধিদলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ফাদার জন মেটক্যাফ। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রেমন্ড সিৎজ (রাষ্ট্রদূতের ডান হাত এবং পরবর্তী সময়ে নিজেও রাষ্ট্রদূত হন)। ফাদার মেটক্যাফ বললেন : ‘স্যার, আমি উত্তর নিকারাগুয়ার একটি চার্চের দায়িত্বে আছি। চার্চে যারা আসেন সবাই মিলে একটি স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সংস্কৃতিকেন্দ্র গড়ে তুলেছে। আমরা শান্তিতে বসবাস করছিলাম। কয়েক মাস আগে কন্ট্রাদের একটি বাহিনী এসে চার্চে হামলা করে। স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও সংস্কৃতিকেন্দ্র সবকিছু তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। তারা নার্স ও শিক্ষিকাদের ধর্ষণ করেছে, ডাক্তারদের বীভৎস কায়দায় জবাই করেছে। তাদের আচরণ ছিল জংলি পশুর মতো। আমেরিকান সরকার যেন এই জঘন্য সন্ত্রাসী কার্যক্রম থেকে সমর্থন সরিয়ে নেয়, দয়া করে আপনি সেই দাবি জানাবেন।’

সুবিবেচক, দায়িত্বশীল এবং অত্যন্ত পরিশীলিত রুচিবান মানুষ হিসেবে রেমন্ড সিৎজের দারুণ সুনাম ছিল। তিনি সব শুনলেন, কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন, তারপর খানিকটা গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন, ‘ফাদার, আমি আপনাকে একটা কথা বলি। যুদ্ধে সবসময়ই নিষ্পাপ মানুষের ভোগান্তি হয়।’ বরফ-শীতল নীরবতা নেমে এলো। আমরা রেমন্ডের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। তিনি অবিচল রইলেন।” স্মরণ করবেন, প্রেসিডেন্ট রিগ্যান কন্ট্রাদের নৈতিক দিক দিয়ে আমেরিকার জাতির জনকদের সমতুল্য ঘোষণা করেছিলেন। সিআইএর পৃষ্ঠপোষকতাধন্য আফগান মুজাহিদীন যারা পরবর্তী সময়ে তালেবানে বিবর্তিত হয়, তাদের ব্যাপারেও রিগ্যান একই উপমা ব্যবহার করেছিলেন। আমেরিকান আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ২০ বছর লড়াই করার পর এই তালেবানই এখন আফগানিস্তান শাসন করছে। কন্ট্রা ও মুজাহিদীনদের আগে ভিয়েতনামে যুদ্ধ হয়েছিল এবং অবিচলিত মার্কিন সমরনীতি তার সৈন্যদের ‘নড়াচড়া করে এমন যে-কোনো কিছুকে’ হত্যা করার আদেশ দিয়েছিল। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন উদ্দেশ্য জানার জন্য পেন্টাগন পেপার্স-সহ অন্যান্য নথিপত্র যদি আপনারা পড়েন, গণহত্যা কীভাবে করতে হয় সে ব্যাপারে অবিচলিত ও প্রাণবন্ত কিছু আলোচনার খোঁজ আপনারা পাবেন। কোনটা উত্তম? শত্রুকে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলা নাকি অনাহারে রেখে ধীরে ধীরে হত্যা করা? কোনটা ভালো দেখাবে? পেন্টাগনের সহৃদয় হর্তাকর্তারা যে সমস্যায় পড়েছিলেন তা হলো, আমেরিকানরা জীবন, সুখ, সম্পদ, ক্ষমতা চায় কিন্তু এশীয়রা ‘সম্পদ ধ্বংস ও প্রাণহানি’ নির্লিপ্ততার সঙ্গে গ্রহণ করে। ‘এই কৌশলগত যুক্তিটি চূড়ান্ত পরিণতি অর্থাৎ গণহত্যা’ পর্যন্ত নিয়ে যেতে তারা আমেরিকানদের বাধ্য করে। বিচলিত না হয়ে বহন করার জন্য এক ভয়ানক বোঝা বটে!

এত বছর পর আমরা আরেকটি গণহত্যার মুখোমুখি হয়েছি। ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব ও বর্ণবাদী একটি রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য গাজায় এবং বর্তমানে লেবাননে আমেরিকা ও ইসরায়েল নির্বিকার গণহত্যা চালাচ্ছে যা কি না টিভি মারফত সম্প্রচার করা হচ্ছে। এখনো পর্যন্ত সরকারি হিসাব মতে, প্রাণহানির সংখ্যা ৪২ হাজার। যার অধিকাংশই নারী ও শিশু। দালানকোঠা, আবাসিক এলাকা, আস্ত শহরের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আর্তনাদ করতে করতে যারা মারা গেছে এবং যাদের মৃতদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এই পরিসংখ্যানে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অক্সফামের সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, গত বিশ বছরে অন্য যে-কোনো যুদ্ধে যত শিশু মারা গেছে তার চেয়ে বেশি শিশুকে গাজায় ইসরায়েল হত্যা করেছে। লাখ লাখ ইউরোপীয় ইহুদিকে নির্মূল করার নাৎসি প্রকল্পের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ নিস্পৃহ ও উদাসীন ছিল। সেই সামষ্টিক অপরাধবোধ ঝেড়ে ফেলার উদ্দেশ্যে তারা আরেকটি গণহত্যার জমিন প্রস্তুত করেছে। যুগে যুগে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান ও গণহত্যা পরিচালনাকারী প্রতিটি রাষ্ট্রের মতোই ইসরায়েলের জায়নবাদীরাও (নিজেদের যারা ‘মনোনীত সম্প্রদায়’ মনে করে থাকে) ফিলিস্তিনিদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ ও হত্যা করার আগে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে যে ফিলিস্তিনিরা মানুষ নয়। প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন ফিলিস্তিনিদের ‘দু-পেয়ে জন্তু’ বলেছিলেন, ইৎজাক রবিন তাদের বলেছিলেন ‘ঘাসফড়িং’ যাদের ‘পিষে ফেলা যায়’ এবং গোল্ডা মেয়ার বলেছিলেন ‘ফিলিস্তিনি বলে কিছু নেই’। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াকু হিসেবে খ্যাত উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, ‘খড়ের গামলায় লম্বা সময় ধরে শুয়ে আছে বলেই গামলার ওপর চূড়ান্ত মালিকানা কুকুরের, এটা আমি মানি না।’ চার্চিল তাই ঘোষণা দেন, ‘উন্নত জাতি’ গামলার অধিকারী হবে। দু-পেয়ে জন্তু, ঘাসফড়িং, কুকুর এবং অস্তিত্বহীন মানুষগুলোকে হত্যা, জাতিগতভাবে নির্মূল ও বস্তিতে অবরুদ্ধ করে ফেলার পর একটি নতুন দেশের উত্থান ঘটল। প্রবল উল্লাসের সঙ্গে জানানো হলো, এটা হচ্ছে ভূমিহীন জাতিগোষ্ঠীর জন্য জনহীন এক ভূমি। আসলে আমেরিকা ও ইউরোপের জন্য পরমাণু শক্তিধর ইসরায়েল হলো একটি সামরিক চৌকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ হাসিলের প্রবেশদ্বার। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে অপূর্ব এক মণিকাঞ্চন যোগ। নতুন রাষ্ট্রটি যত অপরাধই করুক না কেন, তাকে দ্বিধাহীনভাবে ও অবিচলভাবে সমর্থনের পাশাপাশি অস্ত্র ও অর্থ দেওয়া হয়েছে, আদিখ্যেতা দেখানো হয়েছে, বাহবা তো ছিলই। আলালের ঘরের দুলালের মতো রাষ্ট্রটি বিকশিত হয়েছে। একের পর এক নৃশংসতা চালালেও যার মা-বাবা গর্বের সঙ্গে হাসতে থাকে। আজ তাই বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, গণহত্যা চালানোর পরও সে প্রকাশ্যে বুক ফোলায়। ইসরায়েলি সৈন্যদের শালীনতাবোধ শিষ্টাচার পুরোপুরি লোপ পেয়েছে। নারীদের হত্যা করার পর তাদের অন্তর্বাস গায়ে চড়িয়ে সেই ন্যক্কারজনক ভিডিও তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়। এতেও আজ বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। মৃত্যুপথযাত্রী ফিলিস্তিনি, আহত শিশু, ধর্ষণের শিকার নির্যাতিত কারাবন্দিদের ব্যঙ্গ করে ধারণকৃত ভিডিও এবং ভবন উড়িয়ে দেওয়ার সময় সিগারেট টানার কিংবা হেডফোন লাগিয়ে গান শোনার ছবি-ভিডিও তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করছে। এই লোকগুলো কারা? ইসরায়েল যা করছে সেটাকে কোনো উপায়ে কি ন্যায্যতা দেওয়া সম্ভব? ইসরায়েল, তার মিত্র ও পশ্চিমা গণমাধ্যমের হাজির জবাব হলো, গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলা। নিরস্ত্র ইসরায়েলিদের হত্যা ও জিম্মি করা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাত্র এক বছর আগে ইতিহাসের সূচনা হয়েছে। এটা হলো বক্তৃতার সেই পর্যায় যখন প্রত্যাশা করা হয় যে, আমি নিজেকে, আমার ‘নিরপেক্ষতা’ এবং আমার বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থানকে রক্ষা করব। নৈতিক সাম্যের ধুয়া তুলে বেসামরিক মানুষদের হত্যা ও জিম্মি করার অপরাধে হামাস, গাজার অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠী ও তাদের মিত্র হিজবুল্লাহকে তিরস্কার করব। সেইসঙ্গে হামাসের অভিযান উদযাপন করার অপরাধে গাজাবাসীর নিন্দা জানাব। এসব হয়ে গেলে বাকিটা খুব সহজ, তাই না? প্রত্যেকেই নির্মম, আমরা আর কী করতে পারি? চলো শপিংয়ে যাই...

এই নিন্দা তিরস্কারের খেলায় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে আমি আপত্তি জানাই। পরিষ্কারভাবে বলছি। কীভাবে জুলুমকে প্রতিহত করবে বা কাদের সঙ্গে হাত মেলাবে নিপীড়িত মানুষকে এ নিয়ে আমি কিছু বলব না। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ইসরায়েল সফরকালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠকে বলেছিলেন, ‘জায়নবাদী হওয়ার জন্য ইহুদি হতে হবে আমি তা বিশ্বাস করি না। আমি একজন জায়নবাদী।’ প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যিনি নিজেকে অ-ইহুদি জায়নবাদী মনে করেন এবং যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত ইসরায়েলকে অবিচলিতভাবে অস্ত্র ও টাকা-পয়সা জুগিয়ে যাচ্ছেন, তার মতো আমি নিজেকে কোনো সংকীর্ণ সংজ্ঞায় জড়াচ্ছি না। আমি যা লিখি আমি তা-ই। খুব ভালো করে জানি যে, আমি যে ধরনের লেখক, সেইসঙ্গে একজন অমুসলিম ও নারী, হামাস, হিজবুল্লাহ বা ইরানের শাসনাধীন পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকা আমার জন্য অত্যন্ত কঠিন, হয়তো অসম্ভবই হতো। কিন্তু বিষয় সেটা নয়। কথা হলো, যে পরিস্থিতিতে তারা বাস করছে সেই ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। তারা একটি চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে, উদারপন্থি ধর্মনিরপেক্ষ কোনো বাহিনী কি গণহত্যার মেজাজে থাকা যুদ্ধ মেশিনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে? কেননা, পৃথিবীর সমস্ত পরাশক্তি যখন তাদের বিরুদ্ধে, ঈশ্বর ছাড়া আর কার দিকে তারা মুখ ফেরাবে? হিজবুল্লাহ ও ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সমালোচনা করে এমন লোক তাদের নিজ দেশেই আছে, তাদের কেউ কেউ জেলে পচছে বা আরও মারাত্মক পরিণতির শিকার হয়েছে সেটা আমি ভালো করেই জানি। আমি এও জানি, তাদের কিছু কার্যকলাপ যেমন ৭ অক্টোবর হামাস কর্র্তৃক নিরস্ত্র মানুষ হত্যা ও জিম্মি করাটা যুদ্ধাপরাধের শামিল। তবুও এর সঙ্গে গাজা, পশ্চিম তীর এবং এখন লেবাননে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যা করছে তার তুলনা হতে পারে না। ৭ অক্টোবরের ঘটনাবলিসহ সব সহিংসতার মূলে আছে ফিলিস্তিনি ভূমি ও জনগণের ওপর ইসরায়েলের দখলদারিত্ব। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইতিহাস শুরু হয়নি। কয়েক দশক ধরে গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা যে অপমান লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আজ এই অনুষ্ঠানস্থলে যারা উপস্থিত আছি, তাদের কেউ কি স্বেচ্ছায় সেই অবমাননা মেনে নিতে রাজি হবেন? ফিলিস্তিনি জনগণ শান্তিপূর্ণ কোন পথটি প্রয়োগ করার চেষ্টা করেনি? হাঁটু গেড়ে হামাগুড়ি দেওয়া এবং নোংরা-ময়লা গেলার শর্ত ছাড়া কোন আপস প্রস্তাব ফিলিস্তিনিরা মেনে নেয়নি?

ইসরায়েল আত্মরক্ষা করার জন্য যুদ্ধ করছে না। তারা আগ্রাসন চালাতে লড়ছে। আরও কিছু এলাকা দখলের জন্য, বর্ণবাদী কাঠামোকে আরও মজবুত করার জন্য এবং ফিলিস্তিনি জনগণ ও ওই এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার জন্য তাদের এই যুদ্ধ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা ছাড়াও গাজার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে ইসরায়েল উচ্ছেদ করেছে। হাসপাতালে বোমাবর্ষণ করেছে। ইচ্ছাকৃতভাবে চিকিৎসক, ত্রাণকর্মী এবং সাংবাদিকদের নিশানা করে হত্যা করেছে। পুরো জনগোষ্ঠীকে অনাহারে রাখা হয়েছে, তাদের ইতিহাস মুছে ফেলা হচ্ছে। পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী ও ক্ষমতাধর সরকারগুলো এ সবই নৈতিকভাবে ও অন্যান্য উপায়ে সমর্থন করছে। (এর মধ্যে আমার দেশ ভারতও রয়েছে, যে ইসরায়েলকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ও হাজার হাজার শ্রমিক পাঠিয়ে সাহায্য করছে)। শুধু গত বছর, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ১৭.৯ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা প্রদান করেছে। অতএব, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা করছে, যুদ্ধ সীমিত রাখার চেষ্টা করছে কিংবা আমেরিকার বামপন্থি আইনপ্রণেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কোর্তেজ যেমন দাবি করেছেন, অমেরিকা ‘যুদ্ধবিরতির জন্য অক্লান্তভাবে কাজ করছে’ ইত্যাদি মিথ্যাচার আসুন আমরা একেবারে বর্জন করি। গণহত্যার দোসর কখনো মধ্যস্থতাকারী হতে পারে না।

পৃথিবীর সমস্ত ক্ষমতা, ধনসম্পদ, অস্ত্র ও প্রোপাগান্ডা মিলেও ফিলিস্তিন নামক ক্ষতচিহ্নটি আর লুকিয়ে রাখতে পারবে না। এই জখম থেকে সারা পৃথিবীর এমনকি ইসরায়েলেরও রক্ত ঝরছে। জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলকে গণহত্যা চালিয়ে যেতে যে-সব দেশের সরকার সাহায্য করছে, সেখানকার অধিকাংশ নাগরিক এর বিপক্ষে মত দিয়েছে। লাখ লাখ মানুষের প্রতিবাদী মিছিল আমরা দেখেছি। সেই মিছিলে ইহুদিদের তরুণ প্রজন্মও ছিল, যারা মিথ্যাচার শুনতে শুনতে ও ব্যবহৃত হতে হতে এখন ক্লান্ত। ইসরায়েল ও জায়নবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য জার্মান পুলিশ ইহুদিদের গ্রেপ্তার করছে এবং তাদের ইহুদিবিদ্বেষী বলে অভিযুক্ত করছে, এই দিনও দেখতে হবে সেটা কে ভাবতে পেরেছিল? কেবল ইসরায়েল রাষ্ট্রকে সমর্থন দেওয়ার জন্য মার্কিন সরকার ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগান নিষিদ্ধ করে নিজের মূলনীতি বাক স্বাধীনতাকে খর্ব করবে সেটাই বা কে ভাবতে পেরেছিল? অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার তথাকথিত নৈতিক কাঠামো বাকি পৃথিবীর কাছে হাসির খোরাকে পরিণত হয়েছে। বেনিয়াামিন নেতানিয়াহু যখন মধ্যপ্রাচ্যের এমন একটি মানচিত্র হাতে নিয়ে দাঁড়ান যেখান থেকে ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলা হয়েছে এবং নদী থেকে সাগর পর্যন্ত ইসরায়েলের সীমানা আঁকা, ইহুদি স্বদেশের খোয়াব পূরণে কাজ করার জন্য নেতানিয়াহুকে স্বপ্নদর্শী হিসেবে বাহবা দেওয়া হয়। কিন্তু ফিলিস্তিন ও তার সমর্থনকারীরা যখন ‘নদী থেকে সাগর পর্যন্ত ফিলিস্তিন মুক্ত হবে’ স্লোগান দেয়, তাদের ইহুদি গণহত্যার মদদদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। সত্যিই কি তারা তা-ই? নাকি এ এক অসুস্থ কল্পনা যা নিজের অন্ধকারকে অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেয়? যে কল্পনা বৈচিত্র্য সহ্য করতে পারে না, একটি দেশে অন্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে সমঅধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার কথা ভাবতে পারে না?

যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তা মারাত্মক আকার ধারণ করবে। তবে শেষমেশ এই যুদ্ধ ইসরায়েলি বর্ণবাদের অবসান ঘটাবে। সারা পৃথিবী প্রত্যেকের জন্য, ইহুদি জনগোষ্ঠীর জন্যও, নিরাপদ ও অনেক বেশি ন্যায়পূর্ণ হয়ে উঠবে। যা হবে আমাদের জখমি হৃদয়  থেকে একটি তীর টেনে বের করবার মতো ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি ইসরায়েলকে সমর্থন করা বন্ধ করে দেয়, আজই যুদ্ধ থেমে যাবে। এই মুহূর্তে হানাহানি থেমে যাবে। ইসরায়েলি জিম্মিরা মুক্তি পাবে, ফিলিস্তিনি কারাবন্দিরা ছাড়া পাবে। যুদ্ধের পর হামাস ও ফিলিস্তিনের অন্য প্রভাবশালী দলগুলোর মধ্যে যে সন্ধি আলোচনা হওয়া দরকার, তা এখনই হতে পারে যা লাখ লাখ মানুষকে ভোগান্তির হাত থেকে রেহাই দেবে। আমার ভীষণ দুঃখ হয়, অধিকাংশ মানুষ এটাকে সরল ও হাস্যকর প্রস্তাব ভাববে। 

গাজা ও লেবাননে আমরা যে বীভৎসতা দেখছি তা দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে। এই যুদ্ধের সত্যিকারের বীরেরা ফ্রেমের বাইরে থেকে যাবে। তারা তবুও লড়াই করে যায় কারণ তারা জানে একদিন নদী থেকে সাগর ফিলিস্তিন স্বাধীন হবে, হবেই।

ঘড়িতে নয়, ক্যালেন্ডারে চোখ রাখুন। যারা মুক্তির জন্য লড়াই করে, তারা এভাবেই সময়ের হিসাব রাখে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত