‘যাচ্ছি মিছিলে, বেঁচে থাকলে দেখা হবে ইনশাআল্লাহ’ নিজের ফেসবুকে এমনই এক স্ট্যাটাস দিয়ে মিছিলে গিয়েছিলেন শিক্ষার্থী সুমন। কিন্তু ঘাতকের বুলেট তাকে আর জীবিত ফিরতে দেয়নি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে কলেজপড়ুয়া ছেলের আন্দোলনে যাওয়ার কথা এভাবেই বলছিলেন সুমনের মা খাদিজা বেগম।
সুমন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়ে গত ৪ আগস্ট মারা যান। তিনি মাগুরার মহম্মদপুর আদর্শ টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মহম্মদপুর থানার সামনে বুক, হাত ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান সুমন।
সুমনের বয়স ছিল মাত্রা ১৯ বছর। তার বাড়ি মহম্মদপুর উপজেলার বালিদিয়া গ্রামে। বাবার নাম কানুর রহমান, মা খাদিজা বেগম। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সুমন সবার বড়। তার বাবা একজন দিনমজুর ও চাষি। সুমনের ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শেষে চাকরি করে অভাবের সংসারের হাল ধরবেন। যদি চাকরি না পান, তবে বিদেশ গিয়ে অভাব ঘুচাবেন। কিন্তু সুমনের সেই স্বপ্ন কেড়ে নেয় ঘাতক বুলেট।
সুমনের বাবা কানুর রহমান বলেন, ‘বালিদিয়া সরকারি উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে বালিদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে সুমন। পরে মহম্মদপুর আদর্শ টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ছিল। সুমন আমাদের বলেছিল সে আন্দোলনে যাবে। আমরা সবাই তাকে আন্দোলনে যেতে বারণ করেছিলাম। বলেছিলাম, আমরা গরিব মানুষ, আন্দোলন বুঝি না। তোমার কোনো সরকারি চাকরি হবে না। আমাদের পরের জমি বর্গা চাষ ও দিনমজুরি করেই খেতে হবে। কিন্তু দেশের প্রয়োজনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেয় সুমন।’
তিনি আরও জানান, গত ৪ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে মহম্মদপুর আমিনুর রহমান ডিগ্রি কলেজের সামনে থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা একটি মিছিল বের করেন। ওই মিছিলে যোগ দেন সুমন। সেখানে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় পুলিশ চার-পাঁচজন ছাত্রকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। পরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে তাদের ছাড়িয়ে আনতে থানার সামনে গেলে গোলাগুলির মধ্যে পড়েন সুমন। এ সময় তার বুক, হাত ও পায়ে গুলি লাগে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পথে সুমনের মৃত্যু হয়। তবে পুলিশের গুলিতে নাকি সন্ত্রাসীদের গুলিতে সুমন মারা গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি তার পরিবার।
নিহত সুমনের দাদি ফুলজান নেছা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সুমন সব সময় বলত আমার পড়ালেখা শেষ হলে সংসারে আর কোনো অভাব থাকবে না। পরিবারের সবাই বলতেন, আমরা এক দিন সচ্ছল হবই। আল্লাহ যেন পরপারে সুমনকে সুখে রাখে, সে যেন জান্নাতবাসী হয়। যারা সুমনকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার আল্লাহর হাতেই ছেড়ে দিলাম।’
