সিভিল সোসাইটি মানবাধিকার রক্ষার শেষ ভরসা

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৫৬ এএম

আমাদের রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। জনগণের মালিকানার পাট্টা দলিল হচ্ছে এই সংবিধান। দেশের মধ্যে হীরা বা সোনার খনি পাওয়া গেলে তা হিস্যা অনুযায়ী জনগণকে ভাগ করে দিতে হবে। সংবিধানে এ মালিকানা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। না হলে সোনা বা হীরার হিস্যা জনগণ নাও পেতে পারে। এস আলম বা সালমান এফ রহমানের মতো স্বার্থান্বেষী মহল তা হাতিয়ে নিতে পারে। জনগণ যদি সত্যিই রাষ্ট্রের মালিক হয়, তাহলে অফিস-আদালতে তাদের সমাদর করতে হবে এবং কাক্সিক্ষত সেবা দ্রুততম সময়ে বিনামূল্যে হস্তান্তর করতে হবে। সংবিধানে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। তবে এই ক্ষমতার প্রয়োগ হবে সংবিধানের অধীনে ও কর্র্তৃত্বে। সংবিধানে প্রতিটি শব্দ, কমা ও সেমিকোলন মেপে মেপে বসাতে হবে। না হলে বিপত্তি ঘটবে।

সিভিল সোসাইটির অন্তর্ভুক্ত কারা? শৃঙ্খলা বাহিনী বা রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতাকর্মী ছাড়া সবাই। একটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে সংবিধান বানাতে দেওয়া কি সমীচীন? যদি হয় তাহলে তারা এমনভাবে সংবিধান লিখবে, যাতে তারা চিরকাল ক্ষমতায় থাকে এবং অন্য কোনো দল যেন কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে না পারে। জনগণকে রাজনীতি থেকে আলাদা করা সম্ভব না। কেননা রাজনীতি করা জনগণের জন্মগত অধিকার। কেউ তা কেড়ে নিতে পারে না। একটি দেশের জনগণকে দলে দলে ভাগ করা সম্ভব নয়। কিছু লোক নির্দলীয় বা নিরপেক্ষ থাকবেই। দেশের অধিকাংশ জনগণ শুধুমাত্র ভোটার। কোনো দলের ক্যাডার নয়। উদার গণতান্ত্রিক দেশে ক্যাডার রাজনীতি অচল। সংবিধানে দলীয়তা ও নির্দলীয়তাকে সংজ্ঞায়িত করে রাষ্ট্রে দলীয় ও নির্দলীয় রাজনীতির বন্দোবস্ত থাকতে হবে। রাষ্ট্রক্ষমতা প্রয়োগকারীদের সংবিধান বানানোর দায়িত্ব ন্যস্ত করা অসমীচীন। বরং সিভিল সোসাইটি থেকে সংবিধান সভা বা গণপরিষদ গঠন করা অধিকতর যৌক্তিক। নিম্নকক্ষ দলীয় থাকলে ভারসাম্যের জন্য উচ্চকক্ষ হবে নির্দলীয়। কেন্দ্রীয় সরকার দলীয় থাকলে স্থানীয় সরকার হবে নির্দলীয়।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা দলীয় সরকারের হাতে থাকলে উচ্চশিক্ষাকে অবশ্যই নির্দলীয় কমিশনের হাতে রাখতে হবে। তথ্য, জ্ঞান ও পরিসংখ্যান তথ্য মন্ত্রণালয় তথা সরকারের হাতে থাকলে, দলীয় জ্ঞানপাপীরা এগুলোকে দলীয় প্রোপাগান্ডা মেশিনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করবে। নির্দলীয় তথ্য কমিশনে ন্যস্ত হলে এর কোনো আশঙ্কা থাকে না। ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতা থেকে সাংবিধানিক দুর্নীতি দমন কমিশনে ন্যস্ত করে কমিশনকে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। বিসিএস (অ্যাটর্নি সার্ভিস) চালু করে এই সার্ভিসকে নির্দলীয় করতে হবে। সাংবিধানিক স্থানীয় সরকার কমিশন সৃষ্টি করে মন্ত্রণালয় থেকে কমিশনের আওতায় আনতে হবে স্থানীয় সরকারগুলোকে। স্থানীয় সরকারে নির্দলীয় রাজনীতি প্রবর্তন করতে হবে। বন্ধ করতে হবে দলীয় মনোনয়ন বাণিজ্য। নির্দলীয় রাজনীতি মানে সিভিল সোসাইটি রাজনীতি। রাষ্ট্র ও সরকারকে দলীয় ও নির্দলীয় সত্তায় বিভক্ত করে রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য স্থাপন করতে হবে। সিভিল সোসাইটি এবং দলীয় সরকার পারস্পরিক নজরদারি এবং জবাবদিহির আওতায় স্বচ্ছভাবে জনস্বার্থে কাজ করবে। গণমাধ্যম তথ্যের জন্য উভয়ের দ্বারস্থ হবে। কেবলমাত্র দলীয় রাজনীতি সমাজের কোনো টেকসই কল্যাণ বয়ে আনতে পারবে না। এই সাংবিধানিক প্রজ্ঞা বা মুনশিয়ানা দিয়ে সংবিধান বানাতে হবে। সিভিল সোসাইটির অক্ষে থাকবে ছাত্র, শিক্ষক, আমলা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষক এবং শ্রমিকসহ সব পেশাজীবী সম্প্রদায়। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি থাকবে না। কোনো পেশাজীবী সংগঠন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠন হবে না। সংবিধানে রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে জনগণের মৌলিক অধিকারের তালিকা হবে অনেক লম্বা। অধিকার আদায়ের জন্য জেলায় জেলায় মানবাধিকার আদালত করতে হবে। দলীয় সরকারের জন্য অসম্ভব করে তুলতে হবে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং অফিস-আদালত ব্যবহার করে দমন পীড়ন অব্যাহত রাখা।

সংবিধানে দুটো অংশ থাকে। একটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কাঠামো এবং অন্যটি হচ্ছে সরকারের ক্ষমতা কাঠামো। প্রথমটি জনগণকে সরকারের দমন পীড়ন থেকে রক্ষা করে, জনসেবার গ্যারান্টি প্রদান করে, জনগণকে ইনসাফ ও ন্যায্যতার নিশ্চয়তা দেয় এবং সরকারকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। প্রথমটির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলসমূহ খুব একটা আগ্রহী নয়। কিন্তু সিভিল সোসাইটি আগ্রহী। দ্বিতীয়টি ভারসাম্য বজায় রেখে রাষ্ট্রের যাবতীয় ক্ষমতা রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গসমূহের মধ্যে ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টনের একটি বন্দোবস্ত। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে সিভিল সোসাইটি আগ্রহী নয়। কিন্তু রাজনৈতিক দলসমূহ প্রচণ্ড আগ্রহী।

সরকার এমন একটি রাজনৈতিক সংগঠন, সব সময় যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের ওপর জুলুম করতে চায়। একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সিভিল সোসাইটি সংবিধান ও আদালতের সাহায্য নিয়ে সরকারের নির্যাতন ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে। ফলস্বরূপ রাষ্ট্রে সৃষ্টি হয় ইনসাফ, ন্যায্যতা এবং ন্যায়বিচার। সিভিল সোসাইটি মানবাধিকার রক্ষার শেষ ভরসা। এমতাবস্থায় সংবিধান বানানোর দায়িত্ব দলগুলোর মতামত সাপেক্ষে সিভিল সমাজের হাতে থাকাই সর্বোত্তম।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত