শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৪, ০৬:৩৮ এএম

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ হয়েছে। এ ছাড়া দলের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ হয়েছে। প্রসিকিউশনের পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার তিন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজার নেতৃত্বধীন ট্রাইব্যুনালে এ আবেদনটি করা হয়। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মহিতুল হক এনাম চৌধুরী। এর মাধ্যমে জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হলো। একই সঙ্গে গণহত্যায় অভিযুক্ত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এই প্রথম কোনো মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলো।

ট্রাইব্যুনালের আদেশে শেখ হাসিনাকে আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে গ্রেপ্তার করে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের জানান, একটি আবেদনে শুধু সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করা হয়েছে। আরেকটি আবেদনে ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ ৪৫ নামে পরোয়ানার আবেদন করা হয়েছিল। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল সবাইকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানার আদেশ দিয়েছে। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার তদন্তের স্বার্থে শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য কোনো আসামির নাম প্রকাশ করেননি তিনি।

তবে ট্রাইব্যুনালের একটি সূত্রে জানা গেছে, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা, শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী দীপু মনি, সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ সেলিম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল, আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাবেক প্রধান (অতিরিক্ত কমিশনার) হারুন অর রশীদ প্রমুখ।

এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চে শেখ হাসিনার শাসনামলের সব হত্যা, গণহত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-, পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে হত্যাকা-ের বর্ণনা তুলে ধরেন তাজুল ইসলাম। এরপর দুটি আবেদনে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন তিনি। এর আগে গত ১৩ অক্টোবর চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম শেখ হাসিনাসহ গণহত্যার অভিযোগে পলাতক অন্যদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন।

দুপুরে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে হত্যা, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ যারা করেছিলেন তাদের শীর্ষে যিনি ছিলেন তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বিরুদ্ধে আমরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করেছিলাম। ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। ১৮ নভেম্বরের মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, দ্বিতীয় আবেদনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্যসহ ৪৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানানো হয়। সেটিও মঞ্জুর করেছেন ট্রাইব্যুনাল। সাংবাদিকরা অন্য আসামিদের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ অপরাধীদের অনেকে এখনো রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। সে কারণে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।’

তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘এই অপরাধগুলো বিস্মৃত মাত্রায়, সারা দেশজুড়ে সংঘটিত হয়েছে। আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছিলাম এ অপরাধের আসামি যারা, তারা অসম্ভব রকমের প্রভাবশালী, তাদের গ্রেপ্তার করা না হলে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করাটা অসম্ভব কঠিন। তাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ, এমনকি শহীদ পরিবারের সদস্যরা কথা বলতে সাহসী হচ্ছেন না। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আমরা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানিয়েছিলাম।’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার করতে ২০১০ সালের মার্চে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। এই ট্রাইব্যুনালে জামায়াত-বিএনপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে সাজার রায় ঘোষণার পর তা কার্যকর হয়। ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে আত্মগোপনে চলে যান তার সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে শেখ হাসিনা সরকারের নির্বিচার গুলিতে দেড় হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দায়িত্ব গ্রহণের পর এ হত্যাযজ্ঞের বিচারের উদ্যোগ নেয় সরকার। ইতিমধ্যে শেখ হাসিনা ও অন্যদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৫০টির বেশি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ জমা পড়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত