মোবাইল ফোন আসক্তি থেকে মুক্তি নেই!

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৩১ এএম

প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান উৎকর্ষ বিশ্বকে আমূল বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তির যুগে অধিকাংশের হাতে স্মার্টফোন। প্রয়োজন, অপ্রয়োজন, অবসর, বিনোদন সবই যেন এক স্মার্টফোনকে ঘিরে। সময়, অসময়ে মোবাইল নিয়ে পরে থাকতে দেখা যায় দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে। উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে এই মোবাইল ফোনের আসক্তি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে, করোনাকালীন অনলাইনভিত্তিক পড়াশোনাসহ বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল স্মার্টফোন। ফলে শিক্ষার্থীদের হাতে এ সময় স্মার্টফোনের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে স্মার্টফোন ব্যবহার এক প্রকার নেশার মতো হয়ে যায়। ফলে এই আসক্তি থেকে বের করা অনেকাংশেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একসময় বই পড়া ছিল জ্ঞানার্জন এবং অবসর সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম। আজ বই পড়ার সেই স্থান নিয়েছে স্মার্টফোন। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মুক্ত বোধের বিকাশ ঘটানোর পেছনে বই যে ভূমিকা পালন করত, আজ প্রায় তা স্মার্টফোনের দখলে। এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার মুক্ত বোধের বিকাশ সাধনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোবাইল স্ক্রিনে দেখা ইতিবাচক ভিডিওগুলোর চেয়ে নেতিবাচক ভিডিওগুলো মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলছে। ফলে সমাজে দেখা দিচ্ছে নানা ধরনের উচ্ছৃঙ্খলতা এবং অপরাধ। বিশেষ করে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের নেতিবাচক ভিডিও দেখার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে নানা সামাজিক অপরাধমূলক কর্মকা- ঘটছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় ঘটানোর পেছনে স্মার্টফোনের নেতিবাচক ব্যবহার নীরব ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিষয় ‘সময়’কে নষ্ট করার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এই স্মার্টফোন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনার  পেছনে যে সময় দেওয়ার কথা ছিল, তা এখন মোবাইল চালানোর পেছনে ব্যয় করছে। অনলাইন ভিডিও, টিকটক, লাইকি ও ভিডিও গেমসের প্রতি চরম আসক্ত হয়ে পড়ছে স্কুলে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। শিশুরাও কম আসক্ত নয়, মোবাইল ফোন একমুহূর্ত হাতে না থাকলে খাবার পর্যন্ত খায় না তারা। ক্রমাগত মোবাইল ফোনের ব্যবহার মস্তিষ্ক বিকাশে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে পড়াশোনায় মন বসছে না। ক্রমাগত ও বিরতিহীন মোবাইল ফোনের স্ক্রিন স্ক্রল করতে করতে এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের ফলে অনেকেই তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলছে। চাইলেও প্রযুক্তির এ ভয়াল থাবা থেকে বের হতে পারছে না। এ ছাড়া একাগ্রচিত্তে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে মানুষ এখন আর আগের মতো সরাসরি মিশতে পারছে না পরিচিত, অপরিচিত কারও সঙ্গে। সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের হারও অনেকটা কমেছে। এক প্রকার অসামাজিক মানুষ তৈরি হচ্ছে দিন দিন। ইঙ্গিত দিচ্ছে অসুস্থ প্রজন্মের। ফলে আমাদের উচিত মোবাইল ফোনের এই আসক্তি রোধে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা।  এর মধ্যে হতে পারে সময় নির্ধারণ : একটি নির্দিষ্ট সময়কে কেন্দ্র করে স্মার্টফোন চালানো উচিত। যেমন- দৈনিক এক ঘণ্টা। প্রয়োজন অনুসারে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নোটিসগুলো চেক করে আবার অফলাইনে ফিরে যাওয়া। রাত ১০টার পর ফোন না চালানোর অভ্যাস তৈরি করা। এতে রাতে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া সহজ হবে।

অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মিডিয়া/গ্রুপ চ্যাটিং থেকে ক্রমাগত নোটিফিকেশন মানুষকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তুলে। বারবার মনোযোগ তৈরি করে এসব নোটিফিকেশন চেক করার প্রতি। এতে মোবাইল ফোনের আসক্তি আরও বেড়ে যায়। তাই অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা উচিত।

অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ডিলিট করা : মোবাইল ফোন থেকে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ ডিলিট করতে হবে। অ্যাপ থাকলে তা ব্যবহার করতেও মন চাইবে। যে আ্যাপের প্রতি আপনি আসক্ত হয়ে পড়ছেন, তা দ্রুত ডিলিট করুন। এতে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি কমবে।

বই পড়া : সময়কে সঠিক ও কার্যকর পদ্ধতিতে ব্যবহার করার অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে বই পড়া। বই পড়লে জ্ঞান বাড়ে। আমাদের চিন্তার বিকাশ ঘটে। সুন্দর সময় কাটানো যায় বই পড়ার মাধ্যমে। জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় বইয়ের পেছনে ব্যয় করলে তা একটা সময় বৃহৎ কিছু উপহার দেয়। যা টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তাই মোবাইল ফোন আসক্তি কমাতে বই পড়ুন।

প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো : প্রকৃতির সান্নিধ্য মানুষের শরীর ও মনকে চাঙা করে তুলে। নতুন নতুন চিন্তাভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে পরিবার/প্রিয়জন/বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে প্রাকৃতিক কোনো পরিবেশে ঘুরতে যাওয়া যেতে পারে। এতে মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্তি কমে।

দৃঢ় প্রতিজ্ঞা : সবশেষ যেই জিনিসটা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হলো ‘প্রয়োজন ব্যতীত মোবাইল ফোন ব্যবহার করব না’ এ কথাটি নিজের মনে গেঁথে নেওয়া এবং তা মেনে চলার চেষ্টা করা।

দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওপরে বর্ণিত পদক্ষেপগুলো, মেনে চললে মোবাইল ফোনের আসক্তি অনেকটাই কমে যাবে বলে আশা করা যায়। এ ব্যাপারে অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য ও দায়িত্ব রয়েছে। তারা যেন কোনোভাবেই বিষয়টি এড়িয়ে না যায়। মনে রাখতে হবে, এই সমস্যা ‘আমার’। সুতরাং সমাধান আমাকেই করতে হবে। এই মুহূর্তে যদি বিষয়টিকে হালকা করে দেখা হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যতে আফসোস করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, মোবাইল ফোন আসক্তি থেকে মুক্তির জন্য আপনাকেই সচেষ্ট হতে হবে। না হলে ভবিষ্যৎ যে কোন দিকে যাবে, সেটা কি আমরা জানি? উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের নিয়ে কী ধরনের চিন্তা করবেন, তার সিদ্ধান্ত আপনার। শুধু একটু সতর্ক থাকুন। এখনই যদি স্থির সিদ্ধান্ত না নিতে পারেন, তাহলে কিন্তু পরবর্তী সময়ে পস্তাতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের গাফিলতি না হলে কল্যাণ কিন্তু আপনারই।

 লেখক :  শিক্ষার্থী 

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত