আর কত খাবেন

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৪, ১২:০৯ এএম

খনার একটি বচন আছে। বলা হয়েছে, ‘উদরে ডাল-ভাত, শান্তি পাবে সারারাত।’ এর মানে কী, তা ব্যাখ্যার দরকার নেই। প্রায় প্রতিটি প্রাণীর জিহ্বা থাকে। কিন্তু কয়েকটি প্রাণীর থাকে না। এর মধ্যে মাছের কথা বলা যায়। তাদের ভোজন প্রকৃতি ভিন্ন। মাছের মুখের আশপাশে অনেক কেমোরেসেপ্টর থাকে। বিশেষ সংবেদনশীল জৈবিক সংকেত তৈরির মাধ্যমে তারা স্বাদ ও গন্ধ পায়। কিন্তু মানুষের কথা আলাদা। তাদের শরীরে দৃশ্যমান একটি জিহ্বা রয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য লোভের একটি লকলকে জিহ্বা আছে। 

আবার পিঁপড়ার পাকস্থলী দুটি। একটি কাজ করে খাবার খাওয়ার জন্য, আরেকটি খাবার জমানোর জন্য। অন্যদিকে সাপ, গিরগিটির মতো কিছু প্রাণী আছে যাদের জিভ অনেক লম্বা। মানুষরূপী বেশ কিছু সরকারি কর্মচারীর এ রকম পাকস্থলী-জিহ্বা থাকে। জিহ্বার একটি দেখা যায়, আরেকটি অদৃশ্য। সেই জিহ্বার দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ অনেকটা ছায়াপথের মতো, সাপ গিরগিটির চেয়েও লম্বা। যেসব মানুষের মধ্যে এ ধরনের জিহ্বা থাকে, তারা স্বভাব এবং চরিত্রে একেবারেই আলাদা। অসংখ্য প্রাণীর বৈশিষ্ট্য আছে তাদের জিহ্বার মধ্যে। সম্ভবত তাদের দুটো জিহ্বা, দুটো মুখ। যে কারণে ক্ষুধা বেশি। স্বাভাবিকভাবেই বেশি খেতে হয়। শুধু খাদ্যে এই জ্বালা মেটে না। এর জন্য অর্থ চাই। সেই অদৃশ্য জিহ্বার চাওয়া এতই প্রবল যে, তারা শুধু খেতেই চান। থামতে চান না। জনগণের অর্থ অপচয় করে যেমনটি করেন অধিকাংশ সরকারি কর্মচারী। তারা বাহারি বিলাসিতা করেন। এসব মানুষ যে জনগণের করের টাকায় চলছেন, বেমালুম ভুলে যান। ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের অর্থের নয়ছয় বাহারি পদের। তারা শুধু খাবেন, যেভাবে পারেন। এই ক্ষুধা মেটে না। যেমনটি হয়েছে, নিয়ম লঙ্ঘন করে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে। সরকারের অধিকাংশ সেক্টরে দেখা যায়, তারা খাবারের নামে দুর্নীতি, অপচয় করেন। এমনি এমনিই তো আর বলা হয় না ‘সরকারকা মাল দরিয়ামে ঢাল’। শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে নিয়ম লঙ্ঘন করে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) কর্মকর্তাদের দুপুরের খাবার দিয়ে ৪ কোটি ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ টাকা অপচয়ের অভিযোগ রয়েছে। তাদের ভাবটা এমন, এটা কোনো বিষয় না। অডিট প্রতিবেদনে জানা যায়, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের দ্বিতীয় থেকে দশম গ্রেডের কর্মকর্তারা দৈনিক উপস্থিতির জন্য ২০০ টাকা হারে লাঞ্চ ভাতা গ্রহণ করেন। কিন্তু ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতা আদেশ অনুযায়ী শুধু ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীরা ২০০ টাকা হারে টিফিন ভাতা পাবেন। যেসব কর্মচারী লাঞ্চ ভাতা অথবা বিনামূল্যে দুপুরের খাবার পান তারা টিফিন ভাতা পাবেন না। তবে রাকাবের প্রধান কার্যালয়, স্থানীয় মুখ্য কার্যালয় রাজশাহীসহ এর আওতাধীন চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, নিয়ামতপুর, মহাদেবপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নীলফামারী, সৈয়দপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, বীরগঞ্জ, রংপুর, মিঠাপুকুর, গাইবান্ধা ও গোবিন্দগঞ্জ শাখা ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে অনিয়মিতভাবে কর্মকর্তাদের লাঞ্চ ভাতা দেয়। এতে চাকরি (ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান) (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ লঙ্ঘিত হওয়ায় অনিয়মিতভাবে লাঞ্চ বাবদ ৪ কোটি ২৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই ক্ষতিটা মূলত কাদের হলো? এক কথায় জনগণের। আসলে ব্যাংক কর্মকর্তারা খাবার খান না। দুর্নীতি করেন, সরকারের নামে জনগণের টাকা চিবান। তাদের অর্থলোভ এতই প্রবল যে, এই ঘটনার সাফাই গেয়ে এ ব্যাপারে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ বলেন, এ রকম একটা অডিট আপত্তি ছিল, সেটা আমি জানি। এর আপডেট অফিসে গিয়ে জানাতে পারব। তিনি আরও বলেন, এই লাঞ্চের নিয়ম সব ব্যাংকেই আছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকেও আছে। আমাদের এখানেও নিয়ম অনুযায়ী ভাতা গ্রহণ হয়েছিল।

এ ধরনের মানুষ কতটুকু খেতে পারে? উত্তর হচ্ছে, অনন্ত অসীম। তাদের দুর্নীতি-ক্ষুধা কখনো কমে না। দুর্নীতিবাজ আপনি বা আপনারা আর কত খাবেন? কষ্ট করে নিচের দিকে তাকান। দেখবেন, জিহ্বা পেট স্পর্শ করেছে। থামুন, নইলে জিহ্বা একসময় মাটি স্পর্শ করবে। তারপর! 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত