‘একাত্তর’ শব্দটি বাঙালিকে বিপ্লবী চেতনায় আচ্ছন্ন করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের কলকাতার বালিগঞ্জের ৫৭/৮ দোতলা বাড়ির একটি ছোট্ট স্টুডিও। যার নাম ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। সেখানেই অনিয়মিতভাবে সকাল-বিকেল-রাতে শিল্পীরা ছিলেন ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৯টি গানে সুর করেছিলেন সুজেয় শ্যাম। আবুল কাশেম সন্দ্বীপের লেখা এবং সুজেয় শ্যামের সুরে গাওয়া হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের রক্ত জাগানিয়া গান ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি/ বাংলাদেশের নাম’ গানটি এখনো স্বাধীনতাপ্রেমী মানুষের রক্তে দোলা জাগায়। এরপর স্বাধীনতার খবর শোনার পরেই সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয় শেষ গান ‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ’ গানটিও সাড়া ফেলে মুক্তিপ্রেমী মানুষের মধ্যে। এরপর সুজেয় শ্যাম চলে আসেন স্বাধীন বাংলাদেশে।
সিলেট সদরে ১৯৪৬ সালের ১৪ মার্চ জন্ম নেন সুজেয় শ্যাম। বাবা অমরেন্দ্র চন্দ্র শাহ ছিলেন একটি স্কুলের সহকারী এবং ‘ইন্দ্রেশ্বর টি গার্ডেন’র স্বত্বাধিকারী। তিনিও গান করতেন। সংগীত পরিবারে ভাইবোনের মধ্যে ছিলেন ষষ্ঠ। তরুণ বয়সেই বাজাতেন কি-বোর্ড। এরপর শুরু করেন গিটার। তারপর আধুনিক গান। ধীরে ধীরে এই গুণী সংগীতব্যক্তিত্ব চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা শুরু করেন। একাত্তরে সহযোদ্ধা, সহশিল্পী আর স্বজনদের শ্রদ্ধায় রাষ্ট্রীয় সম্মানে সিক্ত হয়ে শুক্রবার চিরবিদায় নিলেন সুজেয় শ্যাম। বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রয়াত হন তিনি।
সুজেয় শ্যামকে সংগীতে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে একুশে পদক দেওয়া হয়। তার আগে ২০১৫ সালে শিল্পকলা পদক পান। ১৯৬৯ সালে চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। ঢাকাই চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য তিনবার শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। বাংলাদেশ বেতারের প্রধান সংগীত প্রযোজক পদ থেকে ২০০১ সালে অবসরে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত ৪৬টি গানের সংকলন নিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বেতারের গান’ শিরোনামে একটি অ্যালবামের সংগীত পরিচালনা করেন ২০০৬ সালে । এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে আরও ৫০টি গানের সংকলন নিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বেতারের গান-২’ নামে আরেকটি অ্যালবামের সংগীত পরিচালনা করেন। ‘হাছন রাজা’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করে পেয়েছেন প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলামের বিশেষ অনুরোধে এই চলচ্চিত্রের একটি গানেও কণ্ঠ দেন তিনি। পরে ‘জয়যাত্রা’ ও ‘অবুঝ বউ’ চলচ্চিত্রের গানের সংগীত পরিচালনা করে যথাক্রমে ২০০৪ ও ২০১০ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৪ সালে ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’ ও ‘একাত্তরের মা জননী’ নামে দুটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন তিনি। ‘টুনাটুনি অডিও’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন।
সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের শোকঢল নেমেছিল শুক্রবার। শেষবারের মতো তাকে শ্রদ্ধা জানান দেশের সংস্কৃতি জগতের প্রথিতযশা মানুষ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ৯টি গানে সুর করেছিলেন তিনি, যেগুলো একাত্তরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গাওয়া হয়েছিল।
একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে কাজ করেছে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’। সে সময় অনেক শিল্পী, নাট্যকর্মী, সাংবাদিক, বাদ্যযন্ত্রী, সাংস্কৃতিককর্মী, কবি ও সাহিত্যিক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। অধিকাংশ কণ্ঠসৈনিক বেঁচে নেই। তবে এখনো কর্মক্ষম রয়েছেন রথীন্দ্রনাথ রায়, মামুনুর রশীদ, রফিকুল আলম, তিমির নন্দী, তপন মাহমুদ, শাহীন সামাদ, মনোরঞ্জন ঘোষাল এবং অরূপ রতন চৌধুরী ।
কৈশোর থেকেই অভিনেতা-নির্দেশক মামুনুর রশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল সুজেয় শ্যামের। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে একসঙ্গে কাজ করেছেন। মঞ্চনাটকেও সংগীত পরিচালক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। তিনি আরণ্যক নাট্যদল প্রযোজিত ‘এবং বিদ্যাসাগর’, ‘ময়ূর সিংহাসন’, ‘দি জুবিলি হোটেল’ নাটকের সংগীত পরিচালনা করেছেন। নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ‘ও ছিল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমার বেশ কিছু নাটকে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমি নাটক বিভাগে, আর সুজেয় শ্যাম সংগীত বিভাগে কাজ করেছে। প্রথম দিকে যন্ত্রসংগীতশিল্পী ছিল। পরে সংগীতায়োজক এবং সংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছে। প্রচারবিমুখ সহজ-সরল একজন মানুষ ছিল। একাত্তরের মে মাস থেকে ওর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি।’
কণ্ঠশিল্পী শুভ্র দেবের আপন মামা সুজেয় শ্যাম সম্পর্কে শোককণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মামার তো কোনো পুত্র ছিল না। একমাত্র মেয়ে মঞ্জুরি। আমাকেই পুত্রের মতো স্নেহ করতেন। একসময় পল্লবীতে মামা আর আমি একসঙ্গেই ছিলাম।’
সুজেয় শ্যামের সুর করা গানগুলোর মধ্যে ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’, ‘রক্ত চাই রক্ত চাই’, ‘আহা ধন্য আমার জন্মভূমি’, ‘আয় রে চাষি মজুর কুলি’, ‘মুক্তির একই পথ সংগ্রাম’, ‘শোন রে তোরা শোন’, ‘আজ রণ সাজে বাজিয়ে বিষাণ’, ‘আয়রে চাষী মজুর কুলী’ গানগুলো আজও মানুষের কানে বাজে। নির্ধারিত সময়ে সুজেয় শ্যামের শ্রদ্ধানুষ্ঠান হবে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে।
শিল্পীরা বড্ড অভিমানী। একাত্তরের কণ্ঠযোদ্ধা এখনো যারা বেঁচে আছেন, অধিকাংশই আড়ালে। একে একে নিভে যাচ্ছে তাদের জীবন প্রদীপ। আমরা যেন ভুলে না যাই, তাদের অবদান। মৃৃত্যুর কাছে সমস্ত জীব পরাজিত হয়। মানুষ তার কর্ম, সৃষ্টি এবং ভালোবাসায় বেঁচে থাকেন দীর্ঘদিন। সুজেয় শ্যাম থাকবেন, সংগীতের সুরের ছোঁয়ায়- বাঙালির হৃদয় গভীরে। অনন্ত শ্রদ্ধা থাকল এই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি।
লেখক : সাংবাদিক
