কার দায় কার মুক্তি?

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৫১ এএম

মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, আমাদের দেশে রাজনৈতিক টেমপ্লেটগুলো কেন এত পরিচিত? আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ জুড়ে যে ঘটনাগুলো এক এক করে ঘটেছে তাতে অতীত রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেতে খুব কষ্ট হওয়ার নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই টেমপ্লেটে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। প্রশ্ন করারও যথেষ্ট সুযোগ আছে। দায়মুক্তির ইতিহাস বাংলাদেশে নতুন নয়। চোখে ক্ষমতাসীনদের সেই কাজ একটি ঘৃণিত অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। স্বাধীনতার পর পর মুজিব সরকার কর্তৃক রক্ষীবাহিনীকে দায়মুক্তি দেওয়ার ঘটনা যেমন রয়েছে; তেমনি  ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর মুজিবের হত্যাকারীরা তৎকালীন সরকারকে দিয়ে দায়মুক্তির আদেশ জারি করিয়ে ছিল। পরবর্তীকালে ২০০২ সালের পরে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় বিচার বহির্ভূত সব নিহতের জন্য দায়ীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। যদিও পরবর্তীকালে তা আর টেকেনি। সম্প্রতি দায়মুক্তির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে যাতে ১৫ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনে যারা যুক্ত ছিলেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশে সব দায়মুক্তি শুধু আইন বা নির্দেশনা জারির মাধ্যমে করা হয় না। সাধারণভাবে আমরা দেখি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক কর্মীরা প্রায় সব ধরনের অপকর্মের দায়মুক্তি পায়। যদিও ক্ষমতাসীনদের দায়মুক্তি ক্ষমতাসীনদের মধ্যেই অপকর্মের হার জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দেয়। যার দৃষ্টান্ত গত সরকারগুলোর সময় অনেকবার দেখেছি। 

দায়মুক্তি শুধু ক্ষমতাসীনদের অপকর্মের হার জ্যামিতিক হারে বাড়িয়েই দেয় না, বিরোধী পক্ষের মধ্যে প্রতিহিংসার আকাক্সক্ষার জন্ম দেয়, জাতি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদান করে। আবার সমগ্র রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে যায়। ফলে দায়মুক্তি আইন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও চর্চার মাধ্যমে সবক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের পরিপন্থী। দায়মুক্তি সংক্রান্ত যে কোনো বিতর্কের যেমন একটি আইনগত দিক রয়েছে, তেমনি এর একটি বড় সামাজিক দিকও রয়েছে। বিষয়টি আইনজ্ঞরা ভালো বুঝবেন।  আবার মানবাধিকারের প্রতি সম্মান, সুরক্ষা ও বাস্তবায়নের বিষয়টিও এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর কোনোটি অগ্রাহ্য করা কঠিন। প্রত্যেকটি ঘটনারই প্রতিক্রিয়া রয়েছে। হয়তো তা স্থান, কাল ও পাত্রভেদে ভিন্ন হতে পারে। যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করার আগে তা চূড়ান্ত বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সর্বজনীন মানবাধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালে প্রণীত মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা তো আছেই, অধিকন্তু জাতিসংঘ ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবসে নির্যাতনবিরোধী সনদ গ্রহণ করে। এর মূল কথা হচ্ছে সব মানুষকে নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক আচরণ, অমর্যাদাকর অবস্থা বা শাস্তি থেকে সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য। বলা হয়েছে, নির্যাতন সংঘটিত হয়েছিল বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ আছে এমন অবস্থায় রাষ্ট্র ও কর্র্তৃপক্ষ ঘটনার তদন্ত নিশ্চিত করবে (অনুচ্ছেদ ১২)। বর্তমান সরকারের মানবাধিকারের প্রতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অঙ্গীকার যে তার দায়িত্ব এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তারপরও সরকারকে কেন দায়মুক্তির পথ বেছে নিতে হলো?

নতুন সরকার তো অন্তর্ভুক্তির সমাজ গঠনের আকাক্সক্ষা থেকে ছাত্র ও জনতার আন্দোলনের ফসল। এই দায়মুক্তির প্রচেষ্টাও সেই আকাক্সক্ষার জায়গার ফাটল ধরাতে পারে।  কারণ গণআন্দোলনের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে হত্যা ও লুটতরাজসহ কিছু অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে। সেগুলোর কিছুটাও যদি সত্য হয়, তবে তার ভুক্তভোগীদের ন্যায্যতা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার না পেলে সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। অধিকন্তু তারা কি মানবাধিকারের নিশ্চিত বিবেচনার অধিকার রাখেন না? মানবাধিকার কখনো সিলেকটিভ হয় না, মানবাধিকার যেমন সর্বজনীন তেমন কোনো ফৌজদারি অপরাধের দায়মুক্তি সম্ভব না। অন্তর্বর্তী সরকার যে দায় ও দরদের সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলছে সেই বিবেচনায় সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তারা দায়িত্ব ও দরদ কি আশা করতে পারেন না?

আমরা সবাই জানি, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে সহিংসতা হয়েছে। আন্দোলনকে দমানোর জন্য সরকারি বাহিনী ও সরকার সমর্থকরা সহিংসতা চাপিয়ে দিয়েছে। তবে সব সহিংসতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এমনটা সরলীকরণ করা বোধ হয় ঠিক হবে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়ে হয়েছেÑ ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের, গ্রেপ্তার বা হয়রানি করা হবে না।’ বাংলাদেশের বিবেচনায় এই নির্দেশনা অবব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে উদ্দেশ্যের আলোকে দেখতে হবে, ব্যক্তি পরিচয়ের আলোকে নয়। যে সহিংসতাগুলো হয়েছে তার সঙ্গে আন্দোলনের যোগ কতটুকু? কতটুকুই বা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত আক্রোশ বা আবেগতাড়িত হয়ে অন্যের বিপর্যয়ের কারণ হওয়া? বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, সব ধরনের বৈষম্যের বিলোপ এবং এই বৈষম্যবিরোধী বয়ানের ভিত্তিতেই এক দফা। ৫ আগস্টের সরকার পতনের পর যত ধরনের সহিংসতা ঘটেছে তার সঙ্গে আন্দোলনের কতটুকু যোগ রয়েছে? এই দায়মুক্তির পেছনে যতই যৌক্তিক অবস্থান থাকুক না কেন, ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ের ঘটনাবলি প্রশ্নবিদ্ধ করবে এই নির্দেশনার কার্যকারিতা নিয়ে। এটি কি প্রকৃতপক্ষে নতুন করে বৈষম্যের বয়ানকেই শক্তিশালী করবে না? তবে এই নির্দেশনার ‘হয়রানি’ শব্দটির ব্যবহার বেশ আগ্রহ উদ্দীপক। ন্যায্য সমাজ ব্যবস্থায়, দায় ও দরদের সমাজে কাউকেই হয়রানি করার অধিকার কেউ রাখে না। রাষ্ট্র তো নয়ই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কোনটা হয়রানি আর কোনটা ন্যায়বিচারের অংশ তা নির্ধারণ করবে কে? কোন পর্যায়ে কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করা না গেলে নির্দেশনার অপব্যবহার হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাই-ই বলে।

একজন মানুষ যতই বিপথগামী হোন না কেন, যখন সে একটা ভালো কাজ করে সেটাও সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আবার কেউ যদি কোনো উদ্দেশ্যের আড়ালে কোনো সহিংসতায় যুক্ত হয়ে থাকে তাকে সুরক্ষা দেওয়ার কিছু নেই। মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী প্রত্যেকটা মানুষের নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে জীবন যাপনের অধিকার আছে। আর এই অধিকারগুলো রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সে যে আমলের রাষ্ট্রই হোক না কেন।

অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইতিহাস শুধু বাংলাদেশেই না, সারা পৃথিবীতেই এর ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই ধরনের চিত্রই দেখা যায়, একটা পদ্ধতিগতভাবে একটি ন্যায্য পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সবাইকে আস্থায় নেওয়া হয়। আর এর উল্টোদিকও আছে, যেখানে হিংসার পরিবর্তে হিংসা ছড়ানো হয়েছে, ঘৃণার পরিবর্তে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে। আমরা হরহামেশাই ইতিহাসের মক্কা বিজয়ের কথা শুনে থাকি। জানি, কীভাবে একটা বিভক্ত সমাজকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ তৈরি করা হয়েছে। সেটাই আসল সংস্কার। একটি ন্যায্য পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে কোনো ক্ষেত্রেই সংস্কার টেকসই হওয়ার নয় যেটা ঐতিহাসিক শিক্ষাও বটে। তবে এই সময়ে রাজনীতি সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসমূহ পর্যালোচনা করা বেশি দরকার। জাতি ও দেশ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকা, বুলগেরিয়া, মরক্কো, ইরাক, মিসর, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন ইত্যাদি দেশগুলোর অভিজ্ঞতা কী? বর্ণবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পতনের শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা ট্রুথ ও রিকনসেলিয়েশন কমিশন গঠন করে। এই কমিশন বিভিন্ন ধরনের গণশুনানি আয়োজন করে যাতে এমনকি পূর্ববর্তী বর্ণবাদী সরকারের সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও সাক্ষ্য প্রদান করেন। শেষে কমিশন মোটামুটি ভারসাম্যপূর্ণ একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে পারে যা বেশ আলোচিত ছিল। নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রবাদপুরুষ নেলসন ম্যান্ডেলা একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন, যাতে রাষ্ট্রের মধ্যে নতুন প্রতিপক্ষ তৈরি না হয়। শুধু বিজয়ীর ইতিহাস ও বয়ানের হেজিমনি সংস্কারের জন্য যথেষ্ট না, একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাই পারে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে। যার তার জন্য প্রধানতম দায়টা হচ্ছে রাষ্ট্রের আর তবেই মুক্তি হবে দেশের ও সব জনগণের।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত