মানুষের জীবনের সার্বিক নিরাপত্তায় বিশেষ করে প্রাণরক্ষায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে ইসলাম। প্রাণনাশ করে বা প্রাণনাশের পরিস্থিতি তৈরি করে এমন সব মাধ্যম বা কর্মকাণ্ডকে ইসলাম জোরালোভাবে নিষেধ করেছে। তাই তো অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করাকে পুরো মানবজাতি হত্যা করার শামিল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হত্যা বা প্রাণনাশ তো অনেক দূরের আলাপ, রাস্তাঘাটে মানুষের চলাফেরায় যেন ন্যূনতম কোনো কষ্ট না হয়, সেজন্য রাস্তায় পড়ে থাকা কষ্টদায়ক বস্তু সরানোকে ইমানের অংশ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। ইসলাম যেখানে মানুষের চলাফেরার ক্ষেত্রে সামান্য বিঘœতা দূর করাকে ইমান বলে আখ্যায়িত করেছে, সেখানে আমাদের মতো ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে বছরের পর বছর ধরে লাখ লাখ মানুষ শুধু সড়ক দুর্ঘটনাতেই মারা যাচ্ছে। এই যে সড়কে এত দুর্ঘটনা, এত প্রাণনাশ, এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারলে পরোক্ষভাবে ইমান ও ইসলামই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা, বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন অমান্য করা এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এর পেছনে প্রধানতম দায়ী। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৬ হাজার ৫২৪ নিহত এবং ১১ হাজার ৪০৭ জন আহত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৫৯৮ জন মারা গেছে। আর আহত হয়েছে ৯ হাজার ৬০ জন। যদিও এই তথ্য পূর্ণাঙ্গ নয়। বাস্তবতা হলো, প্রতিবছর আরও অনেক বেশি মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।
গত ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে এক সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও ওয়াশ সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ জানান, ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ সড়ক দুর্ঘটনা। প্রতিবছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে প্রতি লাখে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ছিল ১৫.৩ এবং ২০২১ সালে এই মৃত্যু বেড়ে হয় প্রতি লাখে ১৮.৬ জনের মতো। অন্যদিকে বিআরটিএর হিসাব মতে, প্রতিবছর দেশে গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ মারা যায় এবং ১০ হাজারের বেশি মানুষ বিভিন্ন মাত্রায় আহত এবং পঙ্গুত্ববরণ করে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে, যা মোট জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি। এটা শুধু সড়ক দুর্ঘটনার কারণে আর্থিক ক্ষতির হিসাব। কিন্তু কোনো পরিবারের একজন কর্মক্ষম ব্যক্তি যদি মারা যান, তাহলে পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। এতে মোট ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ে। সার্বিকভাবে সড়ক দুর্ঘটনা যে আমাদের জন্য অভিশাপ, সেটা আমরা বুঝতে পারি পরিবারের কেউ সড়কে দুর্ঘটনার কবলে পড়লে। এর আগে আমাদের তা বোধগম্য হয় না। প্রশ্ন, সড়ক দুর্ঘটনার এই অভিশাপ কে ডেকে আনল? উত্তর সহজ, আমাদের সেবায় যাদের নিয়োজিত করেছি, তারাই এই অভিশাপ ডেকে এনেছে। যেমন সড়কে কাজের জন্য দুই হাজার কোটি টাকার বাজেট নিয়ে এক হাজার কোটি টাকার কাজ করেছে। আর বাকি টাকা খেয়েদেয়ে সাবাড় করেছে। এর ফল আবার জনগণের ওপরেই এলো। এর নাম দুর্ভাগ্য। সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে যে পরিমাণ অর্থের ক্ষতি হয়, সেটার অর্ধেকও যদি সড়কে খরচ করা হতো, তাহলেও এত মানুষের মৃত্যু হতো না।
চার বছর আগে করোনাভাইরাস পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশেও বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছিল। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) জরিপে জানা গেছে, করোনা মহামারীর প্রভাবে বাংলাদেশের ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন। দারিদ্র্যরেখার নিম্নসীমার নিচে নেমে গেছেন ৮৯% মানুষ। এ দেশে এটাই ছিল করোনার সবচেয়ে বড় ক্ষতি। করোনা থেকে রক্ষার জন্য আমরা যেভাবে অস্থির হয়েছিলাম, যেভাবে সচেতনতার সেøাগান তুলেছিলাম, তার চেয়েও বেশি সচেতনতা অবলম্বন করা উচিত সড়ক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষার জন্য। কেননা করোনায় এ পর্যন্ত মাত্র ২৮ হাজার ২৭৩ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর গড়ে মৃত্যু হয় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন তরতাজা মানুষের। করোনার প্রথম বছরে বাংলাদেশে কভিড আক্রান্ত হয়ে মারা যায় মাত্র ৮ হাজার ৬০৮ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, যা সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর চারের এক ভাগ মাত্র।
২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। সেদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। ওই আন্দোলন দেশবাসীর সমর্থন পেয়েছিল। টানা ৯ দিন রাজপথে আন্দোলনের পর সরকারের আশ্বাসের ভিত্তিতে শ্রেণিকক্ষে ফিরে যান শিক্ষার্থীরা। ওই সময় সরকারি সংস্থাগুলো বলেছিল, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। কিন্তু এখন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুলে যাওয়া চোখ আবার বন্ধ হয়ে গেছে।
ভাবতে অবাক লাগে, প্রতিবছর সড়কে যেভাবে তাজা প্রাণ ঝরে পড়ছে। এরপরও দেশের শাসকবর্গ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষসহ কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। প্রতিদিন সড়কে এত মৃত্যু আমাদের নাড়া দেয় কি? নাড়া দেয়, যখন আমাদের প্রিয়জন বা নিকটস্থ কেউ দুর্ঘটনায় মারা যান বা পঙ্গুত্ববরণ করেন। সবচেয়ে গভীরভাবে নাড়া দেবে, যখন আমরা নিজেরাই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যাব বা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করব। তখন সেই গভীর নাড়া আমাদের কি আর ফেরাতে পারবে? তাই আসুন আমরা সচেতন হই। নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করি। অন্যথায় হয়তো চলতি মাসেই, নয়তো নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বরে এ সড়কেই আমাদের মরতে হবে।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
