মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ নয় আলোচনাই সমাধান

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৪, ০১:২৩ এএম

ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে ফিলিস্তিনের গাজায় হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৪২,৫০০  ছাড়িয়েছে। এই হামলার শুরু থেকেই ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।  ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি এই সংঘাত যেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যত্র ছড়িয়ে না পড়ে, সে চেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা টার্গেট করে হামলা হচ্ছে। একইসঙ্গে লোহিত সাগরেও যুক্তরাষ্ট্র ও বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালাচ্ছে ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র, এই দুই দেশের বৈরিতার ইতিহাস নতুন না। বিবিসি বলছে, ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতা শুরু হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। ঐ সময় ইরানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদেক তেল সম্পদকে সরকারিকরণ করতে চেয়েছিলেন। কারণ, এর বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করত ব্রিটিশরা। কিন্তু এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। মনে করা হয়, এই অভ্যুত্থানের পেছনে মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের ভূমিকা ছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে মোহাম্মদ রেজা শাহ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তখন ইসলামপন্থি নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি তার প্রধান প্রতিপক্ষ হন। তবে শাহের বিরোধিতা করার পর তিনি নির্বাসনে ছিলেন। কিন্তু, সত্তর দশকে ইরানি জনগণের বড় অংশ শাহের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে প্যারিস থেকে খামেনি আবার ইরানে ফিরে আসেন। ঐ বছর থেকেই খামেনি হয়ে ওঠেন দেশটির প্রথম সুপ্রিম লিডার। সম্প্রতি বৈরুতে হিজবুল্লাহ মহাসচিব হাসান নাসরাল্লাহ এবং জুলাইয়ে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়াহকে তেহরানে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ইসরায়েলে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করতে ইসরায়েলকে সহায়তা করার নির্দেশ দিয়েছেন।

ইসরায়েল ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম বেশ অত্যাধুনিক সরঞ্জামের কয়েকটি স্তর দ্বারা সজ্জিত, যা তাদের ন্যূনতম ক্ষতির বিনিময়ে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালানোর সুযোগ তৈরি করে রেখেছে। হোয়াইট হাউজে একটি সংবাদ বিবৃতি দানের সময় মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান ঘোষণা করেছিলেন, মার্কিন নৌ-বিধ্বংসী বাহিনী ‘আন্তঃসীমান্ত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উড়িয়ে দিতে ইসরায়েলের বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটে যোগ দিয়েছে। তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর দক্ষতা এবং আক্রমণের পূর্বাভাস সম্পর্কে সূক্ষ্ম যৌথ পরিকল্পনা প্রণয়নের সামর্থ্য নিয়ে প্রশংসা করেন। অবশ্য গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের চলমান গণহত্যা সত্যিকারভাবে বাধাগ্রস্ত করতে বাইডেন প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এক বছরেরও কম সময়ে ৪১ হাজারেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে, যদিও প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নিঃসন্দেহে অনেক বেশি। এমনকি অত্যন্ত দক্ষ মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে লেবাননে চলমান নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে হস্তক্ষেপ করারও প্রয়োজন মনে করেনি, যেখানে ইসরায়েল মাত্র এক সপ্তাহেরও কম সময়ে সাত শতাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক আশঙ্কা করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে টেনে আনা হতে পারে। এতে সতর্ক করা হয়েছিল যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরই তা বাড়বে। বাস্তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কোথাও টেনে আনা হচ্ছে না, বরং নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তারা ইতিমধ্যে সেখানকার যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে।

ফিলিস্তিনিদের নির্মূলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে বার্ষিক বিলিয়ন ডলার জোগান দেওয়ার মার্কিন তৎপরতাই এর প্রমাণ। ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলে কিছু আক্রমণাত্মক অস্ত্রের জোগান বন্ধ করা নিয়ে বাইডেন মাঝে মাঝে কথাবার্তা বললেও মূলত অর্থ সাহায্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বহু গুণ। আগস্টে বাইডেন প্রশাসন তার অংশীদার ইসরায়েলকে অপরাধ সংঘটনে অনুমোদন দিয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ।

রয়টার্স নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদন মতে, ইসরায়েল তার চলমান সামরিক প্রচেষ্টায় সমর্থন এবং এ অঞ্চলে একটি গুণগত সামরিক বলয় নিশ্চিত রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৮.৭ বিলিয়ন সহায়তা প্যাকেজ নিশ্চিত করেছে। শেষ পর্যন্ত এটি দুর্বোধ্য কিছু নয় যে, ক্রমাগত ইসরায়েলকে ব্যাপকভাবে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, এমন একটি দেশকে সংঘাতে টেনে নেওয়া লাগে না। এটি এমন এক দেশকে নির্দেশ করে, যেটি সব ধরনের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যে সংঘাতে বেশ ভালোভাবেই সক্রিয়। দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সামরিকভাবে সহায়তা দিয়েছিল। এ উপলক্ষেও ইরানকে ব্যাপক সন্ত্রাসবাদী আগ্রাসন চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়, যদিও দেশটির ওই পদক্ষেপ ছিল প্রতিশোধমূলক। বরং এটি বলাই সংগত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে আঞ্চলিক যুদ্ধে নিজেই নিজেকে টেনে আনার সূক্ষ্ম কাজ করেছে। বাইডেন প্রশাসন গাজায় যুদ্ধবিরতি চায় বলে দাবি করে যাচ্ছে। গণহত্যাকারীদের কাছে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র জোগান দিয়ে কি যুদ্ধবিরতির পথ উন্মোচন করা যায়? ইসরায়েল মনে করছে, বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন স্পষ্টতই ইসরায়েলকে নিরস্ত্র করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং এর ফলে তাদের হাতে একটি স্বর্ণালি সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত তিনবার বাইডেনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। রাফাহ পুনর্দখল করা, গাজায় হামাসের সঙ্গে অস্ত্রবিরতিতে যাওয়া এবং এখন লেবাননে একটি নতুন যুদ্ধ ফ্রন্ট খোলা নিয়ে তিনি বাইডেনের সঙ্গে বিরোধিতায় জড়িয়েছেন এবং প্রতিবারই সফল হয়েছেন।

ইসরায়েলি পাইলট ও ড্রোন অপারেটরদের আর বেসামরিক নাগরিকের জীবন নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না। হত্যার সিদ্ধান্ত এখন আঞ্চলিক সেনা কমান্ডারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সমগ্র লেবানন, গাজা ও পশ্চিম তীরের বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। শিশুহত্যার বিষয়ে যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা এখন আর নেই। ক্ষমতার মোহে ইসরায়েল গভীর ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। হিজবুল্লাহর বর্তমান নেতৃত্বকে ধ্বংস করে তারা পরবর্তী প্রজন্মের যোদ্ধাদের প্রতিহত করতে পারবে না। এখন পর্যন্ত হিজবুল্লাহ বেসামরিক মানুষকে নিশানা করে আক্রমণ করেনি এবং বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াতেও তারা আগ্রহী ছিল না। কিন্তু এখন সেই সংযম প্রায় নিশ্চিতভাবেই বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে। আবার ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে গাজার মতো হামলা চালিয়ে সেখানে আরও একটি অমানবিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ইতিহাসে একটি ঘটনাও পাওয়া যাবে না, যেখানে কোনো জঙ্গি দলের নেতৃত্বকে হত্যার কারণে দলটি বিলীন হয়ে গেছে। হিজবুল্লাহ মনে করছে, তাদের দায়িত্ব হলো পুনরুজ্জীবিত হয়ে প্রতিশোধ নেওয়া। মনে রাখা দরকার, সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা আছে। ইসরায়েলের জনগণের নিরাপত্তা অর্জনের একমাত্র উপায় হলো আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা এবং দখলদারির অবসান ঘটানো।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত