জলোচ্ছ্বাস সংগ্রাম জীবন

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৪, ১২:২৬ এএম

ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস আমাদের ভূখ-ে নতুন নয়।  জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাগরে ঝড়, নিম্নচাপের মতো দুর্যোগ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এক দশক আগেও কয়েক বছর পর দু-একটি ঝড় বা নিম্নচাপ হতো। এখন প্রতি বছর ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।  ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঘন ঘন এই বিধ্বংসী  প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের উপকূল স্পর্শ করে বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের উত্তরাংশ অনেকটা ফানেল- আকৃতির। ফলে স্থলভাগের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসে রূপ নেয় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়গুলো। আর এই বিভীষিকার নির্মম শিকারে পরিণত হয় হাজার হাজার মানুষ। এই দুর্যোগপ্রবণতার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস।

একের পর এক বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে পর্যুদস্ত দেশ। এবার পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’ আরও উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে পশ্চিমবঙ্গ মধ্য বঙ্গোপসাগর ও উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করার পর এরইমধ্যে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় দানা ১২০ কিলোমিটার গতিতে ভারতের ওড়িশায় গতকাল আঘাত হেনেছে। সরাসরি আঘাত না হানলেও বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে এর প্রভাব পড়েছে। বৃহস্পতিবার দুইজন মারা গেছেন। শুক্রবার কমবেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় জানায়, বাংলাদেশের উপকূলের বিভিন্ন জেলায় জোয়ারের পানি বেড়ে জলোচ্ছ্বাস হবে। শেষ পর্যন্ত কখনো হয়, কখনো হয় না। গতকাল দেশ রূপান্তরে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে এর ফলে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো পড়েছে আকস্মিক প্লাবনের ঝুঁকিতে। তবু এই অবস্থায় দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত দেখানোর পাশাপাশি উপকূলবাসীকে সতর্ক থাকতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঝড়ের কারণে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকা এবং তৎসংলগ্ন এলাকার দ্বীপ ও চরগুলোয় স্বাভাবিকের চেয়ে দু-তিন ফুট উচ্চতার বেশি জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর ফলে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে? নিশ্চয়ই সেই প্রস্তুতি প্রশাসন আগে থেকেই গ্রহণ করেছে। এরকম জলোচ্ছ্বাস ভবিষ্যতে আরও হবে। এজন্য প্রস্তুতির অভাব কখনো যেন না থাকে।

আমাদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কীকরণের ভাষা সাধারণ মানুষদের জন্য সহজবোধ্য নয়।  দেখা গেছে পুরো একটি বিভাগের জন্য একই সতর্ক সংকেত থাকে, ফলে গড়পড়তা একটা প্রস্তুতি থাকে সবার মধ্যে। কিন্তু অনেক দুর্গম এলাকা রয়েছে যেগুলোর ওপর ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব অন্য অনেক স্থানের তুলনায় বেশি। ফলে নির্দিষ্ট নম্বরের সতর্ক সংকেতে সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। স্বীকার করতেই হবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় সক্ষমতা যেমন বেড়েছে, কমেছে প্রাণহানি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে। তবু জলোচ্ছ্বাসের ফলে অসংখ্য মানুষ মারা যায়, আহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয় মানুষের। নিহত-আহত মানুষদের পরিবারের পাশে এই মুহূর্তে সহযোগিতার হাত বাড়ানো ছাড়া অন্য পথ খোলা নেই। এ ছাড়া বিরামহীনভাবে ইলেকট্রনিক ú্রচার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সচেতনতামূলক বুলেটিন অব্যাহত রাখা দরকার।

এই সমস্যা শুধু উপকূলবাসীর নয়, এরা আমাদেরই স্বজন। আমরা যেন ভুলে না যাই, বন্যা-ঝড়-জলোচ্ছ্বাসই আমাদের নিয়তি। তবু জলোচ্ছ্বাসের গ্রাস থেকে মানুষকে যেমন রক্ষা করতে হয় তেমনি এর সঙ্গে সংগ্রাম করেই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়েছে। জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রাম সবাইকে কম-বেশি করতে হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত