কে এই বোমা জামান?

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৪, ১১:২২ এএম

জামালপুরের আওয়ামী লীগ নেতা সুরুজ্জামান নিজের নানা কাজের কারণে আগে থেকেই জেলা জুড়ে পরিচিতি পান ভিন্ন ভিন্ন নামে। ভক্ত, অনুসারী ও অনুরাগীদের কাছে তিনি ‘বস জামান’। বিরোধীদের কাছে তিনি পরিচিত ‘বোমা জামান’ নামেই। আওয়ামী লীগে তার পরিচিতি নিজ দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও কু-বুদ্ধি দেওয়ার মাস্টার মাইন্ড হিসেবে। নানা বিশেষণে বিশেষায়িত এ নেতা জমি দখল, কমিশন-বাণিজ্য, নিয়োগ-বাণিজ্য, ভুয়া রাইস মিল দেখিয়ে ধান-চালের বরাদ্দ লোপাটসহ নানা অপরাধমূলক কাজ করে হয়ে ওঠেন বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক।

সব অপকর্মের ঢাল হিসেবে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। সেই সূত্রে বাগিয়ে নেন প্রেস ক্লাবের পদও। মাঝে অবশ্য কিছুদিন কলেজে শিক্ষকতাও করেছেন। তবে সেখানেও তার বিরুদ্ধে আছে নানা অনিয়মের অভিযোগ। শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিলেও নিজেকে পরিচয় দেন অধ্যাপক হিসেবে।

ছাত্রজীবনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) রাজনীতি করতেন সুরুজ্জামান। ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তারপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সে সময় জামালপুর আওয়ামী লীগ দুই গ্রুপে বিভক্ত ছিল। একটি পক্ষের নিয়ন্ত্রণ করতেন মির্জা আজম, আরেকটি নিয়ন্ত্রণ করতেন তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রয়াত আইনজীবী মতিউর রহমান তালুকদার। তখন মাঝেমধ্যেই শহরে দুই গ্রুপের মধ্যে তুমুল বন্দুকযুদ্ধ হতো। চার্জ করা হতো ককটেল ও বোমা। সুরুজ্জামান ছিলেন মির্জা আজমের অনুসারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় এই সুরুজ্জামান বোমা তৈরিতে বেশ পারদর্শী ছিলেন। তখন জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ছিল বিরোধী দলে। ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে উত্তাল আন্দোলনে বোমা জামান ছিলেন বিএনপি ও নিজ দলের নেতাকর্মীদের মাঝে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। ওই সময়কার কর্মকাণ্ডের পুরস্কার হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালে জেলা আওয়ামী যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক পদ পান। শক্ত অবস্থান তৈরি হয় আওয়ামী লীগেও। পরে তিনি বাগিয়ে নেন জেলা যুবলীগের আহ্বায়কের পদও।

মির্জা আজমের আস্থাভাজন হিসেবে ২০০৪ সালে জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ হন। পরে ২০১৫ সালে জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পর তিনি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ পান। অবশ্য ২০২২ সালে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দলের পদ হারাতে হয় তাকে।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সিংহজানি মৌজার প্রায় ৪৫ শতাংশ জমি স্থানীয় কয়েকজন ভূমি ব্যবসায়ী কিনে নেন। তারা সেখানের প্লট তৈরি করতে গেলে বাধা দেন জামান। পরে সেখান থেকে ১৩ শতাংশ জমি দখল করে নেন তিনি।

ওই জমি দখলের বিষয়টি জানিয়ে বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মোকছেদুর রহমান হারুন বলেন, ‘মালগুদাম রোডে প্রায় ৪৫ শতাংশ জমি কয়েকজন মিলে কিনেছিলাম। জামান সেই জমিতে যেতে আমাদের বাধা দেন। এ সময় তিনি দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ১৩ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করেন। এখন ওই জমির দাম দুই কোটি টাকার ওপরে।’

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রেলের জমি ইজারা নিয়ে চার পুকুর, বিএডিসির প্রায় দুই একর জমিতে পুকুর ও ছোট গুদামঘর, মুরগি ও গরুর খামার নির্মাণ করেন। তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন বিএডিসির বীজকেন্দ্রের শ্রমিক ও বীজের সব ব্যবসা। এখান থেকে তিনি পেতেন কমিশন। সিংহজানি খাদ্যগুদামের মাল লোড-আনলোডের শ্রমিক ও সব ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল জামানের। রাইস মিলের মালিক না হয়েও ভুয়া মালিক সেজে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অফিস থেকে ধান-চাল বরাদ্দ নিতেন এবং অফিস নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার কারণেই বিএডিসির অনেক পুরনো ব্যবসায়ীরা ছেড়ে দিয়েছেন ব্যবসা।

সুরুজ্জামান অনিয়ম করেছেন তার শিক্ষকতার সময়টাতেও। শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন সুরুজ্জামান। প্রভাষক হিসেবে যোগ দিলেও তিনি নিজেকে অধ্যাপক পরিচয় দিতেন। আর কলেজের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন একের পর এক ষড়যন্ত্র। কলেজের বিরুদ্ধে করেন মামলা। এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে বেশ বেকায়দায় পড়তে হয় তৎকালীন অধ্যক্ষকে। অবশ্য পরে কলেজের চাকরি ছেড়ে দেন সুরুজ্জামান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহীদ জিয়াউর রহমান কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, তিনি কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। কলেজে দলীয় প্রভাব দেখাতেন তিনি। প্রভাষক হয়েও তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজেকে অধ্যাপক পরিচয় দিতেন।

কলেজ ছেড়ে তিনি আস্তানা গাড়েন প্রেস ক্লাবে এবং স্থানীয় একটি পত্রিকা অফিসে। সেই পত্রিকার সম্পাদকের পরামর্শে নিজের সব অপকর্ম ঢাকতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একটি দৈনিক পত্রিকার অনুমোদন নেন তিনি। সেই পত্রিকাটি নিয়মিত প্রকাশিত হয়নি। পত্রিকার নিবন্ধন ধরে রাখতে মাঝেমধ্যে বের করতেন। ওই পত্রিকার সূত্রেই প্রেস ক্লাবে আগমন। তার পরামর্শে জেলার প্রথমসারির বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে ক্লাব থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন আওয়ামী লীগের এই নেতা। পরে কিছু অসাধু সাংবাদিক নেতার সহযোগিতায় অনিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রেস ক্লাবের সহসভাপতি পদ বাগিয়ে নেন।

প্রেস ক্লাব জামালপুরের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রেস ক্লাব ছিল জামানের নিজস্ব অফিস। সকালে এসে বসতেন, দুপুরে চলে যেতেন। আবার সন্ধ্যায় আসতেন, গভীর রাতে চলে যেতেন। এ সময় তিনি ক্লাবে বসে তার দলীয় লোকজন নিয়ে রাজনৈতিক, ঠিকাদারি, দখলদারি, সরকারি খাদ্যগুদাম ও বিএডিসি অফিস নিয়ন্ত্রণসহ নানা অপকর্ম করতেন।

বন্দেরপাড়া গ্রামের সুজন বলেন, এই ১৬ বছর এলাকার মানুষ জামানের ভয়ে টুঁ শব্দ করতে পারেনি। তার ভয়ে মসজিদেও কেউ কোনো কথা বলতে পারেনি। তিনি খাদ্য ও বিএডিসি অফিস এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই অফিসগুলো থেকে তাকে কমিশন দিতে হতো। তিনি রেলের ও বিএডিসির জমি দখল করে পুকুর, গোডাউন ও খামার দিয়েছেন। এসব করে হয়েছেন কোটি কোটি টাকার মালিক।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, যারা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম করে সম্পদ অর্জন করেছেন, তাদের সম্পদ জব্দ করাসহ অবৈধ সম্পদ উপার্জনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর আওয়ামী লীগের এই নেতা আত্মগোপনে চলে গেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারে সময়ে গেটপাড় এলাকায় বিএনপির কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে কয়েক দফা হামলার শিকার হয়েছেন। যে হামলার নেতৃত্বও দিয়েছেন জামান বস বা বোমা জামান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত