ফুটবল ফেডারেশনে কাজী সালাউদ্দিনের অধ্যায়ের ইতি ঘটেছে। গেল ২৬ অক্টোবর চার মেয়াদের সভাপতি সালাউদ্দিনের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাবিথ আউয়াল। তবে নতুন নেতৃত্বকে শেষ উপহারটা সালাউদ্দিন দিয়ে গেলেন নারী ফুটবল দলের টানা দ্বিতীয়বারের মতো সাফ জয়ের মধ্য দিয়ে। এমনটাই মনে করেন সর্বশেষ নির্বাহী কমিটির নারী ফুটবলের দায়িত্বে থাকা মাহফুজা আক্তার কিরণ। তিনি মনে করেন, নারী ফুটবলের সত্যিকারের উল্লম্ফনে বড় ভূমিকা সালাউদ্দিনেরই।
দেশের নারী ফুটবল সঠিক পথে নেই। এই কথাটা একদিক থেকে যেমন সত্য আবার অন্যভাবে ভাবলে অসত্যও। সত্য এ কারণেই, প্রচলিত কোনো প্রেসক্রিপশন মেনে চলে না দেশের নারী ফুটবল। বিগত কয়েক বছরে সালাউদ্দিন-কিরণ জুটি তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত প্রেসক্রিপশনে চালিয়েছেন মেয়েদের ফুটবল। বাফুফে ভবনের চতুর্থতলার ডরমেটরিতে বিভিন্ন বয়সের একঝাঁক নারী ফুটবলারকে গাদাগাদি করে রেখে বছরব্যাপী দেশি-বিদেশি কোচের অধীনে তারা চালিয়ে গেছেন ট্রেনিং। ঘরোয়া ফুটবলকে নড়বড়ে রেখে তারা চেয়েছেন একের পর এক আন্তর্জাতিক সাফল্য ছুঁতে।
বড় ক্লাবগুলোকে লিগমুখী করতে পারেননি তারা। প্রান্তিক পর্যায়ে নারী ফুটবল নিয়মিত হয়নি। দীর্ঘদিন হয় না জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। ফলে সেভাবে ফুটবলারও উঠে আসছে না। তারপরও ভালোমানের দেশি-বিদেশি কোচের অধীনে বছরব্যাপী ট্রেনিংয়ের সুফলটা মাঠে পাচ্ছেন নারী ফুটবলাররা। মেয়েদের চুক্তির আওতায় এনে অনিয়মিত হলেও বাফুফে চেষ্টা করেছে মাসিক বেতনটা হাতে তুলে দিতে। বেতনের অঙ্কটা একেবারে কম বলা যাবে না। অন্য খেলার নারীদের মাসিক উপার্জন তুলনা করলে নারী ফুটবলারদের বেতনটা আকর্ষণীয়ই। আর এই দিকগুলোর কারণে মিলেছে জোড়া সাফ শিরোপা।
একটা ভঙ্গুর অবস্থা থেকে দক্ষিণ এশিয়ার সেরার আসনে বসানোর কৃতিত্বটা তাই মাহফুজা আক্তার কিরণ দিতে চান বিদায়ী সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনকে, ‘আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, দেশের ফুটবল এই পর্যায়ে এসেছে একমাত্র কাজী সালাউদ্দিনের কারণেই। আমি মনে করি সাবেক-বর্তমান যত ফুটবলার আছেন, সালাউদ্দিনের মতো ফুটবল নিয়ে ভাবনার গভীরতা আর কারও নেই।’ কোরিয়ায় এএফসি অ্যাওয়ার্ড নাইট ও কনফারেন্সে অংশ নিতে কিরণের পাশাপাশি কোরিয়া আছেন সাফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ও বর্তমান সভাপতি তাবিথ আউয়ালও।
গুরুত্বপূর্ণ এই সভার কারণে তারা কেউই নেপালে নারী দলের ফাইনাল দেখতে যেতে পারেননি। এমনকি গতকাল বৃহস্পতিবার দলকে বরণও করতে পারেননি। কোরিয়া থেকে কিরণ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই কনফারেন্সটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমাদের এখানে আসতে হয়েছে। নইলে অবশ্যই নেপালে থাকতাম। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে অবশ্য বুধবার রাতে ফাইনালটা দেখেছি। দল জয় পাওয়ার পর সালাউদ্দিন ভাই ভীষণ আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। খুশি যেমন হয়েছেন, আর এদের নিয়ে কাজ করা যাবে না ভেবে একটু দুঃখও পেয়েছেন। আসলে এই মেয়েদের জন্য সালাউদ্দিন ভাই সর্বোচ্চটা দিয়ে করেছেন। তিনিই বাটলারের মতো হাই প্রোফাইল কোচকে নারী দলের জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন।’
বাটলারের প্রসঙ্গ আসতেই কিরণের কাছে জানতে চাওয়া হয়, সাফ চলাকালীন সময়ে ফুটবলার-কোচের বিরোধ নিয়ে। কিরণ বলেন, ‘এবারের অর্জনটা এমনি এমনি আসেনি। মেয়েদের এবং কোচকে নানাভাবে মোটিভেট করতে হয়েছে আমাকে। আপনি বিশ্বাস করবেন না ২৬ অক্টোবর বাফুফের নির্বাচনের দিন ভোটারদের কাছে নিজের জন্য ভোট চাওয়া বাদ দিয়ে আমাকে তিন ঘণ্টা ভিডিও কনফারেন্স করতে হয়েছে মেয়েদের ও কোচকে বোঝাতে। বাটলার অনেক বড় মাপের কোচ। তাকে বুঝিয়েছি যে মেয়েরা ছোট, তারা ভুল করেছে। ওরা যদি বেয়াদবি করে থাকে, তবে অবশ্যই তারা ক্ষমা চাইবেন। এরপর কোচ কিছুটা ঠান্ডা হয়েছেন। দেশে ফিরে আমরা কোচের সঙ্গে বসব। তাছাড়া এখনো আমাদের নতুন নির্বাহী কমিটির সভা হয়নি। প্রথম সভা হলে দায়িত্ব বণ্টন করা হবে। কে কোন দায়িত্ব পাবে, তখনই ঠিক হবে। আমাকে যদি নারী ফুটবলের দায়িত্বে রাখা হয়, তখন নতুন করে পরিকল্পনা করব।’
দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত না হলেও কিরণ মনে করেন, দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে সামনে তাকাতে হলে অনেক বেশি ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলতে হবে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে, ‘পরের ধাপে যেতে হলে আমাদের বছর জুড়ে নিয়মিত ফিফা প্রীতি ম্যাচ খেলতে হবে। এ ছাড়া ঘরোয়া ফুটবলকে শক্তিশালী করতে হবে। এটা করতে হলে বড় ক্লাবগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই মেয়েদের ফুটবলে আরও উন্নতি ঘটবে।’
কাজী সালাউদ্দিনের কাছের মানুষ হিসেবে বিগত কয়েক বছরে কিরণকে নিয়ে আলোচনার চেয়ে সমালোচনাই হয়েছে বেশি। এবার নতুন সভাপতির নেতৃত্ব কিরণ অতীত দুর্নাম ঘোচানোর চেষ্টা নিশ্চয়ই করবেন। নারী ফুটবলের দায়িত্বে যদি তাকে রাখা হয়, তবে অতীতের নিজস্ব দাওয়াই ভুলে তাকে নতুন ও প্রচলিত প্রেসক্রিপশনে রাখতে হবে আস্থা। তাতে দক্ষিণ এশিয়ার পেরিয়ে দেশের নারী ফুটবলাররা দেখতে শুরু করবে এশিয়া পর্যায়ে ভালো করার স্বপ্ন।
লুইসের ৮ ছক্কায় উড়ে গেল ইংল্যান্ড
মেয়েদের পাশে থাকবে সরকার