ফাওজুল কবির বললেন

আমাদের সময় বেশি নেই, রাজনীতিবিদরা উসখুস করছে

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৪, ০৬:৩৬ এএম

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, সড়ক পরিবহন ও সেতু, এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, ‘আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় যেতে উসখুস করছে। আমরাও নিজ পেশায় ফিরে যেতে চাই। আমাদের কাছে প্রত্যাশা আকাশচুম্বি, মানুষ মনে করছে আমাদের হাতে জাদুর চেরাগ আছে, সব বদলে ফেলতে পারব। আমরা কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছি, কোষাগারে টাকা নেই, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে দেনা রয়েছে।’

গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘সংস্কার ও টেকসই উন্নয়নের সমন্বয়ে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফাওজুল কবির এসব কথা বলেন।

ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘এখন থেকে কোনো প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় আর বাড়ানো হবে না। সব ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে টেন্ডারের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রতিযোগিতা কীভাবে সৃষ্টি করা যায় সেই লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। যতটা সম্ভব দুর্নীতি কমিয়ে জন আকাক্সক্ষা পূরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চাই।’

তিনি বলেন, ‘জনগণের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে অনেকের উপকার হতে পারে এ রকম প্রকল্প গ্রহণ করবে অন্তর্র্বর্তী সরকার। গণ-অভ্যুত্থানের যে আকাক্সক্ষা সেটাই আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘অন্য সরকারকে ক্ষমতায় যেতে হয়। কিন্তু অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এটাই মৌলিক পার্থক্য। এ সরকার কায়েমি স্বার্থের ওপর দায়বদ্ধ নয়। এ সরকারের দায়বদ্ধতা জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও আহতদের প্রতি। তাই সব সংস্কার ও কাজ তাদের কথা মাথায় রেখেই করা হচ্ছে।’

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘জনগণের টাকা জনগণের স্বার্থে ব্যবহারের কথা মাথায় রাখতে হবে। সরকার একটি আমানত, ব্যক্তি স্বার্থ, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়তার স্বার্থের বাইরে গিয়ে এই আমানতকে রক্ষা করতে হবে।’

উপদেষ্টা বলেন, ‘দুর্নীতি, লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে বিদু্যুৎ জ¦ালানি খাত নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক অসন্তোষ রয়েছে। আমরা দুর্নীতির অবকাঠামোকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দিতে উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং কাঠামোগত পরিবর্তন করতে কাজ শুরু করেছি।’

সংস্কার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পূর্বের সরকারের দুর্নীতির কাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে ফেলা হয়েছে। ২০১০ সালের আইন স্থগিত এবং ৩৪ক ধারা বাতিল করে এখন থেকে গণশুনানির মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ¦ালানির দাম নির্ধারণ করা হবে। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আওতায় মেট্রোরেলের নীতিমালার শর্ত-এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) হতে হবে সরকারের প্রাক্তন সচিব। এই শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছে। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি লিমিটেডের এমডি পদে বুয়েটের অধ্যাপককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

জ¦ালানি উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রতি বছর ৫ থেকে ৬ হাজার কোটির টাকার এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। এটা ক্রমাগত বাড়তে থাকবে, যদি দেশীয় গ্যাসের রিজার্ভ না বাড়ে। গ্যাসের মজুদ বাড়াতে বেশি করে কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, সরকার একটা আমানত। তাই জনগণের টাকা যখন খরচ করবেন তখন তাদের কথা মাথায় রাখতে হবে। সরকার যে একটা আমানত সে কথা তারা (আওয়ামী লীগ) ভুলে গিয়েছিল, তাই মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়েছিল। জনগণের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে অনেকের উপকার হতে পারে, এ রকম প্রকল্প গ্রহণ করবে অন্তর্র্বর্তী সরকার।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. শামসুল হক বলেন, ‘উড়াল সড়ক হলো ৬০-এর দশকের একটি দর্শন। যারা তখন উড়াল সড়ক করেছিল তারা এখন তা ভেঙে ফেলছে। অথচ আমরা এখন উড়াল সড়ক তৈরি করছি। আমরা সে ভুলের পুনরাবৃত্তি করছি। আমাদের অনেক সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমরা সে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারিনি। সীমিত সম্পদ দিয়ে দেশের সব মানুষের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। তাই সম্পদের সঠিক ব্যবহার করা উচিত ছিল।’

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার শাহাদাত আলী বলেন, ‘বলা যায় ৯৯ শতাংশ প্রকল্প ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিচার-বিশ্লেষণ করার সুযোগ ছিল না। যে কারণে মানুষের প্রত্যাশা পুরণ হয়নি এবং রিটার্ন আসছে না।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিগত সরকারের অপরিকল্পিত বিনিয়োগের দায়ভার এই সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। অন্তর্র্বর্তী সরকারের সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি, বিইআরসিকে (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) কার্যকর করার প্রচেষ্টা দেখতে পাচ্ছি, এটা ভালো উদ্যোগ।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি আক্তার মাহমুদ বলেন, ‘ঢাকার ফুটপাত কেটে ছোট করে রাস্তা করা হচ্ছে, ৩২ শতাংশ লোক হেঁটে চলাচল করে। তাদের বিষয়ে মনোযোগ নেই, মনোযোগ সড়ককেন্দ্রিক। এটাকে সঠিক উন্নয়ন বলতে পারি না।’

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএসআরএফ সভাপতি ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিত্নবিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক একেএম আতিকুর রহমান।

বিএসআরএফ সাধারণ সম্পাদক মাসউদুল হকের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন, জাহাঙ্গীরনগর বিত্নবিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শর্মিন্দ নীলর্মি, সিইএবির চিফ অ্যাডভাইজার কি চাংলিয়ান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা, মাহিন সরকার প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত