আসছে ১১-২২ নভেম্বর আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে ২৯তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বরাবরের মতো এবারও বিশ্বের জলবায়ু আন্দোলনের কর্মী, পরিবেশবাদী ও নীতিনির্ধারকদের কাছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন আগ্রহের বিষয়। পৃথিবীতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও এর অস্বাভাবিক গতি। যার প্রভাবে বিশ্ব পরিবেশ, প্রতিবেশ ও আবহাওয়ার ওলট-পালট। ফলে তত্ত্বগতভাবে জলবায়ু সম্মেলনগুলো অনুষ্ঠিতই হয় বিশে^র অস্বাভাবিক উষ্ণায়নের কারণসমূহ চিহ্নিত ও মোকাবিলা করা এবং একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য। যদিও এবারের সম্মেলনের আগ পর্যন্ত ২৮টি সম্মেলন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নের গতি’ নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে এর প্রভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়নি। এ এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন। তবে এর মধ্যে যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়নি তেমনটি নয়। যেমন ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কথা বলা যেতে পারে। এই চুক্তিতে পৃথিবীতে উষ্ণায়নের মাত্রা এই শতাব্দীর মধ্যে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে ঐকমত্য পোষণ করা হয়। যার মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা (২০১০ সালের তুলনায় ৪৫%কম) এবং ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে তার প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা উল্লেখযোগ্য।
গত কয়েক বছরের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল জলবায়ু তহবিল গঠন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা, ধীরে ধীরে ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বিনিয়োগ বাড়ানো, কার্বন নিঃসরণের বর্তমান মাত্রা ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা, অভিযোজন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা প্রভৃতি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ। তবে সব ছাড়িয়ে গত বছর দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ২৮তম বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল জলবায়ু ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ দাবির স্বীকৃতি ও তহবিল গঠন। যদিও যে তহবিল গঠন করা হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে নগণ্য। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা সম্মেলনগুলোর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। এবারেও তাই থাকবে। বিশেষ করে এবারের সম্মেলনকে বলা হচ্ছে, অর্থায়ন সম্পর্কিত বিশেষ জলবায়ু সম্মেলন। এর আগের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ধনী দেশগুলো ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার তহবিলের সংস্থান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই অঙ্গীকার পূরণ করতে না করতেই ২০২৫ সালে এর মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু তহবিল নিয়ে উন্নয়নশীল ও জলবায়ু বিপদাপন্ন দেশগুলোর দাবি জলবায়ু তহবিল হতে হবে অনুদানভিত্তিক। ঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কোনোভাবেই ঋণের ফাঁদে আটকানো যাবে না। তহবিল হতে হবে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাপনায়। তহবিলের অর্ধেক হতে হবে অভিযোজন এবং অর্ধেক প্রশমন খাতে। জাতিসংঘ বলছে, ইতিমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা যে অবস্থায় পৌঁছেছে তা মোকাবিলা ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থায়ন প্রয়োজন। বছরে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। আজরবাইজানের রাজধানী বাকুতে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নতুন জলবায়ু অর্থায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রচেষ্টা থাকবে। এখন দেখার বিষয়, এই লক্ষ্যমাত্রাটি কত হয়?
তবে এই সম্মেলন বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের মাত্রা ও প্রকোপ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখতে পারছে সেটা একটা মুখ্য প্রশ্নও বটে। ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে এনে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ নেট জিরোতে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে অগ্রগতি কতদূর? যে প্রশ্নের উত্তরে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ফারাক অনেক। যেখানে উন্নত দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ও চর্চা দৃষ্টিকটুভাবে ধরা দেয়। তারা না গুরুত্ব দিচ্ছে ন্যায্য অর্থনৈতিক রূপান্তরের ওপর, না সম্মান দিচ্ছে জলবায়ু তহবিল গঠনে ‘পলুটার্স-পে-প্রিন্সিপাল’ এর ওপর। ফলে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে যেমন পরিবর্তন আসছে না তেমনি একইসঙ্গে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারছে না। বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই মুহূর্তে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ধনী ও উন্নত দেশগুলো যুদ্ধ চালাতে যতটা খরচ করছে, তার তুলনায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিযোজন ও প্রশমনে কতটা বিনিয়োগ করেছে? এখানেই বৈশ্বিক রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এখন পর্যন্ত যুদ্ধই হচ্ছে পৃথিবীতে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের প্রধানতম অবলম্বন। তাদের আচরণে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তুলনায় আধিপত্য ধারে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ধনী দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু রাজনৈতিক এজেন্ডা হয়ে উঠতে পারছে না। রাজনীতি চলছে একদিকে আর তাকে সমর্থন দিয়ে শোষণমূলক অর্থনীতি, অপরদিকে চলছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিভিন্ন আলোচনা। এখনো বিশ্ব রাজনৈতিক এজেন্ডার জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে না পারা কি বিশ্বনেতাদের ব্যর্থতা না? ২০২৪ সালে এসে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনও (আইইএ) বলছে, এই সময়ের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিভক্তি একদিকে যেমন জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে একইসঙ্গে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমিয়ে আনার উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রকাশিত রিপোর্ট মতে, বিশ্বে বর্তমান নীতি কাঠামো অনুযায়ী জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার এই দশকের শেষে গিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। যদি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার উল্লেখযোগ্য কমানো না হয় তাহলে এই শতাব্দী শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পরিবর্তে ২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে।
জলবায়ু আন্দোলনের কর্মীরা বলেন, জলবায়ু সম্মেলন নিয়ে যে রাজনীতি হয় তা নেতিবাচক রাজনীতি, বিশ্বের বড় বড় দেশ ও করপোরেশনগুলোর পক্ষের রাজনীতি। তাদের মুনাফা অর্জনের কাঠামো ও অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার রাজনীতি। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিনিয়োগের তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানিতে বিনিয়োগ অনেকগুণ বেশি। আইইএ তথ্যমতে, ২০২২ সালে প্রথমবারের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিতে সাবসিডি বা রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে যা ২০২১-এর তুলনায় দ্বিগুণ এবং ২০২০ সালের তুলনায় পাঁচগুণ বেশি। বোঝাই যায়, এতগুলো বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের প্রতিশ্রুতি কতটা রক্ষা করা গেছে। এত এত প্রণোদনা এই বার্তাই দেয় যে, ন্যায্য অর্থনৈতিক রূপান্তর ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অর্থ কোনো সংকট না, আসল সংকট হচ্ছে বিশ্ব ক্ষমতা কাঠামোয়।
যদিও প্রতি বছর বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে উপস্থিতি নিয়ে বিশ্বনেতাদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ওপেক প্লাস দেশগুলোর অবস্থান, চীন, ভারত, রাশিয়া কী অবস্থান গ্রহণ করছে তা নিয়ে যেন সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে। অনেক সময় এই দেশগুলো একে অপরকে দোষারোপ করে থাকে, যার মূলে রয়েছে নিজেদের দায় এড়ানো। আদতে এই দেশগুলো তাদের গোষ্ঠীস্বার্থ থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। সম্মেলন শেষে বেশ কিছু সফলতার সাফাই গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসল বিষয়গুলো নিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা থাকে। এর মাধ্যমে বিশ্বে শোষণমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করার কোনো প্রচেষ্টা থাকে না। এদের অনেকের কাছেই বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন সমস্যার আসল সমাধান না বরং নতুন নতুন ব্যবসা সম্ভাবনার হাতছানি। জলবায়ু আন্দোলনের কর্মীরা এগুলোকেই ‘ফসল সল্যুশন’ বা ভুয়া সমাধান দাবি করে এর প্রতিবাদ করে থাকেন। আবার জাতিসংঘের উদ্যোগে বিশ্বের উন্নয়ন সমস্যা নিয়ে যতগুলো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, তার বেশিরভাগের মধ্যেই সমন্বয় নেই। একদিকে জলবায়ু সম্মেলন, অন্যদিকে টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা (এসডিজি) বিষয়ক হাইলেভেল ফোরাম, মানবাধিকার সম্পর্কিত সনদ বাস্তবায়ন ইত্যাদির মধ্যে প্রচণ্ড সমন্বয়ের ঘাটতি লক্ষ করা যায়। জাতিসংঘের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ধারার কর্মপদ্ধতি দেখে মনে হয়, জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত ইস্যু, মানবাধিকার ও উন্নয়ন ইস্যুর মধ্যে সম্পর্কটা কোথায় তা তারা খুঁজে পাচ্ছে না। আর এর ফলেই জলবায়ু সম্মেলনগুলো যেন ধীরে ধীরে এক একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন যে সারা পৃথিবীর জন্য একটি অস্তিত্ব সম্পর্কিত বিষয় তা বোঝার জন্য কি ২৮টি বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন যথেষ্ট নয়? যদি যথেষ্টই হয়, তাহলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদসহ অন্যান্য মেকানিজমগুলো কী করছে? সেটাই বড় প্রশ্ন।
