পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞানীদের কোরাল মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির গবেষণায় সফলতা এসেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পে পবিপ্রবির অ্যাকুয়াকালচার বিভাগ কলাপাড়া উপজেলার আলীপুরে সামুদ্রিক শৈবালের সঙ্গে কৃত্রিম খাবারের মাধ্যমে কোরাল মাছ চাষের গবেষণা করেন। পবিপ্রবির জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের ইমাদুল হক প্রিন্স জানান, সামুদ্রিক শৈবাল সঙ্গে কৃত্রিম খাবারের মাধ্যমে কোরাল মাছ চাষ উপপ্রকল্পের গবেষণা কার্যক্রম চলে আলীপুরে। নতুন এ প্রযুক্তি মাছচাষে সফলতা উন্মোচন করেছে। প্রধান গবেষক পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক এবং সহকারী গবেষক ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আরিফুর রহমান। উপ-প্রকল্পটির সার্বিক অর্থায়নে আছে মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্প। গবেষকরা জানান, কোরাল মাছ বেশ পুষ্টিসমৃদ্ধ। কোরাল মাছে উন্নতমানের আমিষ রয়েছে যা আমাদের শরীরের পেশি গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামত এবং হরমোন উৎপাদনে সাহায্য করে। কোরাল মাছ ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ। দেশে কোরাল মাছের হ্যাচারি না থাকায় গবেষণার জন্য থাইল্যান্ডের হ্যাচারিতে উৎপাদিত কোরাল মাছের পোনা সংগ্রহ করে নার্সারি পুকুরে নার্সিং করার পর মজুদ পুকুরে মজুদ করা হয়। কোরাল মাছ মাংসাশী হওয়ায় নার্সারি পুকুরে মাঝে মাঝে জাল টেনে বড় পোনাকে আলাদা করতে হয়। নার্সারি পুকুরে কোরাল মাছের পোনাকে সামুদ্রিক শৈবালের সঙ্গে ৫০ ভাগ আমিষ সমৃদ্ধ কৃত্রিম খাবার দেওয়া হয়। এ সময় কোরালের পোনার আকার অনুযায়ী ২-৮% কৃত্রিম খাবার দিতে হয়। দিনে মোট ৪ থেকে ৬ বার খাবার দেওয়া হয়। ০.২ গ্রামের কোরাল পোনা ৫ গ্রাম ওজনের হলে পুকুরে মজুদ করা হয়। গবেষণাতে পুকুরে কোরালের অধিক বৃদ্ধির জন্য কৃত্রিম খাদ্যে সামুদ্রিক শৈবালের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে কৃত্রিম খাদ্যে ১% থেকে ২০% হারে সামুদ্রিক শৈবাল দেওয়া হয় কোরাল মাছকে খাওয়ানোর জন্য। যেই কৃত্রিম খাবারে ১০% সামুদ্রিক শৈবাল ব্যবহার করা হয়েছে । এর ফলে মাছের উৎপাদন বেশি হয়েছে। আরও ২টি গবেষণা কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০টি কোরাল মাছ মজুদ করে ১০% সামুদ্রিক শৈবালের সঙ্গে কৃত্রিম খাবার ব্যবহারে মাছের উৎপাদন বেশি পাওয়া গেছে। এ সময় কোরাল মাছের ওজনের ৬-১% কৃত্রিম খাদ্য সরবরাহ করা হয়। মাছকে ২ বার খাবার দেওয়া হয়। ৫ গ্রামের কোরাল ১ বছরে ২-৩.৫ কেজি ওজনের হয়েছে যা দক্ষিণাঞ্চলের মৎস্যচাষিদের কাছে ছিল অকল্পনীয়।
এই গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে সুফলভোগীদের মধ্যে মাছ চাষের সব উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৫০ জন মৎস্যচাষি প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
উপ-প্রকল্পের সুফলভোগী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ফিড খাবার খাওয়ানোর মাধ্যমে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে শুরু করে এ বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এক একটি কোরাল ৩.৫ থেকে ৪ কেজি পর্যন্ত হয়েছে। আমি জানলাম ফিড খাবার খাওয়ানোর মাধ্যমে কোরাল পালা যায়। এর মাধ্যমে চাষিরা ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হবেন। মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ শরিফুল আজম জানান, থাইল্যান্ডের হ্যাচারিতে উৎপাদিত কোরাল মাছের পোনাকে সিউইড সহযোগে পিলেট খাদ্যের মাধ্যমে চাষ করে ১ বছরে ৩-৩.৫ কেজি হওয়ায় আমরা আশাবাদী। চাষকালে কোরাল মাছের আাকারের তারতম্য খুব বেশি হওয়ায় ছোট মাছগুলোকে কাটাই করে অন্য পুকুরে স্থানান্তর করলে ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে উপ-প্রকল্পের প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশে প্রথম সামুদ্রিক শৈবাল সহযোগে কৃত্রিম খাদ্যের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের হ্যাচারিতে উৎপাদিত কোরাল মাছের চাষ পদ্ধতি নিয়ে তার দল কাজ করছে। ৫ গ্রামের কোরাল মজুদ পুকুরে ১ বছরে চাষ করে ২.৫-৪ কেজি ওজনের হওয়ায় শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যচাষিদের কাছে নতুন এক সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।
