মাত্র ৫৩ বছর আগে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ তার জন্মলাভের পর থেকেই নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গোলযোগের সম্মুখীন হয়েছে বেশ কয়েকবার। বাংলাদেশে যখনই কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে, তখনই এদেশের বিরুদ্ধে বিদেশি স্বার্থের অপতৎপরতা প্রকাশ্যে লক্ষ করা গেছে। সে বা তারা চায়নি বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠে স্থিতিশীল হোক, বরং বাংলাদেশকে গভীর গোলযোগের মধ্যে ঠেলে দিতে আরও বেশি তৎপর থেকেছে।
গত ১৫ বছর (২০০৯-২০২৪) হাসিনার শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি অন্ধকার যুগ। সে অন্ধকার যুগে হাসিনার সঙ্গে বিশেষ একটি দেশের সম্পর্ক ছিল দৃশ্যমান। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর মন্তব্য করেছেন, শেখ হাসিনার সরকারের পতন ভারত হজম করতে পারেনি। (সূত্র : প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর)। ৯৩ বছর বয়স্ক এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবীর অভিজ্ঞতার ঝুলিতে রয়েছে ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ তিন কালের রাজনৈতিক ঘটনাবলি। তিনি রাজনীতিতে যেমন এখনো সক্রিয় রয়েছেন, তেমনি রাজনীতি নিয়ে লিখেছেন বহুসংখ্যক গ্রন্থ। আমরা তাই বদরুদ্দীন উমর সাহেবের মন্তব্যকে সামান্য কথা হিসেবে গণ্য করতে পারি না।
মূলত হাসিনা দেশত্যাগের পর থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার নানা অপতৎপরতা চলছে। মাত্র তিন মাস বয়সী ডক্টর ইউনূসের সরকার ইতিমধ্যেই কয়েকটি অপতৎপরতা বেশ সফলভাবে রুখে দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও থেমে নেই দেশবিরোধী চক্রান্ত। এখন কূটকৌশল চলছে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা ঘটানোর। বস্তুত বাংলাদেশ বর্তমানে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বা হাইব্রিড যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধ বা হাইব্রিড যুদ্ধে প্রচলিত সামরিক সরঞ্জামাদি তথা সৈন্য-সামন্ত, কামান-বিমান ইত্যাদির প্রয়োজন পড়ে না। বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (social media) এবং মূলধারার প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে ব্যবহার করে অতি সহজেই চালানো যায় এই যুদ্ধ। এসব মিডিয়ার মাধ্যমে নানা ধরনের ধারণা (Perception) ও বয়ান (Narrative) তৈরি করা হয়। আর মিডিয়ার মাধ্যমে ক্রমাগতভাবে ভুল ও বিকৃত তথ্য (Mis information-Dis information), অপপ্রচার (Propaganda), ভুয়া খবর (Fake news) ছড়ানো হয়। এটাই হলো পঞ্চম প্রজন্ম বা হাইব্রিড যুদ্ধের অন্যতম বড় কৌশল। এ কৌশলে জনগণের মন-মগজে ও চিন্তা-ভাবনায় যথেষ্ট অস্থিরতা তৈরি করা হয়। এতে জনগণ বিভক্ত হয়ে শত্রু-শত্রু খেলায় মেতে ওঠে। কিন্তু তারা ঠিক নিশ্চিত হতে পারে না কে তাদের প্রকৃত শত্রু কিংবা কেই-বা প্রকৃত দেশপ্রেমিক। এমনকি গোটা দেশ যে আসলে যুদ্ধে আক্রান্ত সেটা জনগণের বিরাট অংশ বুঝতেই পারেন না।
যাহোক, পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষকে আগেভাগেই তার অভ্যন্তরে ঘায়েল করা। এজন্য প্রতিপক্ষ দেশের অভ্যন্তরে অন্তর্দ্বন্দ্ব, কলহ, গৃহবিবাদমূলক যাবতীয় রাজনৈতিক গোলযোগ তৈরি করা হয়। কখনো ঘটানো হয় False Flag Operation (অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর অভিযান)। তৃতীয়পক্ষ (অদৃশ্য) লাগাতার চালাতে থাকে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। চলে সীমাহীন তথ্যযুদ্ধ। মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে এগিয়ে থাকার জন্য প্রচারিত হয় গুজব ও বানোয়াট খবর। বাংলাদেশ তার জন্মলাভের পর থেকেই ঠিক এই ধরনের অনেক তৎপরতার মুখোমুখি হয়ে আসছে।
বর্তমানে আমাদের দেশে আবার রাজনৈতিক গোলযোগ ও অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য বেশ জোরেশোরে খেলা হচ্ছে অতি পুরনো সংখ্যালঘু কার্ড। কেননা এতে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে। তখন সুযোগ তৈরি হবে অনুপ্রবেশের। ফলে প্রশ্নের মুখে পড়বে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব।
এমতাবস্থায় দেশের সচেতন সব দেশপ্রেমিক মানুষকে এ যুদ্ধ মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমকেও হতে হবে যথেষ্ট তৎপর। গুজব সমুদ্রের ভেতর থেকে সত্যকে খুঁজে নিয়ে তুলে ধরতে হবে। রুখে দিতে হবে সব দেশবিরোধী কূটচাল।
বাংলাদেশ কোনো জাতিরাষ্ট্র নয়, বাংলাদেশ মূলত একটি নাগরিক রাষ্ট্র। আমরা সবাই বাংলাদেশি। বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান এবং অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায় কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজনের ওপর কোনো অবিচার হোক সেটা আমাদের কাম্য নয়। বাংলাদেশের সব সম্প্রদায়ের মানুষ বাংলাদেশেরই নাগরিক, তারা বাংলাদেশি। আর তাদের থাকতে হবে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য, অন্য কোনো দেশ কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি নয়।
বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা কেবলমাত্র নির্বাচন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত করা। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের দিতে হবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার; করতে হবে দেশরক্ষা ও দেশ গঠনের রাজনীতি। সংখ্যালঘু কিংবা জাতিরাষ্ট্র চাপিয়ে দিয়ে, অথবা সাম্প্রদায়িক কার্ডের সিঁড়ি বেয়ে এদেশের কোনো রাজনীতিবিদ কিংবা রাজনৈতিক দলকে আমরা ক্ষমতায় যেতে দিতে কিংবা টিকে থাকতে দেখতে চাই না।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
