পাখিপুর কত দূর

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০১ এএম

ছোটবেলায় গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ ধরে ছোটমামার সাথে ঘুরে বেড়াতাম। মামা গল্প বলতেন। ছোট ছোট গল্প। গ্রামের মাঠ। দূরের নদী। নীল আকাশ। সবুজ ধানক্ষেত। দূরে ঘন জঙ্গল। মামা বলতেন ওই জঙ্গলের নাম কি জানো?

ভূতের বন। ঐ বনে হোগলু থাকে। হোগলু কে জানো? হোগলু এক ভয়ংকর দৈত্যের নাম।

আমি কল্পনায় হোগলুকে দেখি।  যখন জোরে বৃষ্টি হয়, যখন ঝড় হয়, যখন নদীতে ঢেউ নাচে তখন হোগলু বন থেকে বের হয়ে লোকালয়ে আসে। মানুষ তখন হোগলুর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। মামা, হোগলুকে বন থেকে তাড়িয়ে দাও না কেন?

চেষ্টা তো করি। কিন্তু হোগলুরা বারবার জন্ম নেয়। তারা কোনো দিন হারিয়ে যায় না।

মামা আরও বলেন, একদিন তোকে ওই বন পেরিয়ে তেপান্তরে নিয়ে যাব।  

ওখানে কী আছে মামা?

তেপান্তর পার হলে আছে ক্ষীর নদী। ক্ষীর নদীর তীরে আছে অনেক রকম গাছ। সে সব গাছের ডালে আছে হাজার হাজার পাখি।

বাহ! মামা, আমরা একদিন পাখি দেখতে যাব। 

মাঠের ধার দিয়ে মামার সাথে হাঁটছি। লকলক করছে সবুজ ধান। দূরে দুটো লোক খাঁচা হাতে যাচ্ছে।

মামা, ওরা কারা?

ওরা পাখি শিকারি দল।

কোথায় যাচ্ছে?

পাখি মারতে যাচ্ছে। বনের ধারে।

কেন ওরা পাখিদের মারে?

ওরা পাখি ধরে পাখি বিক্রি করে। এভাবে ওদের জীবন কাটে।

অন্য কিছু করতে পারে না ওরা মামা?

মামা চুপ থাকলেন। বললেন,

পাখিরা কোনো দিন শেষ হবে না। যত পাখিই ধরো না কেন তুমি, কোথা থেকে আবার পাখিরা এসে পড়বে। আকাশ ভরে যাবে পাখিতে পাখিতে। পাখি শূন্য হয় না পৃথিবী।

মামা, আমি পাখি পুষব। আমাকে পাখি ধরে দেবে তুমি।

পাখিদের কি খাঁচায় বন্দি করা উচিৎ? পাখিরা তো আকাশে উড়বে।

ওরা কেন খাঁচায় থাকবে?

আমি চুপ থাকি।

মাথার ওপর দিয়ে তখন একঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট পাখি। পাখিদের আমি ঠিকঠাক মতো চিনি না। কাক, চড়–ই, দোয়েল, টিয়া, কাকাতুয়া এদের চিনতে পারি।

মামা বললেন,

ওই ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাচ্ছে, পাখিদের নাম হলো হরিয়াল। ওরা অশ^ত্থ গাছের সবুজ পাতার সঙ্গে মিশে থাকে। বটের ফল খায়। ওরা ঝাঁক বেঁধে থাকে।

আমি উদাসভাবে হরিয়ালের ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে থাকি।

তখন আমি পাখিদের দিকে তাকিয়ে মামাকে জিগ্যেশ করি।

মামা তোমার কী হতে ইচ্ছা করে?

মামা খানিক ভাবলেন। তারপর সবুজ ধানের দিকে তাকিয়ে বললেন,

মানুষ। শুধু মানুষ হতে ইচ্ছা করে।

আমি তখন হেসে ফেললাম। মামা তুমি মানুষ নও কে বলল?

মামা বললেন,

আরে পাগল, হাত পা মাথা চোখ থাকলেই কি মানুষ হওয়া যায় রে!

আমি মামার সাথে হেঁটে ধানের ক্ষেত পেরিয়ে এগিয়ে যেতে থাকি।

তখন পড়ন্ত বিকেল। আকাশে আলোর উঁকিঝুঁকি।

একঝাঁক পাখি উড়ছে আকাশে। মামা আমাকে শুধালেন,

খোকন তোর কী হতে ইচ্ছে করে?

আমি পাখির ঝাঁকের দিকে তাকিয়ে বললাম,

পাখি।

পাখি হয়ে কী করবি তুই?

আকাশে উড়ে যাব। বনে বনে ঘুরব। ফলমূল খাব।

আর কী করবি?

ঠুকরে ঠুকরে ওই বনের ধারে হোগলুদের মেরে তাড়িয়ে দেব। ওরা যেন আর অত্যাচার করতে না পারে।

মামার হাত ধরে আমি হেঁটে যাই। আমার গন্তব্য পাখিপুর।

পাখিপুর কত দূর? 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত