পদ্মার ভাঙনে পাল্টে যাচ্ছে মানচিত্র

আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:১৩ এএম

ফরিদপুরে পদ্মা নদী থেকে রাতের আঁধারে অবাধে বালু লুটের মহোৎসব চলছে। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত একটি প্রভাবশালী চক্র প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার বালু তুলে তা বিক্রি করছে। বর্তমান প্রশাসনের কিছুটা নীরবতা এবং নজরদারি কম থাকার সুযোগে চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অবাধে বালু তোলায় হুমকির মুখে পড়েছে নদীতীরবর্তী এলাকার ফসলি জমি, বসতবাড়িসহ নানা স্থাপনা। এতে ক্রমেই ছোট হয়ে যাচ্ছে ফরিদপুর সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ও নর্থচ্যানেল ইউনিয়ন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুরের পদ্মা নদীতে কোনো বালুমহাল নেই। ফলে সেখান থেকে বালু উত্তোলনের বৈধতা নেই। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ডিক্রিরচর ও নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের পদ্মা নদীর সিঅ্যান্ডবি ঘাট, ধলার মোড়, কবিরপুরচর, তাইজুদ্দিন মুন্সীর ডাঙ্গীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বালু তুলে তা বিক্রি করেছেন। মাঝেমধ্যে প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে বালুসহ ট্রাক আটক করলেও পরে তা রহস্যজনক কারণে ছেড়ে দিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন, রাজনীতিবিদসহ প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করেই প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালু বিক্রি করছে চক্রটি। গত একযুগের বেশি সময় ধরে অবাধে নদী থেকে বালু তোলার কারণে ডিক্রিরচর, নর্থচ্যানেলসহ পদ্মাতীরবর্তী এলাকার কয়েক হাজার পরিবার নদীভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে।

সরেজমিনে ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তাইজুদ্দিন মুন্সীর ডাঙ্গী এলাকায় পদ্মা নদীতে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর পাড় থেকে কিছুটা দূরে বালু তোলার ড্রেজার মেশিন বসিয়ে ট্রলারে করে বালু ভর্তি করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ড্রেজার মেশিনটি রেখে দ্রুত পালিয়ে যায়।

বালু নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ট্রলারচালক আবুল হোসেন জানান, প্রতি রাতে কমপক্ষে শতাধিক ট্রলার বালু তোলা হয়। এসব বালু নদীর পাড়ের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে রাখা হয়। পরে দিনের বেলা তা বিক্রি করে দেওয়া হয়।

কারা বালু তোলার সঙ্গে জড়িত এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রলারচালক আলম শেখ নামের এক ব্যক্তির কথা বলেন। আলম শেখই তাদের ট্রলার ভাড়া করেছেন। এ ছাড়া আশপাশের এলাকায় বালু তোলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোফাজ্জল হোসেন ও আবু ফকির নামের দুই ব্যক্তি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ১০-১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ নেতাদের মদদে একটি চক্র বালু তুলছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নাম প্রকাশ না করে স্থানীয়দের অনেকেই জানান, নদী থেকে বালু লুটের কারণে ডিক্রিরচর ও নর্থচ্যানেল ইউনিয়নটির বেশিরভাগ অংশ মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। তারা জানান, বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙন শুরু হলে এ চক্রটিই পানি উন্নয়ন বোর্ডের যোগসাজশে ভাঙনরোধে বালুর বস্তা ফেলার কাজ করে। অর্থাৎ নদীভাঙনের জন্য যারা দায়ী, তারাই আবার নদীভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ পায়। এভাবেই পদ্মা নদীকে ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু লুটকারীরা দুহাতে টাকা কামিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে নদীভাঙনের শিকার হয়ে প্রতিবছর শত শত মানুষ জায়গা-জমি, ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে।

ডিক্রিরচর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের হারু শেখ ও সেলিম মিয়ার সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, প্রতি রাতে একটি চক্রটি বালু তুলছে। এর ফলে তীব্র ভাঙনের সৃষ্টি হয়ে তারা ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

সদর উপজেলার ডিক্রিরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান মিন্টু ফকির বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দাপট দেখিয়ে এ চক্রটি অবৈধভাবে দিনের পর দিন বালু তুলছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার প্রশাসনকে জানালেও তারা তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে ডিক্রিরচর ইউনিয়ন এখন নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হওয়ার পথে। তবে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে বালু লুটকারীরা দিনের পর দিন এভাবেই কাজ চালিয়ে যাবে। এতে করে ডিক্রিরচর ও পাশের নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের ব্যাপক ক্ষতি হবে।’

অবৈধভাবে বালু তোলার বিষয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না তাসনিম বলেন, ‘এর মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা হয়েছে। অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত