শহীদ নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে রাজধানীর গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচির ডাক দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ‘অগণতান্ত্রিক শক্তির অপসারণ এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ দাবিতে আজ রবিবার বেলা ৩টায় এ কর্মসূচি পালনের কথা জানানো হয় দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দেওয়া এক পোস্টে। আওয়ামী লীগের এই কর্মসূচি ঘিরে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। দলটিকে ‘ফ্যাসিবাদী’ উল্লেখ করে কর্মসূচি পালন করতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ কোনো কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোরভাবে তা মোকাবিলা করবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, দেশের ভেতর আওয়ামী লীগের সভা, সমাবেশ এমনকি কোনো ধরনের মিছিল করার কোনো সুযোগ নেই। একই ধরনের বার্তা দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিমপি) কর্মকর্তারা বলেছেন, আজকের কর্মসূচির জন্য কোনো অনুমতি নেয়নি আওয়ামী লীগ। তারা বিক্ষোভ বা সমাবেশের চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। অন্যদিকে গণহত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং এর নেতাদের বিচারের দাবিতে আজ গুলিস্তানে গণজমায়েতের ঘোষণা দিয়েছে ‘ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ মঞ্চ’। দুপুর ১২টায় গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে এ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গতকাল সংগঠনটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহর ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
ওই ফেসবুক পোস্টে হাসনাত আবদুল্লাহ জেলা পর্যায়েও কর্মসূচি পালনে দুটি নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনায় বলা হয়, ‘যাতে কোনোভাবেই জনদুর্ভোগ ও কোনো প্রকার সহিংসতা না হয়। লীগের সন্ত্রাসীরা ছদ্মবেশে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করে ছাত্র-জনতার ওপর দোষ চাপাতে চাইবে। লীগের কাউকে পাওয়া গেলে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন। গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক দল ও সংগঠনের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই জমায়েত অনুষ্ঠিত হবে।’
হাসনাত আবদুল্লাহর ঘোষণার পর রাতেই জিরো পয়েন্টে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার’ ব্যানারে বিক্ষোভ করেন বেশ কিছু মানুষ। রাত ১১টার দিকে তাদের সেখানে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। তারা ‘খুনি কেন বাহিরে, মুগ্ধ কেন কবরে,’ ‘নূর হোসেন দিচ্ছে ডাক, খুনি শেখ হাসিনা নিপাত যাক’ এমন বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। শেখ হাসিনার বিচারেরও দাবি জানান এই বিক্ষোভকারীরা।
গতকাল শনিবার আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দেওয়া পোস্টে আজ জিরো পয়েন্টে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি ঘোষণার পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভঙ্গের কোনো প্রচেষ্টাকে অন্তর্বর্তী সরকার বরদাশত করবে না। তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে এ কথা লেখেন।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ফেসবুক পোস্টে আরও লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ বর্তমানে একটি ফ্যাসিবাদী দল। এই ফ্যাসিবাদী দলের বাংলাদেশে প্রতিবাদ করার কোনো সুযোগ নেই। গণহত্যাকারী ও স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার নির্দেশ নিয়ে কেউ সমাবেশ ও মিছিল করার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পূর্ণাঙ্গভাবে মোকাবিলা করবে। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো সহিংসতা বা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভঙ্গের কোনো প্রচেষ্টাকে বরদাশত করবে না।’
গণহত্যাকারী বা নিষিদ্ধ সংগঠনের কেউ কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘গণহত্যাকারী/নিষিদ্ধ সংগঠনের কেউ কর্মসূচি পালন করার চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।’
এদিকে আজকের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ‘অ্যাসিড টেস্ট’ হিসেবে দেখছেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। তারা বলেন, এ কর্মসূচির সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ সহজ হবে। গত ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মাঠের কর্মসূচির ডাক দিতে কর্মীদের ভীষণ চাপ আছে। সেটিও পরখ করা হবে।
জিরো পয়েন্টে দলের নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণকে সমবেত হতে আহ্বান জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ-সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, ‘১০ নভেম্বর আসুন নূর হোসেন চত্বরে জিরো পয়েন্টে, গুলিস্তান, ঢাকায়। আমাদের প্রতিবাদ দেশের মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে, আমাদের প্রতিবাদ মৌলবাদী শক্তির উত্থানের বিরুদ্ধে, আমাদের প্রতিবাদ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে। অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আপনিও অংশ নিন।’
আওয়ামী লীগের ডাকা কর্মসূচি ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে দেওয়া বা জেল-জুলুম-অত্যাচার নির্যাতনের দিকে নতুন করে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে। ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দলের নেতারা দেশে উপস্থিত না থাকায় কর্মীরা ঠিক কী করবেন তা বুঝে উঠতে পারছেন না। তবে দলীয় সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বান এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতাও কারও ভেতরে দেখা যাচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতিমধ্যে ঢাকার বাইরে ও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা ঢাকায় ঢুকেছেনও। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে কর্মসূচিতে অংশ নেবেন, তা না হলে উৎসুক জনতার বেশে কর্মসূচির স্থানের আশপাশে ঘোরাফেরা করবেন।
কেন্দ্রীয় নেতারা দাবি করেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে শহীদ নূর হোসেনের ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ সবসময় শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছে আওয়ামী লীগ। বরাবরের মতো এবারও দিবসটি পালন করবেন তারা। আওয়ামী লীগের এ কর্মসূচি ঘোষণার মধ্য দিয়ে ঢাকায় অনেকটা থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গৌরবগাথা ইতিহাস মুছে ফেলতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। সেটি মুছে ফেলা যাবে না, সেটি মনে করিয়ে দেওয়াও এ কর্মসূচির অংশ।’
আজকের কর্মসূচি আহ্বানের মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের আরও বিপদের মুখে ফেলে দেওয়া হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রতিকূল পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করতে হয় সেটা জানে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কণ্টকাকীর্ণ পথ কীভাবে কুসুমাস্তীর্ণ করে পথ চলতে হয় সেটা জন্মগতভাবে শিখে আসে।’
আওয়ামী লীগ কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন নয় উল্লেখ করে দলটির ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম আমিন বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেওয়া হয়েছে। সত্যিই যদি ফ্যাসিস্ট হয় তাহলে জনগণ আওয়ামী লীগের ডাকে আসবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হবে না বলে অন্তর্বর্তী সরকার যেসব হুমকি-ধমকি দিচ্ছে তাতে তারাই ফ্যাসিস্ট হিসেবে জনগণের কাছে চিহ্নিত হচ্ছে।’
তাদের দলের কোনো কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার অধিকার বর্তমান সরকারের নেই বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অধিকার আছে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করার। আমরা কর্মসূচি ঘোষণা করেছি জনগণ বিবেচনা করবে তারা কী করবে? সরকারের পক্ষ থেকে হুমকি-ধমকি দেওয়ার অধিকার নেই।’
আজকের কর্মসূচিকে দলের জন্য ‘অ্যাসিড টেস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে কর্মসূচি মূলত কর্মী-সমর্থকদের চাপেই আহ্বান করা হয়েছে। কর্মীদের ভীষণ আগ্রহ দেখা গেছে বলেই নীতিনির্ধারকরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর সফলতা-ব্যর্থতা দুটোই আওয়ামী লীগকে আগামীতে চলার নতুন পথ বাতলে দেবে।’
আওয়ামী লীগের কর্মসূচির বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মো. মাইনুল হাসান জানিয়েছেন, কর্মসূচি পালনের জন্য অনুমতি চেয়ে কোনো সংগঠন বা দল চিঠি দেয়নি। তাই মহানগরের আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে কাউকে সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে ডিএমপির গণমাধ্যম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান গতকাল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সমাবেশ বা গণজামায়েত করার জন্য এখন পর্যন্ত পুলিশের কাছে কোনো ধরনের অনুমতি চায়নি। অনুমতির বাইরে যে কোনো দল বেআইনিভাবে সমাবেশ করলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’
