বঙ্গভবন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরানো নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করেন। রিজভীর বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠান বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেন।
এর আগে গতকাল সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও রক্তদান কর্মসূচির অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন রিজভী। বঙ্গভবনের দরবার হল থেকে শেখ মুজিবের ছবি সরানোর প্রসঙ্গ নিয়ে সেখানে কথা বলেন তিনি। রিজভী বলেছিলেন, তিনি মনে করেন, তার (শেখ মুজিবুর রহমান) ছবি নামিয়ে ফেলা উচিত হয়নি। খন্দকার মোশতাক ছবি নামিয়েছিলেন, জিয়াউর রহমান তুলেছিলেন।
রিজভী আরও বলেছিলেন, ‘পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর খন্দকার মোশতাক শেখ মুজিবের ছবি নামিয়ে নিল। জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেন। জিয়াউর রহমান কিন্তু বঙ্গভবনে শেখ মুজিবের ছবি ফিরিয়ে আনেন।’
পরে এই বক্তব্যের সংশোধনী দিয়ে বিবৃতি দেন রিজভী। তিনি বলেন, গতকালকের অনুষ্ঠানে তার দেওয়া বক্তব্য উদ্ধৃত করে ‘বঙ্গভবন থেকে শেখ মুজিবের ছবি সরানো উচিত হয়নি’ শিরোনামে প্রতিবেদন অনলাইনে প্রকাশিত হচ্ছে। গতকাল গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘বঙ্গভবন থেকে শেখ মুজিবের ছবি নামানো হয়েছে’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ হয়। তিনি মনে করেছিলেন, বঙ্গভবনের দরবার কক্ষে যেখানে সব রাষ্ট্রপতির ছবি থাকে, সেখান থেকে শেখ মুজিবের ছবি নামানো হয়েছে। মূলত ছবিটি সরানো হয়েছিল বঙ্গভবনের অন্য একটি অফিস কক্ষ থেকে।
বিএনপির এই জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তার বিবৃতিতে বলেন, ‘শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে শেখ মুজিবের ছবি রাখার বাধ্যতামূলক আইন করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদী আইনের কোনো কার্যকারিতা থাকতে পারে না। অফিস-আদালত সর্বত্রই দুঃশাসনের চিহ্ন রাখা উচিত নয়। অনাকাক্সিক্ষত বক্তব্যের জন্য আমি দুঃখিত।’
বঙ্গভবনের দরবার হল থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সরানো হয়েছে জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম গত রবিবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন।
ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও রক্তদান কর্মসূচির অনুষ্ঠানে রিজভী আরও বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল কায়েম করেছিলেন, স্বাধীনতার পর সব দল নিষিদ্ধ করেছিলেন। গণতন্ত্র হত্যার ধারা তার হাত দিয়ে এসেছে। এর আগে তিনি ৬০-এর দশকে স্বাধিকারের আন্দোলন করেছিলেন। মানুষ তাকে বিশ্বাস করেছিল, ৭০-এ তাকে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু তার অঙ্গীকার তিনি রক্ষা করতে পারেননি। স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি কোনো ভূমিকা রাখেননি। স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে স্বাধিকার আন্দোলনে তার কিছুটা ভূমিকার কথা জনগণ মনে রেখেছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণা তো দিয়েছেন অদম্য সাহসী মেজর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।’
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে একই অনুষ্ঠানে রিজভী বলেন, ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যাদের এক বিন্দু অবদান নেই, তারা অনেকে উপদেষ্টা-সচিব হয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছেন। রক্তের ঋণে আবদ্ধ এই অন্তর্বর্তী সরকার। আজকে যারা সচিব হয়েছেন, তাদের কিন্তু কোনো অবদান নেই। যিনি স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হয়েছেন, তার কিন্তু কোনো অবদান নেই। অবদান তাদের রয়েছে, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন জুলাই-আগস্টে। এর আগে বিএনপি আন্দোলনের পটভূমি রচনা করেছিল। এ পটভূমি রচনা করতে গিয়ে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর জীবন চলে গেছে। অনেকে হারিয়ে গেছেন।’
বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুমায়ুন পারভেজ, সাইফুল ইসলাম হিরু, জাকির, জনি এমন যারা গুম ও ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন, তাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, তাদের অবদান রয়েছে। এতে স্বাস্থ্য সচিবের অবদান নেই। আজকের স্বাস্থ্য উপদেষ্টার অবদান নেই। কিন্তু তারা দেখেছেন, এই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অত্যন্ত বিমাতাসুলভ আচরণ করছে জাতীয়তাবাদী শক্তির বিরুদ্ধে। তিনি (রিজভী) অত্যন্ত মর্মাহত হন, যখন শোনেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য সচিব ড্যাবের চিকিৎসকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘এই যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কত ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, এখনো হাসপাতালে অনেক ছেলে কাতরাচ্ছে, আপনারা কজন দেখতে গিয়েছেন? আপনারা আবার অহংকার করেন। আমরা আপনাদের চিনে রাখছি। আপনারা কারা, আপনারা শেখ হাসিনার দোসর।’
অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ফরহাদ হালিম, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
