৪
ইসলাম সর্বজনীন ও বিশ্ব মানবতার পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংগঠনিক, রাষ্ট্রীয়সহ সব ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ উদার নীতিমালা। যে ব্যবস্থাপনা সব শ্রেণির মধ্যে ঐক্য, সংহতি, শান্তি ও প্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির বাহ্যিক কাঠামো ও বহিরঙ্গে বেশ কিছু বিষয়ের সাদৃশ্য বিদ্যমান। এর মধ্যে আছে সমন্বয়, যোগাযোগ, পরিচালনা, নির্দেশনা, তত্ত্বাবধান ইত্যাদি। যেকোনো ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যদি এই বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে তা হয়ে উঠে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল। আর যেকোনো ক্ষেত্রে এমন সুশৃঙ্খল ও সুন্দরের চর্চার জোর তাগিদ দিয়েছে ইসলাম। তাই কোনো ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না। আর সমন্বয়হীনতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা থেকে বের হতে যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সুন্দর পরিকল্পনা। সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজেই সফলতা আসে না। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজিক জীবন, ধর্মীয় জীবনসহ রাষ্ট্রীয় কাজে সর্বক্ষেত্রেই পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা পরিকল্পনা মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়, পরিকল্পনা সংগঠনের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সমন্বয়ে সাহায্য করে এবং নানাবিধ সমস্যার সমাধান দেয়। আর কোনো কাজের পরিকল্পনা করার পর প্রয়োজন হয় পরামর্শের। ইসলামে পরামর্শের গুরুত্ব অনেক। কোরআনে পরামর্শ করার বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব বিষয়ে পরামর্শের ক্ষেত্রে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। যেখানে তিনি এত বেশি পরামর্শের গুরুত্ব দিতেন, সেখানে আমরা তো এর প্রতি আরও বেশি এর মুখাপেক্ষী।
আল্লাহতায়ালা সব মানুষকে সমান বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সৃষ্টি করেননি। একেক বিষয়ে একেক মানুষকে পারদর্শী করেছেন। পৃথিবীর সব বিষয়ে পারদর্শী, এমন কোনো মানুষ দুনিয়ায় নেই। আর মানুষকে কখনো কখনো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, যখন সে সামনের করণীয় সম্পর্কে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে; কোনটা রেখে কোনটা গ্রহণ করবে, সে বিষয়ে সন্দিহান হয়ে যায়। এমতাবস্থায় আমাদের জন্য বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করে পরামর্শ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা (মুসলমানরা) পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে।’ (সুরা শুরা ৩৮) অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর (গুরুত্বপূর্ণ) বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। অতঃপর আপনি যখন (কোনো বিষয়ে) মনস্থির করবে, তখন আল্লাহর ওপর নির্ভর করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আলে ইমরান ১৫৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যক্তিগত জীবনেও পরামর্শ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। হজরত ফাতেমা বিনতে কাইস (রা.) বলেন, একদা আমি নবী (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করলাম, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান (রা.) ও আবু জাহম (রা.) আমাকে বিবাহের পায়গাম পাঠিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আমি কী করব? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আবু জাহম এমন লোক যে তার কাঁধ থেকে লাঠি নামায় না। আর মুয়াবিয়া তো নিঃস্ব ও গরিব মানুষ। বরং তুমি ওসামা ইবনে জায়েদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও। কিন্তু আমি তাকে পছন্দ করলাম না। পরে তিনি আবার বললেন, তুমি ওসামার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও। কিন্তু আমি তাকে পছন্দ করলাম না। তিনি আবার বললেন, তুমি ওসামার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হও। তখন আমি তার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলাম। আর আল্লাহ এতে তার ঘরে আমাকে বিরাট কল্যাণ দান করলেন। আর আমি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হলাম। (সহিহ মুসলিম)
পারিবারিক, সামাজিক, সাংগঠনিক, রাষ্ট্রীয়সহ যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে পরামর্শের পর প্রয়োজন হয় সবার ঐক্যের। ঐক্য ছাড়া কোনো কাজকে সুন্দর ব্যবস্থাপনায় সম্পাদন করা যায় না। ইসলাম ঐক্যের বিষয়ে অত্যন্ত জোর দিয়েছে। পৃথিবীর সব মানুষ তো আদি পিতা হজরত আদম (আ.) এবং আদি মাতা হাওয়া (আ.) বংশের অন্তর্ভুক্ত। এ কারণেই জগতের সব মানুষ পরস্পর ভাই ভাই। একই পিতা-মাতা থেকে জন্মগ্রহণ করে বংশপরম্পরায় মানুষ বিভিন্ন জাতি-ধর্ম, দল-মত, সম্প্রদায় ও গোত্রে বিভক্ত হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পার।’ (সুরা হুজুরাত ১৩)
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে ইমানের পরে মুমিনদের সবচেয়ে বেশি তাগিদ দেওয়া হয়েছে ঐক্যবদ্ধ থাকার বিষয়ে। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা আল্লাহর রজ্জু ইসলাম ও কোরআনকে ঐক্যবদ্ধভাবে আঁকড়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৩) যারা মতানৈক্য করে তাদের বিষয়ে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সেসব লোকের মতো হয়ো না, যাদের কাছে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য নিদর্শন আসার পরও তারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে এবং নানা ধরনের মতানৈক্য সৃষ্টি করেছে; তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৫) বর্তমান সময়ে আমাদের সামাজিক ও জাতীয় নানা বিষয়ে অনৈক্য লক্ষ করা যাচ্ছে। এটা ইসলামের শিক্ষা হতে পারে না। আমাদের এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এজন্য প্রয়োজন পরামর্শের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলা। তাহলে আমাদের সামাজিক ও জাতীয় সব কাজ সুন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পাদন করতে পারব। মহান আমাদের সেই তওফিক দান করুন।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
