ছেলেদের ফুটবল নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে হবে

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৪, ১২:৫৩ এএম

সাউথইস্ট ব্যাংককে মেয়েদের সংবর্ধনা দিতে আপনি উদ্বুদ্ধ করেছেন। নির্বাচিত হয়ে এসে এত কম সময়ে আপনার এই উদ্যোগের পেছনের গল্পটা শুনতে চাই ছাইদ হাছান কানন : নির্বাচিত হওয়ার পরপরই মেয়েদের খেলা দেখতে নেপালে গিয়েছিলাম। ফাইনালে আমাদের মেয়েদের এত চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে দেখে মনটা ভরে গিয়েছিল। আমি ফেডারেশনের একজন কর্মকর্তা। একই সঙ্গে একজন সাবেক ফুটবলার। সেই দায়বদ্ধতা থেকে এই সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের জন্য কিছু করার পরিকল্পনা করি। দেশে ফিরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়ে অনুরোধ করি মেয়েদের পাশে দাঁড়াতে। এভাবেই এই ব্যাংকটি এগিয়ে এসেছে। এই ব্যাংকের মাধ্যমে মেয়েদের জন্য কিছু করতে পেরে সত্যি গর্বিত।

নতুন কমিটির প্রথম সভায় তো আপনাকে নারী ফুটবলের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তাহলে কেন এই উদ্যোগ নিলেন?

কানন : একজন সাবেক ফুটবলার হিসেবে আমি মনে করেছি এটা আমার দায়িত্ব। কারণ নারী ফুটবলই আমাদের ফুটবলের বড় বিজ্ঞাপনে রূপ নিয়েছে। তাছাড়া এই মেয়েগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থা ভালো নয়। বেশিরভাগই দরিদ্র ঘরের সন্তান। আমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে গিয়ে ওদের বাস্তব অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করেছি। বলেছি, ওদের যদি একটু উৎসাহ দেওয়া যায় তবে আরও বড় পর্যায়ে ওরা ভালো করতে পারবে। একেবারে নিজের তাগিদেই এটা করা।

এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপনার কীভাবে যোগাযোগ?

কানন : সাভারে এই ব্যাংকের একটি শাখার ব্যবস্থাপক আমার পূর্বপরিচিত ছিলেন। তিনি একটা ফুটবল অ্যাকাডেমি পরিচালনা করেন। আমাকে সেই অ্যাকাডেমির উদ্বোধন করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। মেয়েরা দ্বিতীয়বারের মতো সাফ জয়ের পর সেই ভদ্রলোক আমাকে এই ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করতে বলেন। একই এই ব্যাংকের বড় পদে আমার এক বন্ধুস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তার মাধ্যমে যোগাযোগ হয় চেয়ারম্যান-এমডি পর্যায়ে। একটা সময় ফুটবল খেলার সুবাদে তারা আমাকে চিনতে পারেন। আমার কথাগুলো তারা খুব ইতিবাচকভাবে নেন এবং মেয়েদের জন্য কিছু করার নিশ্চয়তা দেন। এরপর বিষয়টি আমাদের নতুন সভাপতিকে জানাই। তিনি ব্যাংকের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই সংবর্ধনার ব্যবস্থা করেন। এই মেয়েদের জন্য কিছু করতে পেরে সত্যি আমি আনন্দিত। সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রতি কৃতজ্ঞতা, তারা আমাকে শুরু থেকেই ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। এভাবে যদি আমরা সবাই এগিয়ে আসতে পারি, তবে ভবিষ্যতে আমরা এশিয়ান ও বিশ্ব পর্যায়ে ভালো কিছুর আশা করতেই পারি।

আপনি একসময় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সদস্য ছিলেন। এরপর একটা বড় সময় আপনাকে দেখা যায়নি। এই সময়টায় কীভাবে কেটেছে?

কানন : ফুটবল দিয়েই কিন্তু আমার পরিচয়। একটা সময় দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছি। ফুটবলের সোনালি সময়ে ক্লাব ফুটবলেও বড় দলের হয়ে খেলেছি বলেই এখনো মানুষ আমাকে চেনে-জানে। ২০০১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমি ফেডারেশনের সদস্য ছিলাম। ২০০৩ সালে ছিলাম একমাত্র সাফজয়ী বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার। তবে রাজনৈতিক কারণে ২০০৮ সালের পর থেকে ১৫-১৬ বছর বাফুফের বাইরে থাকতে হয়েছে। এই সময়টায় বাফুফেতে থাকিনি ঠিক, তবে ফুটবলকে ছাড়া থাকা সম্ভব ছিল না। আমি কোচিং পেশার সঙ্গে জড়িত আছি। এএফসি এ লাইসেন্স করেছি। এ ছাড়া গোলকিপিংয়ের ওপর লেভেল ১ ও ২ করা আছে। মোহামেডান দলের গোলকিপিং কোচের কাজ করছি চার মৌসুম ধরে।

মেয়েদের ফুটবলে এখনো অনেক সীমাবদ্ধতা। তারপরও তারা দেশের জন্য নিয়মিতই সাফল্য এনে দিচ্ছেন। এটা যেমন ঠিক, পাশাপাশি একটি ফুটবল জাতির প্রথম পরিচায়ক কিন্তু ছেলেদের। যেখানে আমরা অনেকটা পিছিয়ে গেছি। নিশ্চয়ই এটাও আপানাকে ভাবায়?

কানন : আমি আবারও বলছি, মেয়েদের ফুটবল দিয়েই এ দেশের ফুটবলটা এখন টিকে আছে। তবে ফুটবল বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে আমাদের ছেলেদের ফুটবলে ভালো করতেই হবে। আমরা যখন খেলতাম, সেটা জাতীয় দল হোক কিংবা ক্লাব দল, গ্যালারি উপচে পড়ত দর্শকে। গতকাল (বুধবার) বাংলাদেশ-মালদ্বীপ ম্যাচেও কিন্তু অনেক দর্শক হয়েছিল। ঢাকা শহরের এক প্রান্তে অনেক কষ্ট করে তারা উপস্থিত হয়েছিল একটা ভালো ফলের আশায়। তাতেই বোঝা যায়, ফুটবল নিয়ে মানুষের ভালোবাসা অটুট আছে। এই জিনিসটা হয়তো এখনকার ফুটবলাররা সেভাবে অনুভব করতে পারছেন না। মানুষ মাঠে যায় প্রিয় দলের জয় দেখতে। কিন্তু আমরা একের পর এক ম্যাচে তাদের হতাশ করছি। ভুটানের বিপক্ষে এক ম্যাচ জেতার পর অন্য ম্যাচে হেরেছি। মালদ্বীপের বিপক্ষে তো প্রথম ম্যাচটাই হেরে বসলাম। এখন আমাদের আসলে পুরুষ ফুটবল নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবতে হবে।

ছেলেদের ফুটবল নিয়েও নিশ্চয়ই কিছু করার ইচ্ছে আছে?

কানন : বিগত ১৬ বছরে আমাদের ফুটবলটা কেবল পিছিয়েছে। সেভাবে কোনো কাজই হয়নি। আমরা যারা সাবেক ফুটবলার আছি, ফুটবলের জন্য করার অনেক কিছু আছে আমাদের।  ব্যক্তিগতভাবে আমি তো চাই ফুটবলে অনেক সময় দিতে। এখন যদি কাজের পরিবেশ পাই, আমাকে যদি সুযোগ দেওয়া হয়, তবে অবশ্যই এমন কিছু করব, যাতে ভবিষ্যতে আমরা শক্তিশালী একটা জাতীয় দল গড়ে তুলতে পারি।

আপনাকে দেশব্যাপী অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবল টুর্নামেন্ট করার দায়িত্ব দিয়েছে নতুন কমিটি। এ নিয়ে কী ভাবছেন?

কানন : শুধু দেশব্যাপী বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। টুর্নামেন্ট তো আমরা করবই। একই সঙ্গে একটা টেকনিক্যাল টিম থাকবে, যারা সারা দেশে ঘুরে ঘুরে প্রতিভাবান ফুটবলার তুলে আনবেন। এই বাছাইকৃতদের সুষ্ঠু পরিচর্যার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে জাতীয় দলে তারা প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। কেবল অনূর্ধ্ব-১৭ নয়, অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৮, অনূর্ধ্ব-২০ বয়সভিত্তিক দলগুলোকে সঠিক পরিচর্যার মধ্যে আনতে হবে এবং তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই দেখবেন খেলোয়াড় সংকট কেটে যাবে। তাতে জাতীয় দল শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠবে। যারা ভবিষ্যতে সাফ, এশিয়ান পর্যায়ে সাফল্য এনে দেবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত