বিদ্যুৎ ও জ¦ালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর ৬(২) ধারায় ক্রয়সংক্রান্ত এবং ৯ ধারায় দায়মুক্তির বিধানকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে তা বাতিল করে দিয়েছে উচ্চ আদালত। এ দুই বিধানের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে করা রিট আবেদনের ওপর দেওয়া রুল মঞ্জুর করে গতকাল বৃহস্পতিবার এ রায় দেয় বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ।
এ দুই ধারার বিধান অনুযায়ী, এই আইনের অধীনে করা কোনো কাজ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না এবং চুক্তি করার বিষয়ে মন্ত্রীর একক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় করা এ আইনটি ‘কুইক রেন্টাল’ আইন নামে পরিচিতি পায়। আইনের এই বিধানের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুতের উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে দরপত্র ছাড়াই প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়। গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৮ আগস্ট আইনটি স্থগিতের ঘোষণা দেয়।
বিদ্যুৎ ও জ¦ালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর ৬(২) ধারায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীর সম্মতি গ্রহণক্রমে যেকোনো ক্রয়, বিনিয়োগ পরিকল্পনা বা প্রস্তাব ধারা-৫-এ বর্ণিত প্রক্রিয়াকরণ কমিটি সীমিতসংখ্যক অথবা একক কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ ও দর-কষাকষির মাধ্যমে ওই কাজের জন্য মনোনীত করে ধারা-৭-এ বর্ণিত পদ্ধতি অনুসরণে অর্থনৈতিক বিষয় বা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রেরণে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন কৃত বা কৃত বলে বিবেচিত কোনো কার্য, গৃহীত কোনো ব্যবস্থা, প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশের বৈধতা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
দুই ধারার বিধানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গত ২৭ আগস্ট হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক ও আইনজীবী মো. তাইয়্যেব উল ইসলাম সৌরভ। আবেদনের যুক্তিতে আইনজীবীরা তখন বলেছিলেন, ৬(২) ধারা অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তার একক বিবেচনায় যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবেন। মন্ত্রীকে যাকে ইচ্ছা তাকে যত ইচ্ছা টাকায় চুক্তি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আবার ৯ ধারায় চুক্তি, অর্থ লেনদেন এসব ব্যাপারে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কোনো মন্ত্রীর এ ধরনের একক ক্ষমতা থাকতে পারে না। আদালতের এখতিয়ার রদ করতে পারে এমন কোনো আইন হতে পারে না। শুনানির পর গত ২ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এ দুই ধারা কেন অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ড্রাফটিং বিভাগের সচিব, অর্থ সচিব, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ সচিব, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে গতকাল এ রায় ঘোষণা করা হলো।
রায়ে আদালত বলে, ‘আইনের ৬(২) ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হলো। দেশের মানুষ প্রকৃতভাবে সার্বভৌম। সংবিধান আইনের শাসনের ঘোষণা দিয়েছে। ৯ ধারা অনুসারে চুক্তির বিষয়ে কেউ দায়ী হলে আইনে বিচারিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে। অথচ সংবিধানের ১৪৫(২) অনুচ্ছেদে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের নির্বাহী কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যধারা গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কাজেই ৬(২) ও ৯ ধারাটি সংবিধানের ১৪৫ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হওয়ায় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই ধারাটি বাতিলযোগ্য।’ রায়ে হাইকোর্ট আরও বলে, ‘৬(২) অধীনে কিছু কুইক রেন্টাল প্রতিষ্ঠা হয়েছে। যেগুলো এখন পর্যন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আইনি জটিলতা এড়াতে এ ক্ষেত্রে এ ধারায় সংশ্লিষ্ট চুক্তির সব কার্যক্রম সাময়িকভাবে মার্জনা করা হলো। তবে চুক্তির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কার্যক্রম কিছু শর্তসাপেক্ষে আবার দেখার সরকারের অধিকার থাকবে।’
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ড. শাহদীন মালিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মনজুর আলম। রায়ের পর শাহদীন মালিক সাংবাদিকদের বলেন, ‘কুইক রেন্টালের নামে অনেক প্রকল্প হয়েছে। এর বিশেষত্ব হলো কোনো প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ সরবরাহ করুক বা না করুক পুরো টাকা পাবে। অর্থাৎ ১০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০ মেগাওয়াট সরবরাহ করলেও টাকা পাবে ১০০ মেগাওয়াটের। এটা আসলে লুটপাটের সুবিধার আইন হয়ে গিয়েছিল। সেজন্যই আদালত ৬(২) ধারাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আইনে এক ব্যক্তিকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো প্রজাতন্ত্রে হতে পারে না।’
শাহদীন মালিক বলেন, ‘আদালত এটাও বলেছে, ৬(২) ধারার অধীনে ব্যক্তিগত উদ্যোগে যে চুক্তিগুলো হয়েছে, এগুলো সরকার পুনর্মূল্যায়ন করতে পারবে। যাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, তাদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় যেতে পারবে।’
