বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর কী কী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, ছাত্র-জনতার ওপর বলপ্রয়োগের নির্দেশদাতা পুলিশ কর্মকর্তা এবং মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা বাস্তবায়নকারী পুলিশ সদস্যদের তালিকা নিয়ে লুকোচুরি করছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। প্রয়োগ করা অস্ত্র ও অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের তালিকা নিয়ে সিএমপির কয়েকজন কর্মকর্তা ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেছেন। কেউ বলেছেন, তাদের হাতে তালিকা আছে তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের না জানিয়ে সে তথ্য তারা দিতে পারবে না। অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো তদন্ত চলছে, এ অবস্থায় এসব তথ্য প্রকাশিত হোক সেটা তারা চাইছেন না।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের নির্দেশদাতা হিসেবে সারা দেশে ১১০ জন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে ৫৭ হাজার ৬১৩ রাউন্ড বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের গুলি। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের দমাতে মাঠে ছোড়া হয়েছে ১ হাজার ৪৭৯টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়েছে ১৪ হাজার ২২৩ রাউন্ড।
জানা গেছে, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের সব ইউনিট আলাদাভাবে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করে একটি তালিকা তৈরি করেছে।
গতকাল সোমবার বিকেলে ওই তালিকা চাইতে গেলে ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেন সিএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর বলপ্রয়োগে নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা পুলিশ সদস্যদের তালিকা চাইলে সিএমপির ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) হুমায়ন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা সরাসরি পুলিশ সদর দপ্তর দেখছে।’ আন্দোলনে কী ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার হয়েছে এবং তা পরিমাণে কতÑ এমন প্রশ্নের জবাবে সিএমপির অন্যতম শীর্ষ এ কর্মকর্তা বলেন, ‘তালিকা দেওয়া যাবে না। আপনি (প্রতিবেদক) লিখে নেন।’ তবে কিছুক্ষণ পর বলেন, ‘আপনি এডিসি পিআরও (জনসংযোগ কর্মকর্তা) কাজী মো. তারেক আজিজের কাছে যান। ব্যক্তিগতভাবে আমি এ তথ্য দিতে পারি না।’
এরপর এ প্রতিবেদক যান সিএমপির জনসংযোগ কর্মকর্তা এডিসি কাজী মো. তারেক আজিজের কাছে। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে তথ্য আছে। তবে কমিশনার স্যারের অনুমতি ছাড়া দিতে পারব না।’ এরপর অনুমতি নিতে তিনি যান পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজের দপ্তরে। ১০ মিনিট পর ফিরে এসে বলেন, ‘ভাই, আন্দোলনে কী ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়টি জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করছেন। তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। তাই এখনো আপনাকে তথ্য দেওয়া যাচ্ছে না।’
একই বিষয়ে সিএমপির উপকমিশনার (অপরাধ) রইছ উদ্দিন মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব তথ্য আমার কাছে আছে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমি তালিকা দিতে পারব না।’
পুলিশ সদর দপ্তরে একটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের সব ইউনিট আলাদাভাবে পুলিশের কর্মকা- নিয়ে তদন্ত করেছে। আন্দোলনের সময় পুলিশ কী ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, কত সংখ্যক গুলি, টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করেছে, সে তথ্য বের করেছে। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে পুলিশের কোন কোন সদস্য অ্যাকশনে ছিল তাদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের কারা নির্দেশ দিয়েছেন তাদের বিষয়েও তথ্য উদঘাটন করা হয়েছে।
সূত্রটি জানায়, ১ হাজার ৭১৭ জন পুলিশ সদস্যের অস্বাভাবিক বলপ্রয়োগে জড়িত থাকার তথ্য অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার, অতিরিক্ত উপকমিশনার, সহকারী পুলিশ কমিশনার এবং ওসিসহ ১৮২ জন সদস্য রয়েছেন বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।
