সঠিক দাবি বেঠিক সংস্কৃতি

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০২৪, ১২:২৮ এএম

দীর্ঘ সময় স্বৈরশাসন চালানোর পর গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। পতন হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের। জনগণের ভোটাধিকারসহ বিভিন্ন ধরনের জুলুমের সঙ্গে যুক্ত ছিল সেই সরকার। সেই শাসনামলের অবসানের পর মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বঞ্চনার প্রকাশ হচ্ছে। যেদিক দিয়ে যে পারছে, নিজের অধিকার আদায়ে সক্রিয় হচ্ছে। মুশকিল হচ্ছে, বাংলাদেশে অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় নামাই সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা হয়ে গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দূরত্ব, জবাবদিহির অভাব, সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি কারণে নিয়মতান্ত্রিক দাবি-দাওয়ার প্রতি আস্থা রাখা কঠিন। এমতাবস্থায়, রাস্তায় নেমে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে কর্র্তৃপক্ষকে জিম্মি করার মাধ্যমে দাবি আদায় করাটাই সবচেয়ে মোক্ষম উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। এই চিত্র সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে শ্রমঘন এলাকাগুলোতে। সরকার পরিবর্তনের পর বিগত সরকারের সঙ্গে যুক্ত অনেক মালিক পলাতক, অনেকে শ্রমিকদের পাওনা মেটাতে নয়ছয় করছেন। কেউ কেউ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে ইচ্ছা করেই বকেয়া রাখছেন বলে অভিযোগ আছে। আবার এই অবস্থার সুযোগও কেউ নিচ্ছেন। ব্যবসা মন্দের অজুহাত দিচ্ছেন কেউ কেউ। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক নিজেদের ন্যায্য পাওনা ও শ্রমের মূল্য পাচ্ছেন না। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যর ঊর্ধ্বগতিসহ নানারকম সামাজিক সমস্যায় তাদের জীবন চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে বেতন ও সুবিধাবঞ্চিত অসহায় শ্রমিকরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছেন। রাস্তায় নামা ছাড়া তার আর কোনো উপায় দেখছেন না। নিরুপায় শ্রমিকদের মরিয়া কার্যক্রমের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত তিন মাসে অন্তত ২৫ বার ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও চন্দ্রা-নবীনগর মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন পরপর অবরোধের কারণে অসহনীয় দুর্ভোগে পড়ছেন এসব পথে চলাচলকারী হাজারো যানবাহনের যাত্রীরা। এর প্রভাব পড়ছে ঢাকাসহ সারা দেশের জনজীবন ও অর্থনীতিতে। সর্বশেষ বকেয়া বেতন আদায় করতে গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর এলাকার বেক্সিমকো গ্রুপের শ্রমিকরা গত চার দিন ধরে চন্দ্রা-নবীনগর সড়ক অবরোধ করে রেখেছেন। গত অক্টোবর মাসের বকেয়া বেতন না পাওয়া পর্যন্ত তারা সড়ক থেকে উঠবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন কারও কথাই শুনছেন না তারা। ব্যাপারটা আরও জটিল হচ্ছে এ কারণে যে, রাস্তা অবরোধ করে সাফল্যও মিলছে। ফলে এক কারখানার শ্রমিকদের সাফল্যে অন্যরা উদ্বুদ্ধ হয়ে আরও বেশি বেশি অবরোধের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করছেন।

সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরীর টিএনজেড পোশাক কারখানার শ্রমিকরা দেশের অন্যতম ব্যস্ততম ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক তিন দিন ধরে অবরোধ করে রাখেন। এতে কয়েক হাজার শ্রমিকের কাছে গাজীপুর-ঢাকাসহ উত্তরবঙ্গে চলাচলকারী লাখ লাখ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় শ্রম মন্ত্রণালয়, শিল্প পুলিশ এবং বিজিএমইএর সহযোগিতায় টিএনজেড পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা হয়। টিএনজেডের সফলতার প্রভাবে আরও অন্তত ২০টি কারখানায় অনুরূপ কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। শ্রমিক নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, গাজীপুরে বেশিরভাগ কারখানায় বড় কর্মকর্তাদের সঙ্গে শ্রমিকদের একটা দূরত্ব ছিল। দাবির বিষয়ে কথা বলতে শ্রমিকরা সেই সময় ভয় পেতেন। এখন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শ্রমিকরা তাদের দাবি নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। সড়ক অবরোধ করলেই সবার টনক নড়ে, সমস্যার সমাধানও হয়। শ্রমিকরা বিজিএমইএর ভবনে গিয়েও কোনো সুরাহা পাননি। তাই বাধ্য হয়েই শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের আরেকটি অংশ মনে করে, শ্রমিকদের যে দাবি-দাওয়া এবং পাওনা, তা খুব বেশি নয়। এসব দাবি মেটাতে যে অর্থের প্রয়োজন তা মালিকদের অল্প কিছু সম্পদ বিক্রি করেই জোগাড় করা সম্ভব। এ ব্যাপারে সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা নিষ্ঠার সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে সমস্যা এত বড় হওয়ার কথা নয়।

গণতান্ত্রিক পরিবেশে দাবি-দাওয়ার জন্য আন্দোলন করা নাগরিক অধিকার। তবে সেই অধিকারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ থাকতে হয়। দায়িত্বরত কর্র্তৃপক্ষকে জবাবদিহিমূলক হতে হয়। শ্রমিকরা যাতে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ে মালিকদের সঙ্গে একই সমতলে এসে আলোচনা করতে পারেন এই ব্যাপারটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার ও সরকারের তরফে নিয়োগ করা প্রশাসনের। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মানা যেমন জরুরি, নাগরিক ভোগান্তি যাতে না হয় তাও নিশ্চিত করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত