আমরা যারা নিজেদের সভ্য (?) বিশ্বের সাধারণ একজন সদস্য মনে করি, তাদের পাশ্চাত্য দেশগুলো তিনটি ক্ষেত্রে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলো হলো যুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিকের সুরক্ষার জন্য যে জেনেভা কনভেনশন (১৯৪৯) তৈরি করা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে (এবং এখন ইউক্রেনে) তা মোটেও কার্যকর করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক অস্ত্রের অপসারণ সংক্রান্ত চুক্তি (Non-proliferation of Nuclear Weapons, NPT) যা ১৯৭০ সালে ঢোল বাজিয়ে বলবৎ করা হয়েছে, সেটি আর কোনো অর্থ বহন করে না। অন্তত ১৯১টি দেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে অথবা মৌখিক সায় দিয়েছে। তৃতীয়ত, পাশ্চাত্য কর্র্তৃক সবচেয়ে বেশি প্রচারিত (প্রোমোটেড/প্রোপাগেইটেড) বুড়ো আঙুল (পড়ুন মুলা) হলো গণতন্ত্র, যা আর চর্চিত হচ্ছে না। করপোরেট বিশ্ব, মেগা-করপোরেট জায়ান্টদের স্বার্থরক্ষা করতেই পাশ্চাত্যের তথাকথিত গণতান্ত্রিক নেতারা এখন নিজেদের-সহ অন্য সবার ঘুম হারাম করছেন।
এমন এক প্রেক্ষাপটে আধা-বৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্র যখন হামাস/হিজবুল্লাহ নিধনের প্রতিজ্ঞায় গত ১৩ মাসে গাজায় ৪৪ হাজার মানুষ নিধন করেছে এবং লেবানন ও সিরিয়ায় যে নির্মম হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে করে ইরানের পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ বাধল বলে থিঙ্কট্যাঙ্ক ও সচেতন নাগরিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। আর সেই আশঙ্কায় ঘি ঢেলে দিয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, তার দেশ ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে নতুন হাইপারসনিক ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে যাবে। অর্থাৎ, রাশিয়া ইউক্রেনে এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়ে যেতে থাকবে। রাশিয়ার কাছে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এদিকে ইউক্রেন জানিয়েছে, রাশিয়ার এই অস্ত্র মোকাবিলায় তারা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরিতে কাজ শুরু করেছে। ইউক্রেনে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) দিয়ে হামলাটি (বৃহস্পতিবার) ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় নিপ্রো শহরে চালানো হয় বলে দাবি করেছে কিয়েভ। তা সত্যি হলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তিশালী এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হলো। তাই এই হামলাকে ‘নজিরবিহীন’ বলে উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু নজিরবিহীন নয়, আইসিবিএম (Inter-continental Ballistic Missile) ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যুক্ত হলো। এর কয়েকদিন আগে গত দু-দফায় প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তৈরি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এটিএসিএমএস দিয়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছিল ইউক্রেন। তখনই এ নিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল মস্কো। এরপর, ক্রেমলিন এই হামলা চালাল। ইউক্রেন মার্কিনিদের তৈরি অঞঅঈগঝ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার একটি অস্ত্রাগারে আঘাত করেছে বলে জানা গেছে। ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার ঠিক আগ দিয়ে বাইডেন প্রশাসন এই মারণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়াতে আক্রমণ করার মাধ্যমে দুটি কাজ করেছেন। প্রথমটি হলো, রাশিয়াকে উসকে দেওয়া যাতে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ানো যায়, অস্ত্রের ব্যবসা চাঙ্গা করা যায় আর দ্বিতীয়টি হলো ট্রাম্প যে নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছিলেন তিনি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে দেবেন, সেটিকে জটিল করে রিপাবলিকানদের একটু ঘোল খাওয়ানোর চেষ্টা করা। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এটিএসিএমএস-এর সরবরাহ বেশি নেই। তাই কিয়েভ রাশিয়ার গভীরে আঘাত হানতে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে রাতারাতি পরিবর্তন আনতে পারবে না। এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ৩০০ কিলোমিটার (১৯০ মাইল) হামলা করা যেতে পারে। আর বাইডেন জেলেনস্কিকে দূরপাল্লার আমেরিকান অস্ত্র ব্যবহার করার জন্য সবুজ সংকেত দেওয়ার ঠিক দুদিন পরে ইউক্রেন এই আক্রমণ চালায়।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা : ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টল চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে মোতায়েন সোভিয়েত রেড আর্মির বিশাল বহর এবং সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্টালিনের অবিশ্বস্ততার আশঙ্কায়, পশ্চিম ইউরোপে একটি গুরুতর হুমকি তৈরি হয়। যুদ্ধ শেষে এপ্রিল-মে (১৯৪৫) নাগাদ, ব্রিটিশ সশস্ত্র বাহিনী ‘অপারেশন আনথিঙ্কেবল’ বলে একটি কৌশলপত্র তৈরি করে, যেটিকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দৃশ্য বলে মনে করা হয়। এর প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, রাশিয়ার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটিশদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া। পরিকল্পনাটি ব্রিটিশ চিফস অব স্টাফ কমিটি সামরিকভাবে অসম্ভব বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেন-রাশিয়ার বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নতুন যুদ্ধের হিসাব অনেকটাই বদলে গেছে। রাশিয়ার এই আগ্রাসনের কারণে ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত অধিকাংশ রাষ্ট্র, নানা ধরনের সামরিক সহায়তা প্রদান করে চলেছে। ইউক্রেনকে ন্যাটোভুক্ত করা হবে বলে আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার ঠিক পাশেই এমন একটি সদস্য রাষ্ট্রের অবস্থান দেশটির জন্য মোটেও সুখকর নয়। রাশিয়া, তাই হুমকি দিয়ে বলেছে, ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা সরবরাহকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হবে। ইউক্রেনকে সামরিক জোটে নেওয়ার মানে হবে তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ শুরু করছে। সিনিয়র রাশিয়ান রাজনীতিবিদরা, প্রেসিডেন্ট পুতিন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টির নেতা দিমিত্রি মেদভেদেভসহ অনেকে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, পাশ্চাত্যের এই কৌশলকে তারা ব্যাপকভাবে পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল হিসেবে দেখছেন। তারা ইঙ্গিত করে বলেছেন যে, রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে যদি ইউক্রেন/ন্যাটো ‘রেডলাইন’ অতিক্রম করে। সম্প্রতি রাশিয়ার মূল ভূখ-ের ভেতরে আক্রমণ করাকে রাশিয়া রেডলাইন অতিক্রম হিসেবেই বিবেচনা করছে।
এত কিছু করার পরে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ন্যাটো মহাসচিব জেনস স্টলটেনবার্গ-সহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর কর্মকর্তারা এই সংঘাত যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপান্তরিত না হয় তার ওপর জোর দিচ্ছেন বলে প্রচার চালাচ্ছেন। পাশাপাশি, ন্যাটো সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন যে, যুদ্ধে একে অপরকে রক্ষা করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে সতর্ক করেছে যে, দেশটি ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে ‘বিপর্যয়কর’ পরিণতি ভোগ করতে হবে। প্রাক্তন সিআইএ পরিচালক ডেভিড পেট্রাউস বলেছেন, ন্যাটো সম্ভবত ইউক্রেনের সমস্ত রুশ বাহিনীকে ধ্বংস করে প্রতিক্রিয়া জানাবে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনা রাশিয়া এবং ন্যাটোর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি করেছে। যেমন রাশিয়া কর্র্তৃক ন্যাটো আকাশসীমা এবং পোল্যান্ডে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণ ঘটানো। গত বছর প্রথম দিকে রাশিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শেষ কিস্তির পারমাণবিক চুক্তিতে রাশিয়া অংশগ্রহণ করেনি। উল্টো, বেলারুশে রাশিয়ান কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে মস্কো।
পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ান হুমকিকে ‘ভয়’ দেখানোর একটি উপায় হিসেবে দেখছে, যাতে করে পশ্চিমাদের ইউক্রেনকে সাহায্য করা থেকে বিরত রাখা যায়। ক্রমবর্ধমান ভয়ে, ন্যাটো দেশগুলো ইউক্রেনে উন্নত অস্ত্র পাঠানো থেকে সাময়িকভাবে যাতে বিরত থাকে এবং ইউক্রেনকে রাশিয়ার ভেতরে ন্যাটো আক্রমণ করতে নিষেধও করে। তবে, জুলাই ২০২৪ সাল থেকে তারা ইউক্রেনকে রাশিয়ায় সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য অস্ত্র ব্যবহার করার অনুমতি দেয় (কেবলমাত্র আত্মরক্ষার জন্য সীমান্ত বরাবর)। রাশিয়ার সরকার ন্যাটোর এই হুমকি আমলে নেয়নি, যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্রেমলিন বর্ণিত ‘লালরেখা’ অতিক্রম করেছে ইউক্রেন। কিন্তু রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, তার দেশ ইউক্রেনের রণক্ষেত্রে নতুন হাইপারসনিক ওরেশনিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আক্রমণ চালিয়ে যাবে। অর্থাৎ, রাশিয়া ইউক্রেনে এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা থামাবে না। রাশিয়ার কাছে এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। এদিকে, ইউক্রেন জানিয়েছে, রাশিয়ার এই অস্ত্র মোকাবিলায় তারা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরিতে কাজ শুরু করেছে। পুতিন বলেছেন, মার্কিন ব্যালিস্টিক ও ব্রিটিশ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ায় ইউক্রেনের হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই হামলা চালানো হয়েছে। তিনি এক ভাষণে ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে একটি সফল পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, আরও পরীক্ষার পরিকল্পনা আছে তার। বলেন, ‘আমরা এসব পরীক্ষা চালিয়ে যাব, পরিস্থিতি এবং রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য তৈরি হুমকির ধরনের ওপর নির্ভর করে যুদ্ধক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করব। এ ধরনের অস্ত্রের যথেষ্ট মজুদ আমাদের আছে।’ এদিকে, শুক্রবার রাতে এক ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়া উত্তেজনা বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এরই মধ্যে নতুন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন, যা নতুন হুমকি থেকে জীবন রক্ষা করবে।’
পরমাণু অস্ত্রে ভরে গেছে পৃথিবী : রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন গত সপ্তাহে বিস্তৃত পরিসরে ট্র্যাডিশনাল আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় পারমাণবিক হামলার শর্ত হ্রাস করে দিয়েছেন। দুজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র বলছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইউক্রেনকে রাশিয়ার গভীরে আঘাত করার জন্য মার্কিনি অস্ত্র ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়ার পর পুতিন এই পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছেন। এদিকে, রাশিয়া কয়েক মাস ধরে পশ্চিমাদের সতর্ক করে আসছিল যে ওয়াশিংটন যদি ইউক্রেনকে রাশিয়ার গভীরে মার্কিন, ব্রিটিশ এবং ফরাসি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার অনুমতি দেয়, তবে মস্কো সেই ন্যাটো সদস্যদের ইউক্রেনের যুদ্ধে সরাসরি জড়িত বলে বিবেচনা করবে। কোন দেশে কতটি পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে : ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস (এফএএস) এর এক অনুমান অনুযায়ী, রাশিয়ার সামরিক মজুদে আনুমানিক ৪,৩৮০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। আর সেখানে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ১,২০০টি অতিরিক্ত ওয়ারহেড ধ্বংসের অপেক্ষায় রয়েছে। এদিকে, এ বছরের জুলাইয়ে ইউএস এনার্জি ডিপার্টমেন্ট একটি ডিক্লাসিফিকেশন ঘোষণায় বলেছে যে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মার্কিন ‘সক্রিয়’ এবং ‘নিষ্ক্রিয়’ ওয়ারহেডের মোট সংখ্যা ৩,৭৪৮। মজুদকৃত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রয়োগে যথার্থ নয় এমন ওয়ারহেড আর ধ্বংসের অপেক্ষায় রয়েছে আরও ২,০০০টি ওয়ারহেড। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, চীনের রয়েছে ৫০০টি পারমাণবিক অস্ত্র, ফ্রান্সের ২৯০টি, যুক্তরাজ্যের ২২৫টি, ভারতের ১৭২টি, পাকিস্তানের ১৭০টি, ইসরায়েলের ৯০টি এবং উত্তর কোরিয়ার ৩০টি।
পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনা : মধ্যপ্রাচ্য বা এ ধরনের অঞ্চলভিত্তিক (রাশিয়া-ইউক্রেন) যুদ্ধ সারা পৃথিবীতে উত্তেজনা ছড়ালেও পারমাণবিক যুদ্ধ বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা এই মুহূর্তে ক্ষীণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কেননা, পারমাণবিক অস্ত্র এখন পর্যন্ত তৈরি করা সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক, অমানবিক এবং নির্বিচারে ক্ষতিসাধনে পারঙ্গম, যা আমরা হিরোশিমা ও নাগাশাকি শহরে প্রত্যক্ষ করেছি। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে তেজস্ক্রিয়তা অবিরামভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাতে মানব ও অন্যান্য প্রাণীর জিনের মারাত্মক ক্ষতি হয়। একটি বড় শহরে একটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে মুহূর্তে। এর ব্যবহার বিশ্ব জলবায়ুকে ভয়ংকরভাবে ব্যাহত করবে এবং ব্যাপক দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি করবে। পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে হামলার প্রভাব সামরিক লক্ষ্যবস্তু বা যোদ্ধাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এ রকম হামলায় বেসামরিক ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি হতাহত হয়ে থাকেন। আর, বেঁচে থাকা মানুষগুলো বিকিরণজনিত কারণে দীর্ঘমেয়াদি কষ্টকর স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকেন। এমনকি প্রতিবেশী শহর বা দেশগুলোও একই ধরনের সমস্যায় জর্জরিত হতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ধরনের যুদ্ধের অর্থ হবে বিধ্বংসী পরিণতিসহ পৃথিবীর জলবায়ুর চরম ব্যাঘাত। আক্রমণের কিছুদিন পরেই বিশ্ব একটি পারমাণবিক শীতের অধীনে পড়বে তাতে করে অত্যন্ত ভয়াবহ বৈশ্বিক দুর্ভিক্ষ এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর বর্ধিত প্রভাব শুরু হবে। সর্বোপরি, আর্থ-সামাজিক প্রভাবগুলোও হবে ভয়াবহ। উন্নয়নশীল দেশগুলো এবং প্রান্তিক মানুষরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর পর, ১৯৪৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের যে কোনো ফলাফল মানব সভ্যতার ওপর এতটাই বিপর্যয়কর হবে, যাতে মানবজাতিকে প্রস্তরযুগে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। সাংবাদিক আলফ্রেড ওয়ার্নার যখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে আইনস্টাইনকে প্রশ্ন করেছিলেন যে, কোন ধরনের অস্ত্র দিয়ে এমন যুদ্ধ করা যেতে পারে, তখন এই বিজ্ঞানী সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কোন অস্ত্র দিয়ে করা হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধ হবে লাঠি এবং পাথর দিয়ে।’লেখক
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
