ব্যাটারি রিকশার বাস্তবতা

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০২:২০ এএম

রিকশা ঢাকা শহরের একটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে আছে বহুকাল ধরে। তবে রিকশা উঠিয়ে দেওয়া নিয়ে বহু বছর ধরে কিছু মাত্রায় জনমত তৈরি হয়েছে। শহরে চলাচলের গতিবেগ কমে যাওয়া, রিকশাচালকদের যথার্থ ট্রেনিং না থাকা এবং আধুনিক যুগে এসে অমানবিক এই কাজ বন্ধ করার যুক্তিতে অনেকে রিকশা তুলে দিতে চান। বিপরীতে বিপুল পরিমাণ মানুষের জীবিকা, শহরের অপ্রতুল রাস্তাঘাট, সরু গলিতে রিকশা ছাড়া অন্য যান চলতে না পারা, পথচারীদের হাঁটার জন্য উপযোগী পরিবেশ না থাকা, গণপরিবহনে নারী-শিশু-বৃদ্ধ ও অসুস্থদের অনিরাপত্তা ইত্যাদি কারণে রিকশার পক্ষে যুক্তি দেন। আবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। এসব রিকশার একটা বড় অংশ স্থানীয়ভাবে কোনো রকম নিরাপত্তা নির্দেশনা ছাড়াই নির্মাণ করা হয়। প্যাডেলচালিত রিকশায় ব্যাটারি লাগিয়ে দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ব্রেক সিস্টেম ঠিক নেই। ফলে অদক্ষ চালকরা নানা রকম দুর্ঘটনার কারণ হচ্ছেন। বিগত সরকারের আমলে শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য এই রিকশা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঢাকা শহরের গলিপথগুলোতেই কেবল চলাচলের অনুমতি ছিল। তবে ধীরে ধীরে এর প্রসার বেড়েছে এবং সরকার পতনের পর ঢাকা শহরে ব্যাটারি রিকশার সংখ্যা অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক পর্যায়ে হাইকোর্টে রিট করে ব্যাটারি রিকশা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে হুট করে জীবিকা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রিকশাচালকরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। কয়েক দিন ধরে ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তা অবরোধ করে তারা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। শহরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ‘ব্যাটারি রিকশা’। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ১৫ লাখের মতো মানুষ এই পেশায় নিয়োজিত। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ যেন বেকার না হয়ে পড়ে সেজন্য বিকল্প উপায় বের করার পরামর্শ দিয়েছেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, ব্যাটারি রিকশা আমদানির সুযোগ থাকায় এসব যান চলাচল বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন লাখ লাখ পরিবারের জীবিকা এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। হুট করে এসব নিষিদ্ধ করা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি করবে। অনেকে বলেছেন, মানবিক দিক বিবেচনা করলে শহরের শাখা সড়ক এবং বাইরে জেলা শহর ও মহাসড়কে সার্ভিস রোডে স্বল্প দূরত্ব বাহন হিসেবে এগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই শহরের প্রধান সড়কে চলতে দেওয়া যাবে না।

বর্তমানে রাজধানীতে ৮ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। মূলত ২০১০ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এই রিকশার সংখ্যা বেড়েই চলছে। দিন-রাতে মিলে ১৫ লাখের মতো চালক জড়িত এই পেশায়। প্রতিদিন ১ হাজার টাকার মতো আয় হয় ব্যাটারিচালিত যান থেকে চালকদের। দীর্ঘদিন ধরে রিকশা চালিয়ে বয়সের ভারে প্যাডেল রিকশা টানতে না পারা, এমনকি কিছু নারীও এই পেশায় যোগ দিয়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এসব যান চলাচল বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েও ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভের মুখে পিছু হটে। তবে রিকশাচালকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, এই নিয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হোক। তারা দাবি করেছেন, প্রধান সড়কে রিকশা চালাতে চান না, বরং তারা চান একটি নীতিমালা হোক। সেই নীতিমালা মেনে সড়কে রিকশা চলবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবস্থা করতে হবে বলেও তারা দাবি জানান। বিশেষজ্ঞরাও এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন। কর্মসংস্থানের অভাবে একটি বড় অংশ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হন, যাতে খুব বেশি দক্ষতাও লাগে না এবং লাইসেন্সেরও তেমন বালাই নেই। তবে লাইসেন্স নিয়ে বিপুল বাণিজ্য হয়, যার লাভ পায় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা। ফলে রিকশাচালকদের যথাযথ ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে লাইসেন্স দিলে এই সমস্যা কমবে। আর কিছু বিনিয়োগ করলেই ব্যাটারি রিকশাকেও আধুনিক ও আরও বেশি নিরাপদ করা সম্ভব।

এসব বিবেচনায়, রিকশার কাঠামোগত উন্নয়ন করে রিকশাচালকদের দক্ষতা বৃদ্ধি, আইনকানুন প্রণয়নসহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ের আলোকে সার্বিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দুনিয়ার অনেক দেশই এখন পরিবেশ দূষণ রোধ করতে সাইকেলের মতো যান ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে রিকশা আমাদের জন্য বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে। এ জন্য দরকার সুষ্ঠু নীতিমালা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত