মহারাষ্ট্রে হেরেছে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ০২:০১ এএম

মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিজেপির জয়জয়কার নিঃসন্দেহে আগামী দিনে ভারতের রাজনীতির পক্ষে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের ফলাফলে কে, কয়টা সিট পেলেন না পেলেন, সেটা নিশ্চিত আলোচনার বিষয়। কিন্তু আগেও বলেছি, আবারও একবার লিখতে বাধ্য হচ্ছি যে ভারতের নির্বাচন, লোকসভা বা বিধানসভা যেখানেই হোক না কেন, অনেক প্রশ্ন তুলে দেয়। দেশ কোন দিকে যাবে! স্বৈরতান্ত্রিক বা অতি কেন্দ্রীকরণ হয়ে দেশের বহুত্ববাদী রাষ্ট্র কাঠামোকে অস্বীকার করবে! রাজ্য-কেন্দ্র সংঘাত বাড়বে!  সাম্প্রদায়িক সমস্যা কি আরও জটিল হবে! ইত্যাদি ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় ভারতের লক্ষ্য এখন সুপার পাওয়ার হয়ে অন্যান্য অনেক দেশকে টেক্কা দেওয়া। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে ভারতের বিজেপি সরকার যেকোনো পথ নিতে প্রস্তুত। এই মুহূর্তে বিজেপির মূল নীতি দুটি। এক. দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করা, ওয়াক্্ফ বোর্ডের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা, একাধিক রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা উচ্ছেদ বা স্টেশন, রাস্তা বা জায়গার নামের সঙ্গে মুসলিম গন্ধ থাকলেই তা আগডুম বাগডুম যুক্তিতে বদলে দিয়ে নতুন নামকরণ করা।

আসলে বিজেপির নীতি বলে কিছু হয় না। যাবতীয় নীতি নির্ধারণের পেছনে থাকে দলের থিঙ্কট্যাঙ্ক রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। ইদানীং কেউ কেউ ভাবতে শুরু করেছেন, আরএসএস বদলাচ্ছে। অনেকে এও বলেন, আগের আরএসএস ভালো ছিল বা আজও আরএসএসের সবাই খারাপ নন। এসব নিতান্তই ভুলভাল কথা। ১৯২৫-এ আরএসএসের জন্ম হয়েছিল, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামকে কম জোর করতে। দেশের ভেতরে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ককে ভাঙতে। সে হিন্দু ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে যে বহুত্ববাদ তাকেও মান্যতা দিতে পছন্দ করে না। সনাতনী ধর্মের নামে সে রাজনৈতিক মনুবাদকে ফেরাতে চায়। তার ধর্মীয় ডিসকোর্সে সহিষ্ণুতার বড় অভাব। মনসা, ঘেঁটু, শিব, বিষ্ণু এবং অজস্র লোকায়ত বিশ্বাসকে খর্ব করে একমাত্রিক ধর্ম প্রতিষ্ঠায় সে তৎপর। আরএসএসের কাছে ভারতের সংস্কৃতি মানেই হিন্দু সংস্কৃতি। বস্তুত ভারতে যে নানা ভাষা, নানা ধর্মের দেশ এই মূল সত্যকে অস্বীকার করাই তার এজেন্ডা।

আগামী বছর আরএসএসের শতবর্ষ। ফলে যেনতেনভাবে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে আরএসএস ও তার রাজনৈতিক দল বিজেপির লক্ষ্য। ফলে আপাত তুচ্ছ একাধিক ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন নয়। করিমগঞ্জ শহর বা মোগল সরাই রেলস্টেশন, নতুন সংসদ ভবনের গায়ে অখণ্ড ভারতের ম্যাপ আঁকা অথবা পড়শি দেশে সনাতনী তৎপরতা সবই নির্দিষ্ট আখ্যানের টুকরো টুকরো অংশ। সব এক সুতায় গাঁথা। তাই যখন আলাদা আলাদাভাবে মহারাষ্ট্র বা হরিয়ানা রাজ্যের নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মিডিয়ায় বিশ্লেষণ করতে বসেন। আমি বুঝতে চেষ্টা করি তারা আরএসএসের গেম প্ল্যান যে আসলেই এক, হিন্দু রাষ্ট্র নির্মাণ- সেটা তারা ধরতে পাচ্ছে কি না! অথবা ধরতে পারলেও ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছে না তো! হিন্দু রাষ্ট্র না বলে বলা দরকার, মনুবাদী রাষ্ট্র। ‘হিন্দু’ শব্দ বহুমাত্রিক। এক হিন্দু ধর্মের মধ্যে অনেক অনেক চিন্তা, দর্শনের পারস্পরিক চমৎকার এক সহাবস্থান। বহু মত, বহু ব্যাখ্যা সেখানে। খোদ নবদ্বীপ ধামে চৈতন্যদেবের উত্থান ঘটেছিল শাক্ত সম্প্রদায়ের শক্তিশালী ঘাঁটিতে তর্ক যুদ্ধে ঘোর শাক্ত আগমবাগীশের মতো প্রতিপক্ষকে হারিয়ে। আরএসএস এই ভিন্ন ভিন্ন চিন্তাকে আত্মীকরণ করে, নতুন এক পুরুষতান্ত্রিক বৈপ্লবিক হিন্দুত্ববাদকে সামনে আনতে। সেই নব্য হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বড় অস্ত্র ইসলাম ফোবিয়া। কংগ্রেসের আর যাই দোষ থাকুক, ইসলাম ফোবিয়া নেই। ফলে মহারাষ্ট্রে হার হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির। কোনো একটি দলের নয়।

পাশাপাশি আমরা ভুলে যাই, আজ পৃথিবীর কোথাও বিশুদ্ধ গণতন্ত্র বলে কিছু নেই। মানি, মাসল, মাফিয়া এই তিনের দাপটে জনগণের মতামত অধিকাংশ নির্বাচনে ঠিকঠাক প্রতিফলিত হয় না। ভারতে শাসকদের প্রতি করপোরেট দাক্ষিণ্য গভীর। তাই বিপুল টাকা লগ্নি করে ভোট রাজনীতিতে বিজেপির রমরমায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং এখনো ভারতের কোথাও বিজেপি যে একচেটিয়া জিতছে না সেটাই বিস্ময়কর। অসম লড়াইয়ে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট যে বিনাযুদ্ধে সুচাগ্র মেদিনী ছাড়ছে না, এটা নিঃসন্দেহে তাদের কৃতিত্ব এবং আরও কৃতিত্ব জনসাধারণের। যারা অনেক ক্ষেত্রেই মনুবাদী রাজনীতির অশ^মেধ ঘোড়ার দৌড় থামিয়ে দিচ্ছেন। মহারাষ্ট্রের সদর মুম্বাইর বিখ্যাত ধারাভিতে পরাজিত হয়েছে বিজেপি জোট। ধারাভি এশিয়ার অন্যতম বড় বস্তি। সেখানে শ্রমজীবী জনতার বাস। শহরের প্রাণকেন্দ্র বলে ধারাভির জমির দাম আকাশছোঁয়া। ইতিমধ্যেই বিজেপি সমর্থিত রাজ্যে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ওই মহামূল্যবান জমি বিতর্কিত শিল্পপতি আদানি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার। ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে শ্রমজীবী জনতা। তার পরিণতি ধারাভি কেন্দ্রে কংগ্রেসের জ্যোতি গায়কোয়াড়ের কাছে একনাথ শিল্ডের বিরাট ব্যবধানে হেরে যাওয়া। এই কঠিন সময়ে মহারাষ্ট্র বিধানসভার পালঘর জেলার দাহানু আসনে জিতেছেন সিপিআইএমের বিনোদ নিকোলে। ধারাভি, দাহানু একটা বিষয় পরিষ্কার বোঝায় যে, জনগণের পাশে থাকলে হাজার হাজার টাকা ছড়িয়েও প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে আটকে দেওয়া যায়। তবুও মহারাষ্ট্রের জয় বিজেপিকে আগামী দিনে অনেক আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে, এটা ঠিক।

মহারাষ্ট্র ছিল একদা কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্টদের গড়। ১৯৪৬ সালের ঐতিহাসিক নৌ বিদ্রোহ অবিভক্ত ভারতের সোনার আখরে লেখা এক মহাখ্যান। যা আজও হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রতীক। শিল্প শ্রমিকদের কত কত লড়াই-সংগ্রামের সাক্ষী বোম্বে শহর। কলকাতা ও বোম্বে ছিল আইপিটিএ, গণনাট্য আন্দোলন, প্রগতি সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র। কীভাবে ধীরে ধীরে বাম আন্দোলনকে নিস্তেজ করে মহারাষ্ট্র হয়ে উঠল দক্ষিণপন্থি রাজনীতির ঘাঁটি, তা কখনো সময়-সুযোগ পেলে বিস্তারিত লিখব। এই রূপান্তর নিয়েই হতে পারে নতুন কোনো বলিউডি সিনেমা। মিডিয়ার ভূমিকা নির্বাচনে কেমন তা নিয়েও গবেষণা হতে পারে। হরিয়ানা জেতার খবরে উল্লসিত মিডিয়ায় বিজেপির মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি কাশ্মীর বিধানসভায় বিজেপির ভরাডুবির খবর হিসেবে তেমন গুরুত্ব পায় না। ঠিক এবার যেমন মহারাষ্ট্র নির্বাচনে বিজেপির সাফল্যের খবর সর্বত্রই হেডলাইন। অথচ ঝাড়খন্ডের ভোটে বিজেপির পরাজয়ে কেমন যেন বিমর্ষ, বিষন্নতা সংবাদ মাধ্যমের পাতা ও পর্দায়। অথচ ঝাড়খন্ডের হারে স্পষ্ট, বিপুলসংখ্যক আদিবাসী, জনজাতির মানুষ মনুবাদ বা উচ্চবর্গের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এবার দুটি রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মহারাষ্ট্র রাজ্যে বিজেপির জয়ের পেছনে বড় করে তুলে ধরা হচ্ছে আরএসএস বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকে।

ভাবটা এই, আরএসএস ছিল বলেই মহারাষ্ট্র নির্বাচনে বিজেপি সহজেই বাজিমাত করতে পারল। বিজেপি নেতাদের মেরুদণ্ড থাকলে তাদেরই প্রশ্ন তোলা উচিত যে, ঝাড়খ-ে কী আরএসএস ভোট লড়াইয়ে সক্রিয় ভূমিকা নেয়নি! আরএসএস ও তাদের শাখা সংগঠন বনবাসী কল্যাণ কেন্দ্রের প্রভাব কিন্তু ঝাড়খ-ের সর্বত্রই বিশাল। আমার মনে আছে, এবার দুর্গাপূজার ভাসানের রাতে ঝাড়খন্ডের ছোট্ট জনপদ, সাহেবগঞ্জে আরএসএস সমর্থকরা কীভাবে প্রকাশ্যে ‘জয় শ্রীরাম’ আওয়াজ তুলে অস্ত্র মিছিল করছিল। এই ভয় পাইয়ে দিয়ে কার্যসিদ্ধি করা সংঘ পরিবারের বহু পুরনো কৌশল। ঝাড়খন্ডের সব জায়গায় এবারও তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি বিজেপি সেই সাবেক কৌশল নিয়ে সহজেই বাজিমাত করতে চেয়েছিল। কিন্তু আদিবাসীদের বড় অংশ তাদের এই গেমপ্ল্যান বানচাল করে দিয়ে অন্তত সাময়িকভাবে হলেও মনুবাদকে ঠেকাতে পেরেছে। বিজেপি, সংঘ পরিবারের আরেক অস্ত্র হচ্ছে গোয়েবলসীয় ধারায় মিথ্যা বলে বলে কেল্লা ফতে করা। এবার তাদের মুখ্য হাতিয়ার ছিল, বাংলাদেশের পরিস্থিতি। দলে দলে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী দেশের ভেতরে ঢুকে জনবিন্যাস বদলে দিচ্ছে। বিজেপির এই প্রোপাগান্ডা ঝাড়খ-ের সর্বত্র এক ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়েছিল। এই গুজব আরও সংহত হবে আগামী ছাব্বিশ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে। ঝাড়খ-ের বিরাট সংখ্যক জনগণ গুজবে কান না দিয়ে বিজেপিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আশা করি আগামীতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিজেপির ফাঁদে পা দেবেন না।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত