‘রাজনীতি’ শব্দটি শুনতে শুনতে যাদের কান ঝালাপালা হয়ে গেছে, তাদের ক্ষেত্রে ‘বিরাজনীতিকরণ’ শব্দটি খানিকটা হলেও কান জুড়ানোর আবহ তৈরি করেছে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোতে কোনো কর্মী নেই নেতা আর নেতা।
এ দেশে রাজনৈতিক সরকার মানেই চামচার চাঁদাবাজি, দালালের দখলবাজি আর ‘আদর্শের সৈনিক’দের লুটপাট। এখানে রাজনীতি দখলবাজিকে চালায়, নাকি দখলবাজি রাজনীতিকে চালায় এ এক দুর্জ্ঞেয় ধাঁধা। এ দেশে এই ফাঁকির নামই ‘গণতন্ত্র’ (!) , এরই নাম ‘রাজনীতি’। এখানে গণতন্ত্র মানে নির্বাচন নির্বাচন খেলা, এ দেশে রাজনীতি মানে ভোট ভোট জুয়া এই জুয়ায় দান মারতে পারলে ননস্টপ চুরি-ডাকাতি আর লুটপাটের মচ্ছব চলে। লুটেরারা নিজেদের ভাগ্য টেনে নিয়ে যান মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, কানাডা বা আমেরিকায়। ফতুর হয়ে পেছনে থাকে জনতা ও দেশ।
এই লুটপাট-দুর্নীতির সহায়ক শক্তি হিসেবে অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে দলীয় প্রশাসন, দলীয় পুলিশ, দলীয় আমলাতন্ত্র, দলীয় বিচারব্যবস্থা। দেশে এমন একটি প্রতিষ্ঠান নেই যা ‘রাজনীতিকরণে’ অকার্যকর করে ফেলা হয়নি।
আমাদের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর গতি পরস্পরের বিপরীতমুখী। তাদের প্রচেষ্টা জাতিকে বিভক্ত করে রেখে শোষণ করে যাওয়া। কেউ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসায়ী, কেউ নব্য জাতীয়তাবাদের চেতনা ব্যবসায়ী, কেউ ইসলামের চেতনা ব্যবসায়ী, কেউ সাম্যবাদের চেতনা ব্যবসায়ী আর মাঝখানে ‘ফুটবল’ জনগণ ধরাশায়ী।
ফখরুদ্দীন আহমদ সরকারের সময় সংস্কারের জনআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল। সংস্কারের অনেক রকমের বৈপ্লবিক প্রস্তাবনায় আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। সে সময় ঢাকায় তৃণমূল পর্যায়ে ঘুরেছি ফখরুদ্দীন সরকার সম্পর্কে জনঅনুভূতি জানার জন্য। বস্তিবাসী, রিকশাওয়ালা, ফেরিওয়ালা, শ্রমজীবী ধুলোর লেভেলের মানুষগুলোর সবার মুখে এক কথাই শুনেছি, তারা সরকারের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেছে ‘এই সরকারই দেশ চালাক’, তারা কোনো ‘ভোট’ চায় না। প্রচলিত রাজনীতির প্রতি তাদের চাপা ক্ষোভ, ঘৃণা ও বিবমিষা শব্দে শব্দে প্রকাশ হয়ে পড়ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হয়নি কিছুই, মানুষ যেই অন্ধকারে ছিল সেই অন্ধকারই বজায় থেকেছে, বরং বলা ভালো আরও ঘনীভূত হয়েছে। তারা যেসব সংস্কার করেছিল বা সংস্কারের ছক কষেছিল তা ভোটে ‘নির্বাচিত’ আওয়ামী লীগ সরকার বাদ দেয়। রাজনীতির নামে জয় হয় দুর্বৃত্তায়নের।
ফখরুদ্দীন সরকারকে উল্লেখ করে ‘এক এগারো’, ‘মাইনাস-টু ফরমুলা’, ‘বিরাজনীতিকরণ’ ইত্যাদি থিওরির কথা এর আগে প্রায়ই শোনা যেত, আজকাল আবার জোরেশোরে এর গুঞ্জন উঠেছে। এখানে দেখার বিষয়, এই গুঞ্জন যারা তুলছেন তারা কারা? ‘বিরাজনীতিকরণ’ ধুয়া তুলে কেন তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন? ‘বিরাজনীতিকরণ’ বলতে তারা আসলে কী বোঝাতে চান? পাশাপাশি আরও দেখতে হবে, ‘রাজনীতিকরণ’ এ পর্যন্ত দেশের মানুষকে কতটা লাভবান করেছে?
রাজনৈতিক দলগুলো কি ভেবে নিয়েছে যে এ দেশের একমাত্র মালিক তারাই। তারা পালাক্রমে রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমে দেশ ও জনগণকে জিম্মি করে রাখবে? তাদের ভাবভঙ্গিতে মনে হয়, রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় নেই মানেই দেশে রাজনীতি নেই, দেশ রসাতলে গেল। সবাইকে মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক দলবাজি ও রাজনৈতিক সচেতনতা এক জিনিস নয়। নাগরিকরা যদি রাজনীতি-সচেতন না হয়, সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থেকেও লাভ নেই। আবার রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে কি না সে প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ নয়, যদি দেশবাসী রাজনীতি-সচেতন হয়।
জনগণই দেশের মালিক। সেই তারা ‘রাজনীতি’র জন্য, রাজনৈতিক সরকারের জন্য পাগল হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ এ দেশের বেশিরভাগ জনগণ সহজ-সরল হলেও তারা আজ এটা বোঝে যে, এ দেশে রাজনীতি হচ্ছে নির্বাচনের নামে তামাশা, ‘তোমার নেতা আমার নেতা’র ভেলকিবাজি। এখানে হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার এই তামাশার খেলাটা খেলে। এই অশুভ রাজনীতি, দুর্নীতি ও দুঃশাসন থেকে নাগরিক-সাধারণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তারা বিকল্প চায়, মুক্তি চায়। কিন্তু দুর্বৃত্তায়ন যেভাবে অক্টোপাসের মতো রাজনীতিকে আঁকড়ে ধরে আছে, তাতে এ দেশের মানুষের মুক্তি সুদূরপরাহত বলেই মনে হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, তারা ‘যত দ্রুত সম্ভব’ নির্বাচন চান, নির্বাচিত সরকার চান। কেন বলুন তো? হয়তো কারণটা অনেকেই বোঝেন। ব্যাখ্যার দরকার নেই।
চুরি, ডাকাতি, লুটপাট, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, খবরদারির ‘লাইসেন্স’কেই এখানে রাজনীতি (!) বলা হচ্ছে। ‘আপনার দল’ ক্ষমতায় মানে, আপনি যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন, দিবালোকে লাশ ফেলে দিয়েও দিব্যি ঘুরে বেড়াতে পারেন। কেউ কিচ্ছুটি বলতে পারবে না সাধারণ নাগরিকরাও না, প্রশাসন-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও না। তেমনটিই কি? এই অবস্থার অবসান যদি ‘বিরাজনীতিকরণ’ হয় , তবে সেই কল্পিত ‘বিরাজনীতিকরণ’ই অধিকাংশ মানুষ চায়। যে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় চোর-ডাকাতের সংখ্যা কম থাকে সেটাই মঙ্গল। কেননা অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, পুরোপুরি চোর-ডাকাতমুক্ত ব্যবস্থা আমরা আর কল্পনা করার সাহস পাচ্ছি না। তবে মাফিয়া চক্রের রাজনীতি কোনো যুক্তিতেই চলতে দেওয়া যায় না। রাজনীতির নামে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক দাসপ্রথা, চৌর্যবৃত্তি, নৈরাজ্য ও দুর্বৃত্তপনা বন্ধ হোক।
সাধারণ মানুষ আর কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখতে চায় না। তারা সমাজে শান্তি চায়। পারস্পরিক সৌহার্দ্য চায়। এই নিপাট-সরল চাওয়ার মধ্যে কোনো ধরনের দুরভিসন্ধি নেই, রাজনৈতিক গন্ধ নেই। তারপর কেউ যদি রাজনৈতিক গন্ধ খুঁজে বেড়ান, তাহলে বুঝে নিতে হবে সেই উদ্দেশ্য মঙ্গলজনক কিছু নয়।
লেখক : সংস্কৃতিকর্মী
