ফের ব্যাটারিরিকশা চালকদের সড়ক অবরোধ, হামলা সংঘর্ষ

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:২৫ এএম

রাজধানীতে ফের সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক ও মালিকরা। প্রেস ক্লাব, যাত্রাবাড়ী ও মোহাম্মদপুর এলাকায় তারা সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় যাত্রাবাড়ীতে রিকশাচালক, বিএনপি, শিক্ষার্থী ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। রিকশাচালকদের অবরোধে গতকাল রবিবার রাজধানী জুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। রিকশাচালকদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে আজ চেম্বার আদালতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ।

গতকাল সকাল ১০টায় অটোরিকশা নিষিদ্ধের প্রতিবাদে যাত্রাবাড়ী, প্রেস ক্লাব ও মোহাম্মদপুরে সড়ক অবরোধ করেন চালকরা। যাত্রাবাড়ীতে অবরোধের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ অবস্থান নেয়। সড়ক স্বাভাবিক করতে আন্দোলনরত রিকশাচালকদের ধাওয়া করে স্থানীয় বিএনপি, শিক্ষার্থী ও পুলিশ। চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। এ সময় কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করেন অটোচালকরা। সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

এর আগে সকাল ৯টা থেকে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার, কোনাপাড়া, শনির আখড়াসহ বিভিন্ন এলাকার অটোচালকরা যাত্রাবাড়ী-ডেমরা সড়কের কাজলারপাড় এসে জড়ো হন। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, যাত্রাবাড়ী-ডেমরা সড়ক, শহীদ ফারুক সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

ওয়ারী জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ছালেহ উদ্দিন বলেন, অটোচালকরা সকাল ১০টার দিকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার মোড়ে সড়ক বন্ধ করে বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে আমি রিকশাচালকদের সড়ক থেকে সরে যেতে বলি। তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়।

যাত্রাবাড়ী ছাড়াও অবরোধ হয়েছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। বেলা সাড়ে ১১টায় রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন আয়োজিত গণঅবস্থানে রাজধানীর সেকশন, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে অটোরিকশা চালকরা জড়ো হতে শুরু করেন। এতে হাইকোর্ট, কদম ফোয়ারা থেকে পল্টন পর্যন্ত যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সমাবেশে রিকশা ভ্যান ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা আবদুল্লাহ কাফি রতন বলেন, ‘আইন বাতিল করা না হলে আমরা রাজপথ ছাড়ছি না। ছাত্রদের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ছিলাম। তাই আমরা বলছি দ্বিতীয় গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টির পরিবেশ তৈরি করবেন না।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘আমার রিকশা শ্রমিকদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটা প্রত্যাহার করে তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত আগামীকাল (আজ) কোর্টে হোক বা না হোক, সরকারের পক্ষ থেকে সেটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর যদি এটা না হয় তাহলে আমি বলছি, তারা (সরকার) যেমন বলে সংস্কার না করে নির্বাচন দেব না; ঠিক তেমনি রিকশাচালকের দাবি না মেনে গদিতেও তুমি থাকতে পারবা না।’

গতকাল সন্ধ্যায় রিকশাচালকদের গণঅবস্থানের বিষয় জানতে চাইলে রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকারকে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ লাইসেন্স ও যৌক্তিক রুট পারমিট দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে এ সময়ের মধ্যে রাস্তায় অটোরিকশাচালকদের চলতে বাধা দেওয়া যাবে না।’ চালকদের নিয়ম মেনে রিকশা চালানোর আহ্বান জানান তিনি।

প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ শেষে শহীদ মিনারের উদ্দেশে পদযাত্রা করেন অটোচালকরা। দুপুর ১টায় ফের শহীদ মিনার এলাকায় অবস্থান নেন তারা। পরে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়কে তারা রিকশা চালিয়ে ব্যানার প্রদর্শন করেন। আবদুল রাজ্জাক নামে এক চালক বলেন, ‘আমরা প্রধান সড়কে রিকশা চালাতে চাই না। আমরা চাই অলিগলি ও শাখা সড়কগুলোতে রিকশা চালাতে। কিন্তু আমরা সেটিও করতে পারছি না। তাই প্রেস ক্লাব থেকে শহীদ মিনারে আসলাম প্রতিবাদ জানাতে।’

হাজারীবাগের ঝাউচর এলাকায় চালক আনোয়ার মিয়া বলেন, ‘এ রিকশা চালিয়ে যা উপর্জান হয় সে আয় দিয়ে আমার সংসার চলে। পরিবারে ১০ জন সদস্য চলে আমার আয় দিয়ে। এখন যদি এই রিকশা চালাতে না পারি তাহলে কীভাবে এই সংসারটা চালাব। তাছাড়া, আমরা চাই একটি নীতিমালা করা হোক।’

ধানম-ি ১৫ নম্বর ও মোহাম্মদপুর বেড়িবাধ এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন চালকরা। তারা সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত গাবতলী-সদরঘাট সড়ক আটকে অগ্নিসংযোগ করেন। জানা গেছে, চৌরাস্তার মোড়ে অবস্থান নেওয়ায় মোহাম্মদপুর-বসিলা ও গাবতলী-সদরঘাট রুটে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এই এলাকা দিয়ে চলাচলরত যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাফিজুর রহমান বলেন, সকাল সাড়ে ৯টা থেকে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ চার রাস্তার মোড় ও চাঁদ উদ্যান এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা সড়ক অবরোধ করেন। তারা দুপুর ২টার পর সড়ক ত্যাগ করেন।

এদিকে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাটারিচালিত রিকশাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট (অব.) জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল দুপুরে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘উচ্চ আদালত থেকে একটি ভালো নির্দেশনা আসবে বলে আশা করছি। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা কাজ করব।’

ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের বিষয়ে ডিএমপির অবস্থান জানতে চাইলে মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের প্রতিনিধিদের সোমবার (আজ) আলোচনার কথা শুনেছি। আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’

ফেব্রুয়ারির মধ্যে ১১ দফা দাবি বাস্তবায়নের আলটিমেটাম: সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। তারা বলছে, দেশের সড়ক উপযোগী নকশায় আধুনিকায়নসহ ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিআরটিএ লাইসেন্স ও যৌক্তিক রুট পারমিট দিতে হবে; চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করতে হবে; ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচলে নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে; শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি গঠন করতে হবে; সড়কের লেন পদ্ধতি সচল ও সার্ভিস লেন নির্মাণ করতে হবে; আন্দোলনে আটক ও গ্রেপ্তারকৃতদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে; ব্যাটারিচালিত যানবাহনকে গণপরিবহন ও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে; জব্দ করা সব ব্যাটারিচালিত যানবাহন ও ব্যাটারি মালিকের কাছে হস্তান্তর ও নিলামকৃত ব্যাটারির মালিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে; চার্জিং স্টেশন নির্মাণ করতে হবে; মানবিক বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পুঁজিকে নিরাপদ করে পর্যায়ক্রমে প্যাডেলচালিত বাহনের শ্রম থেকে মানুষকে মুক্ত করতে হবে এবং শ্রমিকদের ওপর সব জুলুম-নির্যাতন-চাঁদাবাজি-হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

আদেশ স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ : ঢাকা মহানগর এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ। গতকাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আবেদন রেডি করছি। সোমবার (আজ) শুনানি হতে পারে।’

এর আগে গত ১৯ নভেম্বর হাইকোর্ট এক আদেশে ঢাকা মহানগর এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেয়। এরপর থেকেই আন্দোলন করছেন ব্যাটারিচালিত রিকশার সঙ্গে জড়িতরা। অভিযোগ উঠেছে, রিকশাচালকদের আড়ালে একটি গোষ্ঠী বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে।

হাইকোর্ট আদেশ পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়। প্যাডেলচালিত বৃহত্তর ঢাকা সিটি করপোরেশন রিকশামালিক ঐক্যজোটের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ নভেম্বর বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজীর বেঞ্চ ওই আদেশ দিয়েছিল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত