তিন বোনের কাছে পরাস্ত স্বৈরশাসক

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:২২ এএম

তিন বোনের অসীম সাহসিকতার কাছে পরাজিত হয় এক পরাক্রমশালী স্বৈরশাসক। ইতিহাসের যে ঘটনা আজও স্মরণ করে মানুষ। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

পৃথিবীর ইতিহাসে নিষ্ঠুর ও বেপরোয়া শাসক ছিলেন রাফায়েল লিওনিদাস ট্রুজিলো মোলিনা বা রাফায়েল ট্রুজিলো। ১৯৩০ সাল থেকে হত্যার শিকার হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ক্যারিবিয়ান দেশ ডোমিনিকান রিপাবলিক শাসন করেন তিন দশক। ১৯৬১ সালের ৩০ মে তাকে গুলিতে হত্যা করা হয়। বলা হয়ে থাকে, ট্রুজিলোর শাসনামলে ওই দেশে কোনো বিরোধী দল, বাক্স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিল না। কেউ তার বিরোধিতা করলেই কারাগারে পাঠানো হতো। নির্যাতন এমনকি হত্যাও করা হতো। হত্যার পর লাশ গুম করে ফেলত তার বাহিনী। কথিত আছে, সেসব মরদেহ হাঙরকে খাওয়ানো হতো। তবে এই স্বৈরশাসকের মৃত্যু ত্বরান্বিত হয় তিন বোনকে হত্যার পর। ওই তিন বোন ছিলেন মিনার্ভা, মারিয়া তেরেসা এবং প্যাট্রিয়া মীরাবাল। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর তিন বোনকে বহন করা একটি জিপ ধাক্কা খেয়ে ১৫০ ফুট নিচে পড়ে যায়। সেখানে তাদের মৃত্যু হয়। প্রথমে এটি দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও পরে বোঝা যায় ট্রুজিলোর আরেকটি নৃশংস হত্যার শিকার তারা। কারণ এই তিন বোন ছিলেন ভিন্ন মতাবলম্বী, যারা স্বৈরশাসক রাফায়েল ট্রুজিলোর নৃশংস শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখিয়ে ছিলেন। ট্রুজিলোর অন্যান্য রাজনৈতিক বিরোধীদের অনেকের মতো দুর্ঘটনার নাটক সাজিয়ে ট্রুজিলোর লোকেরা তাদের হত্যা করে। তবে ‘লাস মারিপোসাস’ বা প্রজাপতি নামে পরিচিত এই তিন বোন তখন থেকে জাতীয় নায়িকা হয়ে ওঠেন। তাদের মর্মান্তিকভাবে হত্যার ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মৃত্যুর দিনটিকে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নির্মূলের জন্য আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

একনায়কতন্ত্রের অধীনে

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের প্রতিবেদন জানায়, মীরাবাল বোনেরা সালসেডোর কাছে একটি গ্রামে ওজো দে আগুয়ার একটি সমৃদ্ধ পরিবারে বেড়ে ওঠে। তারা ক্যাথলিক স্কুলে পড়ালেখা এবং একটি অন্যসব শিশুর মতো সাধারণ শৈশব পার করে। কিন্তু তাদের যুগের অন্য ডোমিনিকানদের মতো, তাদের জীবন ২০ শতকের গোড়ার দিকে উপনিবেশ এবং রাজনৈতিক উত্থান দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। যে অভ্যুত্থান ১৯১৬ সালে শুরু হয়, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডোমিনিকান রিপাবলিক দখল করে। যুক্তরাষ্ট্রের এ আশঙ্কা ছিল যে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দেশ ডোমিনিকান রিপাবলিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির মিত্র হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯২৪ সালে তাদের প্রত্যাহার করে এবং হোরাসিও ভাসকেজ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু নাগরিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকে। ১৯৩০ সালে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের আন্দোলনের মুখে হোরাসিও ক্ষমতাচ্যুত হন। আর এ অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সামরিক কমান্ডার রাফায়েল ট্রুজিলো কারচুপির নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের এ স্বৈরশাসক এল জেফে বা প্রধান নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি দেশটির সর্বশক্তি মান হয়ে ওঠেন। সরকারের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাফ করতে থাকেন। ওই তিন বোনের মধ্যে প্যাট্রিয়া ছিলেন সবচেয়ে বড়। তার বয়স যখন মাত্র ১৩, তখন ট্রুজিলো হাইতিয়ান বংশোদ্ভূত ৩০ হাজার হাইতিয়ান এবং ডোমিনিকানদের হত্যার প্ররোচনা দেয়। এ ছাড়া মেয়েরা এমন এক সমাজে বড় হয়ে উঠছিল, যেখানে ট্রুজিলোর শাসনকে প্রকাশ্যে প্রশ্ন করা ছিল বিপজ্জনক।

মীরাবল বোনেরা 

এই তিন বোন বা মীরাবল বোনেরা বড় হয়ে উঠতে থাকে আর দেখে ট্রুজিলোর একনায়কত্ব আরও নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীরা তার শাসনের সমালোচনা শুরু করে এবং সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়। যে কারণে অনেককে নির্বাসনে যেতে হয়েছিল। তবে বিদেশে থেকেও তারা প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়ে যায়। ১৯৪৯ সালে তিন বোন ট্রুজিলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যান এক ঘটনায়। তাদের সুন্দরী, অবিবাহিত বোন মিনার্ভা মীরাবাল একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে ট্রুজিলোর সঙ্গে পরিচিত হন। এ স্বৈরশাসক তার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তরুণীদের যৌন সম্পর্ক তৈরির জন্য চাপ দিত। মিনার্ভা ট্রুজিলোকেও তিনি হয়রানি করতে থাকেন, যা প্রত্যাখ্যান করলে স্বৈরশাসক ট্রুজিলো দ্রুত প্রতিশোধ নেন। ট্রুজিলো মীরাবাল পরিবারের জীবনে বিপর্যয় নামিয়ে আনেন। তিন বোন প্রতিবেশীদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়। তাদের বন্দি এবং পরে এলাকা ছাড়া করা হয়। ইতিহাসবিদ ন্যান্সি রবিনসন লিখেছেন, ট্রুজিলো তিন বোনের শিক্ষা এবং চাকরির ক্ষেত্রগুলো ব্যাহত করে। তাদের বাবাকে বন্দি করা হয় এবং পরিবারটিকে আর্থিক ধ্বংসের মুখে ফেলা হয়। যার প্রতিক্রিয়ায় মিনার্ভা, মারিয়া তেরেসা এবং প্যাট্রিয়া রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৯ সালের ১৪ জুন বিরোধীদের একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর একনায়ক সরকার বিরোধীদের দমনে অভিযান পরিচালিত করে। মীরাবল বোন এবং তাদের স্বামীরা অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী ছিলেন। ব্যর্থ হলেও বিরোধীদের অভ্যুত্থান চেষ্টার পক্ষে ছিলেন তারা। অভ্যুত্থানের দিনটিকে কেন্দ্র করে তারা জাতীয় বিরোধী জোট গঠনের চেষ্টা চালান। তিন বোন ট্রুজিলোর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংগঠনে অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ করেন। তারা ট্রুজিলোবিরোধী প্রচারপত্র বিতরণ করেন এবং সারা দেশে প্রতিরোধীদের সংগঠিত করতে থাকেন। তাদের এসব কার্যকলাপ সরকার জানতে পারলে নেমে আসে নির্যাতনের খড়্গ। তিন বোনকে বন্দি করে নির্যাতন এবং হয়রানি করা হয়। এত নির্যাতনেও স্বামীদের সঙ্গে তিন বোন শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের অসাধারণ রাজনৈতিক এবং সামরিক প্রজ্ঞা ছিল এবং তারা তাদের জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন।

হত্যা

তিন মীরাবল বোন এবং ট্রুজিলো বিরোধী প্রতিরোধে যুক্ত অন্যান্য নারীর প্রতি শাসক শ্রেণি নির্যাতনে আন্দোলন স্তিমিত হয় না। বরং দিকে দিকে তা জ¦লে উঠতে থাকে। ইতিহাসবিদ এলিজাবেথ ম্যানলি লিখেছেন, স্বৈরশাসক ট্রুজিলোর রাজনৈতিক ভ-ামি উল্লেখযোগ্যভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। তার কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে ডোমিনিকান এবং এমনকি ক্যাথলিক চার্চও। তবে হাস্যকরভাবে ট্রুজিলোর টার্গেট ছিল ওই তিন বোন। সে তাদের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ ক্ষোভ পোষণ করত, তাদের প্রধান শত্রুও ঘোষণা করেছিল। ১৯৬০ সালের ২৫ নভেম্বর অবশেষে তিনি তাদের হত্যা করেন। সে দিন, মিনার্ভা, মারিয়া তেরেসা এবং প্যাট্রিয়া কারাগারে বন্দি তাদের দুজনের স্বামীকে দেখতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে পাহাড়ি এলাকায় তাদের গাড়িটি ট্রুজিলোর সন্ত্রাসীরা আটকে দেয়। পুরুষ সন্ত্রাসীরা শ্বাসরোধে তিন নারীকে হত্যার পর গাড়ি দুর্ঘটনার নাটক সাজায়। যদিও ট্রুজিলো সরকার দাবি করে যে, তিন বোন দুর্ঘটনায় মারা যায়। কিন্তু দেশে এবং বিদেশে ডোমিনিকানরা জানত যে, তাদের খুন করা হয়েছে এবং মীরাবালরা অবিলম্বে জাতীয় নায়ক হয়ে ওঠে।

শেষের শুরু

তিন বোনকে হত্যা ছিল ট্রুজিলোর শেষের শুরু। মাত্র ছয় মাস পরে, তিনি একই ধরনের পরিণতির মুখোমুখি হন। সাত ভিন্নমতাবলম্বী বিদ্রোহীর একটি দল তাকে হত্যা করে। ট্রুজিলো তখন তার উপপতœীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে তাকেও একইভাবে বাধা দেওয়া হয়। ট্রুজিলোকে হত্যার বিবরণে জানা যায়, ১৯৬১ সালের ৩০ মে রাত ১০টার কিছু আগে বিলাসবহুল লিমুজিন গাড়িতে রাজধানী সান্তো দোমিঙ্গো থেকে সান ক্রিস্তোবাল শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল সে। অন্ধকার সড়কটি ছিল অনেকটা নিস্তব্ধ। ওই গাড়িতে যাত্রী হিসেবে শুধু ট্রুজিলো ছিলেন।

একটি শেভ্রল গাড়ি দুই মাইল পথ ওই লিমুজিনকে অনুসরণ করেছিল। যে গাড়িতে ছিল চার বন্দুকধারী। হঠাৎ জোরে টান দিয়ে বন্দুকধারীদের গাড়ি ট্রুজিলোর গাড়ির পাশে চলে আসে এবং গুলি শুরু করে। এভাবে ট্রুজিলোকে হত্যা করা হয়। ট্রুজিলো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিন বোনকে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দোষী সাব্যস্তও করা হয়। যদিও তারা শেষ পর্যন্ত জেল থেকে পালাতে পেরেছিল এবং কখনো তাদের সাজা পূরণ করেনি। ট্রুজিলোর শাসন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর মীরাবল বোনেরা হয়ে ওঠেন জাতীয় চরিত্র। তারা জাতীয়ভাবে প্রজাপতি উপাধি পান এবং সাহস ও প্রতিরোধের জাতীয় প্রতীক হয়ে ওঠেন। তাদের মুখমণ্ডল ডোমিনিকান মুদ্রায় প্রদর্শিত হয়। তাদের নিয়ে জনপ্রিয় উপন্যাসও লেখা হয়। তবে অনেকে মনে করেন ট্রুজিলোকে হত্যা করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। তাদের মতে,  ডোমিনিকান রিপাবলিকের হত্যাপ্রিয় স্বৈরশাসক রাফায়েল ট্রুজিলোকে ১৯৩০ সাল থেকে সমর্থন জুগিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে তার ব্যবসায়িক স্বার্থ এতটা বিস্তৃত হয় যে, তা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করে। তাই গোপনে তাকে হত্যা করে সিআইএ।

ট্রুজিলোকে হত্যা করা বন্দুকধারীদের গাড়ির চালক ছিলেন আন্তোনিও ইমবার্ত। তখন তার বয়স ছিল ৪০ বছর। তার বিবরণ থেকে জানা যায়, গুলিতে আহত হলেও ট্রুজিলো গাড়ি থেকে বের হয়ে হাঁটতে থাকেন। তখন ইমবার্ত তাকে আবার গুলি করেন। বন্দুকযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মহাসড়কের ওপর পড়েছিল তার নিথর দেহ। ইমবার্ত বলেন, এরপর আমরা তার মরদেহ গাড়িতে তুলে নিয়ে যাই। এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় জড়িত একজনের বাসায় মরদেহটি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরে সেখান থেকে ট্রুজিলোর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ট্রুজিলোকে হত্যার পর পালিয়ে ছিলেন আন্তোনিও এবং তার সঙ্গীরা। দুই বছর পর ট্রুজিলোর উত্তরসূরি ক্ষমতাচ্যুত হলে প্রকাশ্যে আসেন তারা। আন্তোনিওকে সামরিক বাহিনীর সম্মানজনক পদ দেওয়া হয়। তিনি জেনারেল আন্তোনিও ইমবার্ত হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৬৫ সালের সেনাশাসনের সময় তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করেন। হাউজ উপকমিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান জেমস স্ট্যানটন কমিটির এক শুনানিতে ‘সফল গুপ্তহত্যা’ চেষ্টার কথা বলেন, যেখানে সিআইএ যুক্ত ছিল। ঘটনাটি তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, এ গুপ্তহত্যা বলতে ট্রুজিলোকে হত্যার বিষয়টিই বোঝানো হয়েছিল। সিআইএর এমন মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ১৯৬০ সালে লেখা গোয়েন্দা সংস্থাটির এক কর্মকর্তার চিঠিতেও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত