অনেক ঝড়-ঝাপ্টার পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে লেবাননে। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের মধ্যস্থতায় হওয়া এই যুদ্ধবিরতির চুক্তি কার্যকর হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে লেবাননের সাধারণ মানুষের মধ্যে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত এই অঞ্চলের জন্য এটি একটি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের প্রত্যাহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে লেবানিজ সামরিক বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দলটির দীর্ঘদিনের প্রধান হাসান নাসারাল্লাহসহ অনেক শীর্ষ স্থানীয় নেতাকে হারিয়েছে হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলের হামলায় গোষ্ঠীটির সামরিক স্থাপনা ও কৌশলগত ঘাঁটিগুলোও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতির পর হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ কী হবে সে প্রশ্ন উঠেছে।
ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সংঘাতের অবসানের একমাত্র আশা ছিল এই যুদ্ধবিরতি। গত সেপ্টেম্বর থেকে দেশটিতে হামলার মাত্রা বাড়ায় ইসরায়েল। তেল আবিবের লক্ষ ছিল সংগঠনটির অস্তিত্ব বিলীন করা। ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের প্রধান হাসান নাসারাল্লাহর মৃত্যু হয়। এরপর তার উত্তরসূরি হিসেবে ভাবা হচ্ছিল দলটির আরেক শীর্ষ নেতা হাশেম শাফিউদ্দিনকে। কিছুদিন পর ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন তিনিও। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুতে নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছে হিজবুল্লাহর। সেই সঙ্গে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি বৈরুতে একের পর এক ইসরায়েলি বোমায় আঘাতে ধ্বংস হয়েছে সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোগুলো। ধ্বংস হয়েছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ। একটানা হামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সংগঠনটি। এ অবস্থায় ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছিল হিজবুল্লাহ। ফলে এই যুদ্ধবিরতি ফলে দলটি এই ধাক্কা সামলে ওঠার সুযোগ পাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সমর বিশ্লেষকদের মতে, লেবানন যুদ্ধ হিজবুল্লাহকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারেনি। অতীতেও এমন পশ্চাৎপদ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস রয়েছে তাদের। ফলে ভবিষ্যৎ এ ইসরায়েলের সঙ্গে পুনরায় দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।
যুদ্ধটি লেবাননের জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে এনেছে। এদিকে, যুদ্ধবিরতির আগ মুহূর্তেও বৈরুতে তীব্র বোমা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। শহরটির দক্ষিণ উপকণ্ঠের দাহিহ অঞ্চলে হিজবুল্লাহর ২০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দাবি জানিয়েছে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী। ২০২৩ সালের অক্টোবরে শত্রুতা শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে ৩ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে এমন অঞ্চলে ১০ লাখেরও বেশি বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এই যুদ্ধে লেবাননের ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে অনুমান করছে বিশ্বব্যাংক।
চুক্তির আওতায় লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী ও হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের প্রত্যাহারের পর, দক্ষিণে হাজার হাজার লেবানিজ সেনা মোতায়েন করা হবে। কীভাবে তাদের মোতায়েন করা হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে প্রয়োজনে লেবাননের সামরিক বাহিনী কি হিজবুল্লাহর মুখোমুখি হবে? তার তেমনটা হলে দেশটির অভ্যন্তরে বিভাজন আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। দেশটির সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, এই ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য তাদের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ, জনবল ও সরঞ্জাম কোনোটিই নেই। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিকের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, লেবানন সরকার চলমান পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া দরকার বলে মনে করছে। আর এই পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছাও রয়েছে কর্র্তৃপক্ষের। তবে যুদ্ধচুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে বিরোধের অবসান ঘটলেও, লেবাননে নতুন অভ্যন্তরীণ সংঘাত শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
