বেতন বাড়বে যেভাবে

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৪:৫১ এএম

 টেবিলের সামনে ছায়া পড়ল।

আবিদুর রহমান মুখ তুলে তাকালেন।

‘কী ব্যাপার?’ তার অধীনে দশজন জুনিয়র কর্মকর্তা কাজ করে। সামনে বসে দুজন। অন্য ঘরে বাকি আটজন।

সবাই একসঙ্গে এসে আবিদুর রহমানের চারপাশে দাঁড়িয়েছে।

‘স্যার, আমাদের একটা দাবি ছিল।’ কবির বলল।

‘দাবি! আমার কাছে কেন! বসকে বলেন।’

‘স্যার, আপনার মাধ্যমেই দাবি জানাতে চাইছি।’ সাদিয়া বলল।

‘আমার মাধ্যমে! আমার মাধ্যমে কেন? আমিও তো তোমাদের মতোই একজন চাকুরে।’

‘স্যার, আপনিই এই অফিসের সবচেয়ে পুরনো আর প্রথম এমপ্লয়ি। বস আপনার কথা শোনেন। আপনি বললে বস আমাদের বেতন বাড়াতেও পারে।’ কুহেলি বলল।

কথা ঠিক। এই ফার্ম যখন প্রথম চালু হয় তখন আবিদুর রহমানই প্রথম নিয়োগ পান।

এই অফিসে ঢোকার আগে আবিদুর বাসায় বাসায় গিয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়াতেন।

একদিন হোটেলে খেতে বসে একটা ব্যাগ কুড়িয়ে পান আবিদুর। কার ব্যাগ বুঝতে পারছিলেন না। শেষে ব্যাগ খুললেন।

ভেতরে অনেক টাকা। গুনে দেখলেন পাঁচ লাখ।

একটা ভিজিটিং কার্ডও পেয়েছিলেন।

জাফর আহমেদ। কনসালট্যান্ট।

ফোন করেছিলেন আবিদুর। ফেরত দিয়েছিলেন ব্যাগ।

বিনিময়ে পেয়েছিলেন এই চাকরি।

একলা মানুষ আবিদুর। তিন কূলে আর কেউ নেই। বাচ্চা পড়ানোর ঝক্কি থেকে তিনি নিজেও মুক্তি চাইছিলেন।

চাকরিটা পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলেন।

বেতন নিয়ে কখনো কোনো কথা বলেননি বসের সঙ্গে। বেতন যা পান খাওয়া-পরা বাবদ খরচ হয়ে যায়।

তাকে যদি বলা হয় বেতন বাড়ানোর কথা বসকে বলতে, সেই কথা কেমন করে বলবেন তিনি!

বসের কাছে এমনিতেই তিনি কৃতজ্ঞ।

‘স্যার, বসের কাছে বেতন বাড়ানোর কথা তুলে ধরুন। প্লিজ।

আমরা অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। জিনিসপত্রের দাম যে একেবারে আকাশছোঁয়া।’

আবিদুর কী বলবেন ভেবে পেলেন না। তাকে মুক্তি দিলেন জাফর আহমেদ।

‘এখানে কী হচ্ছে? সবাই আবিদুর সাহেবকে ঘিরে রেখেছেন কেন?’ হঠাৎ রুমের দরজা খুলে বললেন বস।

আবিদুর তৎক্ষণাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।

‘স্যার!’

‘কিছু বলবেন আপনারা?’

বড় করে দীর্ঘশ্বাস নিলেন আবিদুর।

‘স্যার, সবাই আপনার কাছে যেতে চাইছিলাম।’

‘কেন?’

‘বেতন বাড়ানোর কথা বলতে।’

‘ওকে। বেতন কীভাবে বাড়ানো যায় আমার মাথাতেও সেটা আছে। এ নিয়ে আমি দুটি সুসংবাদ জানাতে আপনাদের কাছে এসেছিলাম।’

‘সুসংবাদ!’

‘হ্যাঁ।’ হাসিমুখে সবার দিকে তাকালেন জাফর।

‘প্রথম সুসংবাদ হলো সড়ক বিভাগের পাঁচ কোটি টাকার কাজটি আমরা পেয়েছি।’

সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠল।

‘আর দ্বিতীয় সুসংবাদ হলো আগামীকাল অফিস ছুটি থাকবে।’

সবাই বিস্মিত হলো।

বস হিসেবে জাফর স্যার কাজপাগল লোক। সে লোকই কিনা কাজ থেকে ছুটি দিচ্ছে!

‘কেন স্যার?’ বোকার মতো প্রশ্ন করে বসলেন আবিদুর।

‘এত বড় কাজ পেলাম। গ্রামের বাসায় যাব বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতে। তোমাদেরও তাই ছুটি দিলাম। যেন তোমরাও তোমাদের প্রিয় জায়গায় ঘুরতে যেতে পার।’

অফিস থেকে মন খারাপ করেই বাসায় ফিরলেন আবিদুর।

অফিস ছাড়া আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই তার। গ্রামের বাড়ি কবেই পানিতে ডুবে গেছে। বাবা-মা, ভাই সবাই গত হয়েছে। অফিস খোলা থাকলেই বরং ভালো লাগে তার।

অনেকে তাকে বিয়ে করার পরামর্শ দেয়। সে বিষয়ে আলাপ করার আগ্রহ পর্যন্ত পান না তিনি।

এর আগে মগবাজারে ভাড়া থাকতেন। সেখানে সুজানা নামের একজন তরুণী পাশের বাসা থেকে মাঝে মাঝেই বাসায় আসত।

ভাইজান ভাইজান করত। হঠাৎ একদিন বলে কিনা ভাইজান ডাকতে আর ভাল্লাগে না। কী নামে আপনেরে ডাকুম কন তো?

কয়েক দিন পরেই ওই বাসা ছেড়ে দিয়েছিলেন আবিদুর। চুপিচুপি।

ভয়!

বিয়ে করার কথা ভাবলেই ভয় লাগে তার।

বাসায় ফেরার পথে হোটেলে খেয়ে নিলেন তিনি।

বস তো বলেই খালাস গ্রামের বাসায় নয়তো প্রিয় কোনো জায়গায় বেড়াতে যান।

থাকলে না যাব বিড়বিড় করে বললেন আবিদুর।

ঠিক করলেন কাল সকালে উঠে সুজানাকে দেখতে যাবেন।

কাউকে ভালোবাসা দোষের কিছু নয়। সুজানাকে বোঝাতে হবে।

আবার ভাবলেন, দূর ছাই! আমি খামোখাই ভাবছি। সুজানার হয়তো বিয়েই হয়ে গেছে।

 

বরাবর সকালে ঘুম থেকে ওঠেন আবিদুর।

আজ ভেবেছিলেন দেরি করে বিছানা ছাড়বেন। তাই চোখ বুজে শুয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ।

হঠাৎ মনে পড়ল দেরি করলে হোটেলে নাশতা পাওয়া যাবে না।

কাজেই চটপট উঠে পড়লেন বিছানা থেকে। ঘর ঝাড়ু দেওয়া, কাপড় কাচা প্রভৃতি কাজগুলো নিজে নিজেই করেন। ছুটির দিনে।

আজ কোনো কিছুই করতে ইচ্ছে হলো না।

তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লেন আবিদুর রহমান।

হোটেলে নাশতাও খাওয়া হলো না।

মনের ভেতরে কেন যেন তাড়া।

কীসের তাড়া? নিজের কাছে জানতে চাইলেন আবিদুর রহমান।

জবাব পেলেন না।

বাস আসতেই উঠে পড়লেন তিনি। কন্ডাকটর ভাড়া চাইতে এলে ভাড়া দিয়ে দিলেন।

কী যেন ভুল হচ্ছে! ঠিক ধরতে পারলেন না।

আধা ঘণ্টা পর নিজেকে একটা বিল্ডিংয়ের সামনে আবিষ্কার করলেন তিনি।

আমি এখানে কেন? এটা তো আমার অফিসে যাওয়ার পথে সামনের বিল্ডিং।

আমার না সুজানার বাসায় যাওয়ার কথা!

উত্তর খুঁজলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে জবাব পেলেন মনের ভেতর থেকে। কয়েকটা ইমেইল করতে হবে আর কয়েকটা ভাউচার মেলাতে হবে।

সেজন্যই মনের ভেতর এত ছটফট করছে।

লিফট দিয়ে, উপরতলায় উঠে এলেন তিনি।

সুজন মিয়াকে খুঁজলেন।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে সে নেই!

গ্রিলের গেটের ওপাশে বরাবর সে থাকে। আগেও ছুটির দিনে বসের নির্দেশে অফিসে এসে এই গেটে সুজন মিয়াকে পেয়েছেন তিনি।

গেট খুলে ভেতরে ঢুকলেন আবিদুর।

অফিসের দরজায় ডিজিটাল লক। সে লকের কম্বিনেশন অবশ্য তার জানা আছে। কারণ বরাবর তিনি সবার আগে অফিসে আসেন বলে বস তাকে কোড দিয়ে রেখেছেন।

নিজের ডেস্কে বসে কম্পিউটার খুলে কাজে মগ্ন হয়ে গেলেন তিনি।

ইমেইল পাঠানো শেষ করে তৃপ্তিতে চেয়ারে হেলান দিলেন তিনি।

আহ! কী শান্তি!

এই ইমেইলগুলো না পাঠানো পর্যন্ত মনের ভেতর শান্তি পাচ্ছিলেন আবিদুর।

ঘুমিয়েই পড়েছিলেন, হঠাৎ খিলখিল হাসির শব্দে ঘুম ভাঙল।

‘বাব্বাহ তুমি পারও বটে! অফিস খালি করে প্রেম করছ গোপন প্রেমিকার সঙ্গে।’ নারী কণ্ঠে শোনা গেল।

‘এরচেয়ে ভালো অপশন তো পেলাম না। তুমিই বলো আইডিয়াটা কেমন!’ বস জাফর আহমেদের কণ্ঠ শোনা গেল।

‘আইডিয়া তো এক্সেলেন্ট বাবু। এখন আমাকে রেখে আসো। আমিও বাসায় মিথ্যা বলে এসেছি।’

জবাবে আবিদুরের বস কী বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।

তারপর চিৎকার করে বললেন, ‘কে কে ওখানে?’

মাথা নিচু করে আবিদুর উঠে দাঁড়ালেন।

‘আবিদুর সাহেব! আজ না অফিস ছুটি। আপনি তবু কেন এসেছেন?’

‘স্যার কয়েকটা জরুরি ইমেইল করা বাকি ছিল। আর আমার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তাই অফিসেই চলে এলাম।’

মাথা নিচু করেই বললেন আবিদুর।

জাফর আহমেদ গভীর বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে

থাকলেন যেন ভিন্ন গ্রহের কোনো প্রাণীকে দেখছেন।

ফলাফলও হলো বিস্ময়কর!

যাদের দরকার ছিল তারা কেউ পেল না।

যার দরকার নেই সেই-ই পেল অনেকখানি।

পরদিনই আবিদুরের বেতন বাড়ল।

দ্বিগুণ। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত