দাঁতাল বাংলাদেশের গল্প

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৪, ০১:৫৫ এএম

সুমন রহমানের নিরপরাধ ঘুম পড়লাম। ২০১৬ সালে বইয়ের নামগল্পটি কমনওয়েলথ ছোটোগল্প পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিল এবং ২০১৮ সালে প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার পাওয়ার জন্য বইটি পড়ার আগ্রহ জন্মে। এমন নিরাসক্ত, কৌতূহলী নামটিও অবচেতনে নাড়া দিতে পারে। তা ছাড়া লেখকের নির্মেদ চলাফেরা কিংবা কথাবার্তা, Writers Politicsi  অর্গল থেকে দূরে অবস্থান, কারও ব্যাপারে নাক গলানো, শুচিবায়ু মনোভাব তথা নিজের লেখকসত্তাকে থোড়াই কেয়ার করা ছিমছাম সুদর্শন শিক্ষক মানুষটির লেখার সঙ্গে পরিচিত হতে বইটি কিনলেও পড়ার পর মনে হয়েছে আরও আগে পড়া উচিত ছিল, বইটি নিয়ে বন্ধুমহলে সাড়ম্বরে কথাবার্তা বলার প্রয়োজন ছিল। এই যে হেমন্তের গা শিরশির করা বাতাস, মসজিদের মাইকে রেওয়াজহীন গলার বেসুরো সস্তা কথার তথাকথিত গজল নামের গান, বাজারে আগুন, ভিখারি বেড়ে যাওয়া বাস-রাস্তার মোড় কিংবা ফুটপাত, সন্ধ্যার পর বিক্রি হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকা নেকাবপরা মেয়েদের ভিড়, হত্যা, দেশ জুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা-স্থবিরতা-অনিশ্চয়তা ভরা মগজকে শান্তির জল ছিটিয়ে দেওয়া ছয়টি গল্পের স্বাদ ও লক্ষ্যবস্তু ভিন্নতর।

বিচারবহির্ভূত হত্যা বা ক্রসফায়ার নিয়ে লেখা নিরপরাধ ঘুম পড়ে অসহায়বোধ করি। অসংখ্য টেরিকাটা মানুষের মাথা দেখতে পাই, হিম, নিস্পন্দ। মতবিরুদ্ধ বা সন্দেহ হলেই সাঁড়াশি অভিযান, উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, অজ্ঞাত স্থানে বছরের পর বছর আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন, তারপর একদিন টেলিভিশনের খবর হয়ে যাওয়া, সেটুকুও অনেকের কপালে জোটেনি। এই ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার দেশে নতুন নয়, সেই চুয়াত্তর সালে সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার মাধ্যমে যাত্রা শুরু, এখন তা ফুলে ফেঁপে মহিরুহ হয়ে উঠেছে।

জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার যে কালচার, জীবনকে নিয়ন্ত্রণ এবং বধযোগ্য প্রাণ উৎপাদন করার যে রাজনৈতিক বাস্তবতা, নেক্রোপলিটিস, আশিল এমবেম্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত : : People for whom living means continually standing up to death

জীবন ও মৃত্যুর ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য কে বাঁচবে আর কে মরবে, কারা ক্ষমতায় থাকবে আর কারা খরচযোগ্য প্রাণে পরিণত  হবে এটাই ক্ষমতাতন্ত্রের মাজেজা। রাচেল অ্যাডামস, মিশলে ফুকোর যে জৈবরাজনীতি তার মূলে মানুষ, জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলিত করাই তার কাজ।

সাদা পোশাকে রাশেদকে ধরতে আসা পুলিশ, বাসায় ভাঙচুর, অস্ত্র-গোলাবারুদ দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি চাওয়া, তার জন্য শরীরের প্রতি ইঞ্চিতে পেটানো, ক্রসফায়ারের ভয় দেখানো। ফিরে এসে রাশেদ মাকে যতই বলুক, ‘এত্ত সহজ! দেশে আইনকানুন আছে, মিডিয়া আছে। খামাখাই ধৈরা নিয়া মাইরা ফালাইব?’ কিন্তু এ যে মাকে সান্ত্বনা দেওয়া, শরীর ও মনে অত্যাচারের কর্কট ব্যথায় মলম দেওয়া তা রাশেদ ভালো করেই জানে। আর এই আইনগুলো ঔপনিবেশিক, সংবিধান সমর্থিত। রাষ্ট্র যখন ব্যক্তি সন্ত্রাস বা অপরাধের বিরুদ্ধে বীভৎসরূপে হাজির হয়, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র ফ্যাসিস্ট হয়ে গেছে।

আর তাই রাশেদের ঘুম ছিঁড়ে ছিঁড়ে যায়, কখনো মৃত ভাই সামনে এসে দাঁড়ায়, কখনো বা মৃত বাবার পায়ের আওয়াজ শুনতে পায়। রাশেদের ভাষায়, ‘নিজের শিথানে বৈসা আমার এই নিরপরাধ ঘুমটারে যেন আমিই পাহারা দিই।’

বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তান শাহেদ, নেশাখোর মাস্তান, টাকা খেয়ে পুলিশ তাকে মিথ্যা হত্যা মামলার আসামি বানিয়ে দেওয়া ভুক্তভোগী মানুষের সংখ্যা গণনাতীত। রেমিট্যান্স পাঠানো সোনার ছেলেরা বিদেশে যে দুর্বিষহ জীবনযাপন করে, করুণভাবে মারা যায়, এর জন্য কারা দায়ী?

এ গল্পের ক্রাফটসম্যানশিপ মুগ্ধকর। ধাঁধাও জাগে রাশেদ কি সত্যিই ফিরে আসতে পেরেছিল জীবিত অবস্থায়, নাকি মৃতেরাই বারবার কলবেল বাজাচ্ছে? গল্পটি পড়তে পড়তে কেমন ভয় করে। স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বৈত তৎপরতার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া নিরপরাধ ঘুম একটি মাস্টারপিস গল্প।

আমার যত ভণিতা, জিনিয়াকে নিয়ে গল্পে মাংসাশী মিডিয়ার কদর্যতার কথা বলা হয়েছে। নায়িকা হতে গেলে আগে প্রডিউসারের বিছানায় যেতে হয়, এমন কথা মিডিয়ার বাইরের মানুষও এখন বিশ্বাস করে। আর এখন তো পুলিশের বড়কর্তা, মন্ত্রীদেরও মন জুগিয়ে চলতে হয়। তবে কি জিনিয়া একবার চান্স নেবে? সোলমানের কথামতো যাবে কি বিখ্যাত ডিরেক্টরের সান্ধ্যকালীন নির্জন সান্নিধ্যে? 

রিসিপশনিস্ট সোলমান, বোকাসোকা নির্বোধ যুবক, কর্তাব্যক্তিদের ঝাড়ি হজম করা তার প্রধান কাজ, সেও ‘প্রয়োজনে জাতিস্মর, প্রয়োজনে ভোলানাথ’ হয়ে যায়। টকশোর বুদ্ধিজীবী, উডবি ও অট-টুবি মেয়েদের সামলানো, তাদের রুচি ও চাহিদার মাপকাঠি  অনুযায়ী কথা বলা, গল্পের মারপ্যাঁচে জিনিয়ার মতো মেয়েকে মুগ্ধ করা, তার টাকায় হোটেলে খাওয়া এবং ছোট ভাইয়ের মতো বয়ফ্রেন্ডের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার গৌরব তবু সে ভয় পায়, যদি জিনিয়া সান্ধ্যকালীন সান্নিধ্যে জয়লাভ করে! কেন তার এই দুশ্চিন্তা? কেন সোলমান নিজেকে স্ক্রিপ্ট থেকে বাদ পড়া চরিত্র কিংবা জিনিয়ার মতো মেয়েদের সঙ্গে ভণিতা করে বেড়ানো ‘কেউ’ ভাবছে? গল্পের শেষটা চমকপ্রদ, দ্বৈত স্রোতকে সমূলে সরিয়ে ভিন্নমাত্রায় অভিষিক্ত করা, একদম অভিনব।

নীল হিজাব গল্পটি জঙ্গিবাদ নিয়ে লেখা। গিরগিটির রঙের মতো গল্পটি শুরু থেকে এমন অভিনবভাবে পাল্টে যায় যে, শেষ হলে ধন্দ লাগে যে, রোকসানা ওরফে ফাতেমা সপরিবারে আত্মঘাতী হওয়ার পরও কীভাবে বাঁচল? জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে স্বার্থপরতার ফণা বীমা সংস্থার চাকুরে আবুল বাশার ও লেখক হাসেম বিন আব্দুল্লাহের ভালোলাগার পরাজয় শেষমেশ গল্পটির নীল বিষ পাঠককে আচ্ছন্ন করে দেয়।

একটি রোহিঙ্গা উপকথা বিশাল ক্যানভাসের গল্প। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচারে হামলা, অগ্নিসংযোগ, হত্যার মধ্য দিয়ে একটি রোহিঙ্গা শিশুর বেঁচে যাওয়া, এবং একটি ধনী পরিবারের সহায়তায় নৌকা করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা, গল্পটি এখানেও শেষ করা যেত। কিন্তু না, সেই পালিয়ে আসা শিশু আলাল যেন আলাওল হয়ে পূর্বপুরুষের ভিটা ফরিদপুরে আসে, এ যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। নিঃসন্তান ডাক্তার নারী শাহানার হারানো প্রেমিক ওয়ালিউলকে মনে পড়া, এক সময় তারা দিনের পর দিন আলাওল আলোচনায় মেতে থাকত, কাছে আসত। সেই দানাবাঁধা প্রেম আলালের নামের আধারে আবারও হাজির। ওয়ালিউলের মনে পড়ে শাহানার কথা, আলাওলের কথা, আলাওল কি কখনো আরাকান থেকে নিজের জন্মভূমিতে ফিরেছিলেন? স্বামী ও সন্তানহারা সেই নারীর (আলাওলের মা) বেদনা, আশায় বেঁচে থাকা ইতিহাসের কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। এই রোহিঙ্গা বালক কি সেই আলাওলের ফসিল?

হাবা যুবকের হাসি গল্পে ভালোবাসার অন্য একটি দিক, যাকে আমরা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি, কিন্তু সেটাও যে সত্য, বিশ্বের বিশাল সংখ্যক মানুষ এর ন্যায্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছে। এই বিষয়টিকে সামনে নিয়ে কিংবা গভীরে নিয়ে শিমুলের যাপন, লজ্জা, স্মৃতি, একসময় ভুলে যাওয়া সবকিছু এমনভাবে মোড়ানো যেন একটি কবিতা, স্বগতোক্তি, নিজস্ব সত্তা হারিয়ে কৃত্রিমতায় বসবাস। কিন্তু কেউ না কেউ সেই সত্তা বহন করে, সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়, একদিন তা ফুলময় হবে এই আশায়। শিমুলে সুগন্ধ জাগবেই। সমকামিতা এখন বৈশি^ক কণ্ঠ।

সুপারহিরো পরিবারে একটা খুব অর্ডিনারি পাতাঝরা দিন গল্পটি একটি স্কুলপড়ুয়া অস্বাভাবিক ছেলের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি তীব্র আকর্ষণ, যা কোনো বাঁধ মানে না, সান্ত্বনা জানে না; বাবা-মায়ের খেদ-অসহায়ত্ব তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। একমাত্র সন্তানের এই অসামাজিকতা, অশিষ্টতা তাদের ভাবিয়ে তোলে, এখন তারা কী করবে? বয়সে বড় সম্পর্কে খালা হয় এমন মেয়েকে পাওয়ার জন্য ছেলের এই নাছোড়বান্দা মনোভাব, অসৌজন্য আচরণ অব্যাহত রাখা, এর জন্য কি সেই উঠতি বয়সী মেয়েটিও দায়ী নয়? সে কি এই অপাপবিদ্ধ, অস্বাভাবিক ছেলেটিকে যৌনতার চোরাগলিতে নিয়ে যায়নি? ছেলেটার বাবা দ্যাখে, চারপাশের পরিবেশ ঠিক আছে, এই অসুস্থ পারিবারিক পরিবেশও ঠিক হয়ে যাবে, কোনো এক সুপারহিরো সবকিছু ঠিকঠাক করে দেবে। কারণ, এই যৌনতা স্বাভাবিক, শৈল্পিক স্বীকৃতি তার প্রাপ্য।

স্বতন্ত্র স্বতঃস্ফূর্ত কবিত্বময় ভাষা, কোনো জবরদস্তি নেই, পরিমিতিবোধ অক্ষুন্ন। গভীর উপলব্ধি, ভাবে বৈচিত্র্যময়। গল্পগুলোতে দুটি ধারা লক্ষণীয়, একটা সামনে এগোয়, আরেকটা পেছনে থাকে, ব্যাকগ্রাউন্ডের মতো। কখনো কখনো এই পেছনের গল্পটি সামনে চলে আসে। গল্পে চূড়ান্ত পরিণতি নেই। গল্পের পরতে পরতে বাংলাদেশ, দাঁতাল রাষ্ট্র কোথাও উজ্জ্বল কোথাও-বা কুয়াশা ঢাকা, শেষমেশ প্রভাবশালী ভাববলয় পেরিয়ে নিষ্পেষিত ব্যক্তির পক্ষে দণ্ডায়মান।

সুমন রহমানের মনন-চিন্তন আরও বৌদ্ধিক, শৈল্পিক, পরিশ্রমী ও ক্ষুরধার হয়ে উঠুক। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত