বসুন্ধরা কিংসের নয়া হেড মাস্টার ভ্যালিরিউ তিতা অতীত ভুলে তাকাতে চান সামনে। ঘরোয়া ফুটবলে সফল হওয়া সত্ত্বেও স্প্যানিশ অস্কার ব্রুজোনকে বিদায় জানিয়ে রোমানিয়া থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছিল তিতাকে। অভিজ্ঞ কোচের প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট ছিল এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের গ্রুপপর্ব। ক্লাবের আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্সটা হয়েছে তার অধীনেই। সেই ধাক্কা সামলে কিংস জিতে নেয় মৌসুম সূচনার বাংলাদেশ ২.০ চ্যালেঞ্জ কাপ। তলানিতে পৌঁছে যাওয়া আত্মবিশ্বাস তাতে ফিরে আসে। মোহামেডানের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে ৩-১ গোলের জয় পুঁজি করে আজ বসুন্ধরা শুরু করবে হেক্সা অভিযান। টানা ছয় লিগ শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়ার হাতছানি দলটির সামনে। তবে আগের পাঁচবারের মতো অত সহজ হবে না কাজটা। তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে বেশ ভালোভাবেই প্রস্তুত মোহামেডান। গত মৌসুমে লিগসহ তিন আসরেই রানার্সআপ সাদা-কালোরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে পেশাদার যুগে প্রথম লিগ শিরোপার স্বাদ পেতে। ধারে-ভারে এই দুই দলের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও আবাহনীকে শিরোপা সমীকরণের বাইরে রাখার সুযোগ নেই। সর্বোচ্চ ছয় লিগজয়ীরা এবার খেলবে বিদেশি ফুটবলার ছাড়া। তবে সেরা স্থানীয়দের নেওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষিত মারুফুল হককে কোচের দায়িত্ব দিয়ে আকাশি-হলুদ শিবিরও বসুন্ধরা-মোহামেডানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত।
কাগজে-কলমে এবারও সেরা দল বসুন্ধরা কিংস। তাই বলে দেশের পটপরিবর্তনের প্রভাব যে একেবারে বসুন্ধরা কিংসের ওপর পরেনি, তা নয়। দলটির এবারের বিদেশি সংগ্রহেই সেটা পরিষ্কার। আগের তিন মৌসুমে শিরোপা জেতানোর অন্যতম নায়ক ব্রাজিলিয়ান রবসন রবিনহো বেশি বেতন দাবি করায় ছেড়ে দিয়েছে কিংস। তার জায়গায় তার মানের কোনো খেলোয়াড় নেওয়া সম্ভব হয়নি। গত দুই মৌসুমের গোলমেশিন ডরিয়েলটন গোমেজ, ডিফেন্ডার ববুরবেকও নেই। একজন ফরাসী স্ট্রাইকারকে দলে নিলেও চোটের কারণে এখনো নিজের সেরা রূপটা দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া কিংস শিবিরে চোট ভালোভাবেই হানা দিয়েছে। লিগের শুরু থেকে বিশ্বনাথ ঘোষ, তারিক কাজীর মতো পরীক্ষিতদের সার্ভিস তারা পাচ্ছে না। ছোট সোহেল রানারও ফিরতে সময় লাগবে। এ নিয়ে কদিন আগ পর্যন্ত হাপিত্যেশ করতে দেখা গেছে তিতাকে। ভুটান বিপর্যয়ের জন্য তো তিনি ক্লাব ম্যানেজমেন্টকেও তুলে দিয়েছিলেন কাঠগড়ায়। বলেছিলেন, সেই মানের আসরে খেলার মতো দল তাকে দেওয়া হয়নি। এদিক, সেদিক থেকে ধার করা বিদেশিদের নিয়েও খুশি ছিলেন না তিনি। তবে ২২ নভেম্বর চ্যালেঞ্জ কাপের পর কিছুটা স্বস্তিতে তিতা। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়ার পর দলের অসাধারণ প্রত্যাবর্তনে মহাখুশি কোচ। দলের অন্যতম অস্ত্র মিগেল ফিগেইরার স্বরূপে ফেরার পর লিগ নিয়ে ভীষণ আশাবাদী তিতা বলেন, ‘এএফসি (চ্যালেঞ্জ লিগ) এখন আমাদের কাছে অতীত। আমরা অতীত ভুলে শুধু সামনের দিকে তাকাতে চাই। লিগে আমাদের লক্ষ্য ম্যাচ বাই ম্যাচ এগিয়ে যাওয়া। প্রতিটি ম্যাচ থেকে তিন পয়েন্ট পেতে চাই।’ নিজেদের ভেন্যু কিংস অ্যারেনায় আজ প্রথম ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ দুর্বল চট্টগ্রাম আবাহনী।
গত মৌসুমে কিংসকে সবচেয়ে বেশি ভোগানো মোহামেডান অবশ্য মৌসুমটা শুরু করেছে হতাশায়। কিংসের কাছেই চ্যালেঞ্জ লিগে হারটা তাদের জন্য বড় ধাক্কা। গত মৌসুমের সাফল্য থেকে উৎসাহিত হয়ে সফল কোচ আলফাজ আহমেদে আস্থা রেখেছে সাদা-কালোরা। দল গঠনের দায়িত্বও ছিল কোচের ওপর। অভিজ্ঞ আলফাজ চেষ্টা করেছেন আগের মৌসুমের দলটাকেই রেখে দিতে। এ ক্ষেত্রে তিনি সফলও। তিন-চারজন স্থানীয় খেলোয়াড় অন্য ঠিকানা খুঁজে নিলেও সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছেন পরীক্ষিতদের সুযোগ দিয়ে। মোহামেডানের সবচেয়ে বড় শক্তি পুরনো চার ভিনদেশি। মালির ফরোয়ার্ড সুলেমান দিয়াবাতে তো ঘরের ছেলেই পরিণত হয়েছেন। প্রতিপক্ষে ডি-বক্সে আতঙ্ক ছড়ানো দিয়াবাতে এবারও নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোহামেডানকে। সঙ্গী হিসেবে তিনি পাচ্ছেন উজবেক প্লে-মেকার মোজাফফরভকে। এ ছাড়া স্যানডে, টনির মতো বিদেশিরা এবারও মোহামেডানের বড় আস্থার জায়গা। যদিও কোচ আলফাজ বড় কোনো প্রত্যাশার কথা আগেভাগে বলার লোক নন। ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়াই তার লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘শিরোপা জিততে হলে তিনটি বিষয় লাগে। ভালো খেলোয়াড়, ভালো কোচিং স্টাফ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা। এই তিনের মেলবন্ধনে আসে চূড়ান্ত সাফল্য। আমার মনে হয় এখানে কিছুটা ঘাটতি তো আছেই। আমরা ট্রেনিংয়ের জন্য কখনোই ভালো সুযোগ-সুবিধা পাই না। খেলোয়াড়-কোচদের বেতন নিয়ে সমস্যা আছে। অন্যদিকে দেখুন, বসুন্ধরা কিংস কিন্তু সব দিক থেকেই শক্তিশালী। তারপরও আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে শিরোপা জয়ের। বাকিটা সময়ই বলে দেবে।’ আবাহনীকেও আলফাজ পিছিয়ে রাখতে চাইছেন না, ‘মোহামেডান-আবাহনীর জার্সির একটা অন্যরকম তাপ থাকে। আবাহনী এবার পটপরিবর্তনের কারণে বিদেশি নিতে পারেনি। তবে সেরা স্থানীয়দের নিয়ে সেরা একজন কোচ কাজ করছেন। সুতরাং তাদের পিছিয়ে রাখার সুযোগ নেই।’
আবাহনীরও খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তাদের আস্থার জায়গটাই হলো বিশ্বাস। তারা বিশ্বাস রাখতে চান আকাশি-হলুদ জার্সিতে। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর আবাহনীর দল গড়াই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তারপরও শেষ দিনে তারা দল গড়ে গত মৌসুমে মাঠে পারফর্ম করা স্থানীয়দের নিয়ে। এরপর কোচ হিসেবে তারা নিয়োগ দেয় মারুফুল হককে। বিদেশিরাই ব্যবধান গড়ে দেয় এই বাস্তবতা মানলেও নিজেদের শিষ্যদের ওপর মারুফের আস্থার কমতি নেই, ‘কোচিং ক্যারিয়ারে বড় একটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। আবাহনীর মতো দলের দায়িত্ব নেওয়াটা যেকোনো কোচের জন্যই স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো ব্যাপার। তবে এবারের প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। তারা বিদেশি খেলোয়াড় নিতে পারেনি। তবে স্থানীয় যারা আছে, তারা প্রত্যেকেই গত মৌসুমে পারফর্ম করেছে। আর দায়িত্ব নেওয়ায় মাঠের প্রস্তুতির পাশাপাশি ছেলেদের মানসিকভাবেও প্রস্তুত করেছি। যাতে তারা বাস্তবতা মেনেই নিজেদের সেরা ভাবতে পারে, মাঠে সেরাটা দিতে পারে। আমি তো মনে করি আবাহনীর খেলোয়াড়দের জন্য নিজেদের প্রমাণ করার এটা একটা সুবর্ণ সুযোগ। আর আবাহনী সবসময়ের মতো এবারও শিরোপায় চোখ রেখেই খেলতে নামবে।’ প্রথম লেগটা ভালোয় ভালোয় পার করাই এখন আবাহনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই পর্বে খুব বেশি পিছিয়ে না পড়লে মধ্যবর্তী দলবদলে তাদের সুযোগ থাকবে বিদেশি নিয়ে আসার। সুতরাং শিরোপা লড়াইয়ে তাদের না রেখেও উপায় নেই। এবার আবাহনী হোম ভেন্যু করেছে কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামকে। যদিও ৩০ ডিসেম্বর তাদের সপ্তম শিরোপা অভিযান শুরু করতে হবে ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের বিপক্ষে গাজীপুরের শহীদ বরকত স্টেডিয়ামে।
বিদেশি নেই বলে আবাহনী একটু পিছিয়ে থাকলেও বসুন্ধরা কিংস ও মোহামেডানকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত তারা। তাই এবারের শিরোপা লড়াইটা ত্রিমুখী বলাই যায়।
