বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমের গাড়িবহরে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ট্রাকের ধাক্কা, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে হাসনাতকে বহনকারী প্রাইভেট কারে পিকআপ এবং গুলিস্তানে মিনি-ট্রাকের ধাক্কার ঘটনাকে পরিকল্পিত হত্যাচেষ্টা বলছেন আন্দোলনের সমন্বয়করা। আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের এর জন্য দায়ী করছেন তারা।
এসব ঘটনায় একটি জিডিও করা হয়েছে। শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পক্ষের দিক থেকে হাসনাত-সারজিসদের রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ নিরাপত্তা দেওয়ার দাবি উঠেছে। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা বলছেন, তারা কোনো বিশেষ নিরাপত্তা নেবেন না। বরং সবার জন্য কঠোর নিরাপত্তা দাবি জানিয়েছেন। তবে সমন্বয়কদের নিরাপত্তার বিষয়ে গতকাল প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সংবাদ সম্মেলনে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘এটাকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই সমন্বয়করা বিভিন্ন ইস্যুতে জাতিকে যেভাবে এক্যবদ্ধ করার প্রয়াস চালাচ্ছেন, জাতির বিকেকে জাগ্রত করার চেষ্টা করছেন, তা অনেকের স্বার্থেই আঘাত হানবে। ফলে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আজকে (গতকাল) কেবিনেটে উঠানোর পর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এটা সরকার মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছে না। সাম্প্রতিক বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত করছে।
গত বুধবার ও গতকাল বৃহস্পতিবারের এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন ছাত্রনেতারা। তারা বলছেন, আগামীতেও এমন অপতৎপরতা চলতে পারে। নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থেকে নিয়মিত প্রোপাগান্ডা ও হুমকি দেওয়ার ঘটনাকেও সন্দেহের চোখে দেখছেন তারা। মামলা থাকা সত্ত্বেও তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।
গতকাল বৃহস্পতিবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহকে দ্বিতীয়বারের মতো গাড়িচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এই হত্যাচেষ্টা করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে হাসনাত জানান, প্রথম মাতুয়াইলে একটি ট্রাক তাদের বহনকারী গাড়িটিতে আঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে গুলিস্তানে আবারও মিনি-ট্রাকের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গাড়ি। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলেও পর পর দুর্ঘটনার বিষয়টি ‘পরিকল্পিত হামলা’ বলে সন্দেহ হাসনাত আবদুল্লাহর।
এর আগে গত বুধবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমকে ট্রাকচাপা দিয়ে হত্যাচেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানায় একটি জিডিও করা হয়েছে।
লোহাগাড়া থানার দায়িত্বরত সহকারী উপপরিদর্শক মো. আলিম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ট্রাক জব্দ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে একটি আইনগত প্রক্রিয়া চলছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসুদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দফায় দফায় হামলা কারা করছে, সেটা বুঝায় যাচ্ছে। দেশ-বিদেশে পরাজিত শক্তিরারা হামলা করছে। তারা হাসনাত এবং সারজিসকে টার্গেট করছে, কেননা তারা দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তারা এ দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এজন্য তারা তাদেরই টার্গেট করেছে। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে, তারা এটা দ্রুত তদন্ত করবে বলে আমরা মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘তবে আমরা কোনো রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা চাইব না। দেশের সাধারণ মানুষের যেমন নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে, তেমন নিরাপত্তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। সরকার চাইলেও আমরা সেই বিশেষ নিরাপত্তা নেব না। বিষয়গুলো নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের খুবই উদ্বিগ্ন। যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, দ্রুত তাদের মুখোশ উন্মোচন করার দাবি জানাচ্ছি আমরা।’
আওয়ামী লীগ এবং তাদের দোসররা জড়িত উল্লেখ করে অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদের নেতৃত্বেই এ দেশ থেকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার উৎখাত হয়েছে। সে কারণেই পতিত স্বৈরাচার এবং তাদের দোসররা প্রতিশোধ আর ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে ছাত্র নেতৃত্বকে বারবার টার্গেট করে মেরে ফেলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে এ দেশের লক্ষ- কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন জড়িত। কাজেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। পতিত স্বৈরাচারের দোসররা প্রতিবিপ্লবের নেশায় মরিয়া হয়ে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে, দিনে-দুপুরে মানুষ খুন করতে দ্বিধা বোধ করছে না। এ ক্ষেত্রে পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। খুনিদের শাস্তির আওতায় আনতে না পারলে তারা বাইরে থেকে আবারও খুনখারাবিতে মত্ত হয়ে উঠবে, দেশকে চরম মাত্রায় অস্থিতিশীল করে তুলবে, যেটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
আরেক সমন্বয়ক মাহিন সরকার বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের ওপর হামলার অন্যতম কারণ হতে পারে বাংলাদেশে নতুন শক্তির অভ্যুদয় কোনোভাবেই মানতে পারছে না পরাজিত শক্তি এবং তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দোসররা। এসব নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন খুব বেশি চিন্তিত নয়, আমরা মাঠের কর্মসূচির দিক মনোযোগ ধরে রাখতে চাই।’
আগামীতে আরও অপতৎপরতা চলতে পারে উল্লেখ করে সমন্বয়ক তারেকুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক মাস ধরে আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতারা বিভিন্ন প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। ছাত্রনেতাদের জনপ্রিয়তা কমানোর মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করাই তাদের টার্গেট। হাসনাত ও সারজিস আলমের ওপর হামলা করার মাধ্যমে তারা সেটার চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে। কারণ তাদের সরানো গেলেই তাদের পথ সহজ হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা মনে করি, এটা তাদের জন্য বুমেরাং হয়েছে। এর মাধ্যমে আমাদের ঐক্য আরও শক্তিশালী হয়েছে। তারা এখনো অনেক সক্রিয় এবং সব ধরনের ষড়যন্ত্র চালু রেখেছে। যেহেতু তাদের কাছে প্রচুর অবৈধ টাকা, তারা সেটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করবে। তারা আগামীতে আরও বেশি অপতৎপরতা চালাবে বলে আমরা ধারণা করছি।’
হামলার বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আপনারা দেখছেন বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও তাদের সেল আমাদের হত্যা করার ঘোষণা দিচ্ছে প্রকাশ্যে। আমাদের মৃত্যুভয় দেখানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা এই মৃত্যুভয় পরোয়া করি না। আমরা জিডি করেছি, এটা যদি হত্যাচেষ্টা হয়, তবে প্রশাসন তদন্তসাপেক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।’
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, একজন হাসনাত মারা গেলে, একজন সারজিস মারা গেলে কিছুই হবে না। আন্দোলনের সময় আমরা দেখেছি পুলিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলছে একটা গুলি লাগে, একজন পড়ে, আবার অন্য একজন উঠে দাঁড়িয়ে যায়। আমরা একজন পড়ে গেলে আরেকজন হাসনাত, আরেকজন সারজিস দাঁড়িয়ে যাবে। কোনো কিছুই থেমে থাকবে না।’
