সম্প্রতি কিছু ব্যাংকে অনাকাক্সিক্ষত দৃশ্য দেখা গেছে। টাকা তুলতে আসা গ্রাহকদের তারল্যের অভাবে টাকা দিতে না পারায় গ্রাহক ও ব্যাংক কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অনেকে নিজের জমাকৃত বেতনের অঙ্কটা পর্যন্ত তুলতে পারেনি। কিছু ব্যাংকের শাখাগুলোতে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। দল বেঁধে অসহায় গ্রাহকরা বিক্ষোভ করেছেন। অন্যদিকে ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় হেনস্তার শিকার ব্যাংক কর্মচারীদের কেউ কেউ চাকরি ছাড়ার মতো সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। তবে আপাতত স্বস্তির খবর এই যে, ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট কিছুটা কমেছে।
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে বিভিন্ন উদ্যোগের অংশ হিসেবে টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন টাকা সরবরাহের পর দুর্বল ব্যাংকগুলোর গ্রাহকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরছে। তবে অস্বস্তি কাটেনি ব্যবসায়ীদের। উচ্চ-সুদহারের কারণে শিল্প মালিকদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছে। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর নিশ্চিত করে বলেছিলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সহায়তা করতে শুরু করায় ডিসেম্বর থেকে গ্রাহকদের টাকা পেতে সমস্যা হবে না। চলতি সপ্তাহে এর কিছুটা প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে। গ্রাহকরা চেক দিয়ে এবং বন্ধ থাকা এটিএম বুথ থেকে স্বল্প পরিমাণে হলেও টাকা তুলতে পারছেন। তারল্যের তীব্র সংকটে থাকা একটি ব্যাংক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। তবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান জানান, শাখাগুলোতে লেনদেন অনেকটাই স্বাভাবিক। তিনি মনে করেন, গ্রাহকদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি হওয়ায় সব গ্রাহক টাকা তুলতে আসায় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। এক্সিম ব্যাংকের মতিঝিল শাখাতেও গ্রাহকদের টাকা তোলার লাইন দেখা গেছে। শাখার ম্যানেজার জানান, কোনো কোনো গ্রাহক এক লাখ টাকাও তুলতে পেরেছেন। এটিএম বুথগুলোতেও ১০ হাজার টাকা করে তোলা যাচ্ছে।
তবে ব্যবসায়ীদের দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে উচ্চ সুদের হার। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে কয়েক দফা নীতি সুদহার বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ২২ অক্টোবর নীতি সুদহার বা রেপো রেট আরও ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২২ সালের মে মাসের পর থেকে এই নিয়ে এগারো বারের মতো নীতি সুদহার বাড়ানো হলো। ইতিমধ্যে ব্যাংকঋণের সুদের হার প্রায় ১৬ শতাংশে উঠেছে। এতে ছোট-বড় সব খাতের ব্যবসায়ীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সুদের হার বৃদ্ধি পেলে ঋণের কিস্তির অঙ্কও বেড়ে যায়। এমনিতেই ডলার ও গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য কমে গেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে আস্থা পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় ক্রমাগত সুদহার বৃদ্ধিতে নিদারুণ চাপে পড়েছেন তারা। কমে গেছে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা। বেসরকারি ঋণে চলছে ধীরগতি, বিনিয়োগে চলছে এক প্রকার স্থবিরতা। এর প্রভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদিকে প্রায় চার বছর পর ক্রেডিট কার্ডেরও সুদহার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন বছর থেকে ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশের বেশি সুদ নিতে পারবে। এর আগে এই সীমা ছিল ২০ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। দুনিয়াব্যাপীই সুদের হারকে কমিয়ে-বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে বাংলাদেশের ব্যাংক খাত গত দেড় দশকের স্বৈরশাসনে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। এই ক্ষত কাটিয়ে ওঠা খুবই দুরূহ। অন্তর্বর্তী সরকারকে এই কঠিন কাজটি করতে হবে।
