বারবার কমিউনিজমের ভূত দেখে দ. কোরিয়া

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:১৭ এএম

আইনসভা এবং প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রির মধ্যে মুখোমুখি সংঘাতের একটি ধ্রুপদি রাজনৈতিক ডামাডোল মঞ্চস্থ হলো দক্ষিণ কোরিয়ায়। নানা নাটকীয়তায় পার্লামেন্ট সার্বভৌম ক্ষমতা ও জনপ্রতিনিধিত্বের শক্তিতে ভাস্বর হলো, এতে পরাস্ত হলো প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র ক্ষমতাচর্চার সুযোগ। ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান যে কতটা জরুরি, তা আরও একবার দক্ষিণ কোরিয়ায় দৃশ্যমান হলো। এটি এমন এক নজির হয়ে থাকল, যা প্রেসিডেন্সিয়াল ডেমোক্রেসিগুলোর জন্য বিশেষ শিক্ষণীয় কিছু রেখে গেল। দিন শেষে আইনসভাই যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রাণকেন্দ্র হওয়া উচিত, তা-ও স্বীকৃত হলো। নির্দ্বিধায় বলা যায়, গণতন্ত্র-অন্তঃপ্রাণ রাজনৈতিকবোদ্ধাদের কাছে দক্ষিণ কোরিয়ার ঘটনাবলি অবিস্মরণীয় ও অসাধারণ কিছু। তবে মুদ্রার উল্টোপিঠে এ বিষয়ও দেখতে হবে, ঠিক কী কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রায় সুস্থিত ও গতিশীল অর্থনীতির দেশে সামরিক আইনের মতো বজ্রপাত আছড়ে পড়ল। এ-ও মনে রাখা প্রয়োজন, সিউলের রাজনীতিতে সামরিক আইন অপরিচিত কিছু নয়।

গত মঙ্গলবার রাত থেকে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে বিক্ষোভকারী জনতা এবং আধা-সেনাদের মুখোমুখি অবস্থানের সময় ১৯৮০ সালের মে মাসের সেই কুখ্যাত গুয়াংজু হত্যাকা-ের কথা মনে পড়ছিল। সিউল থেকে আড়াইশ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর গুয়াংজু সে সময় রক্তাক্ত হয়েছিল। ওই সময় সামরিক শাসক চুন দো-হোয়ানের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ ঠেকাতে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের ওপর নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায় সামরিক বাহিনী। এতে সরকারি হিসেবেই দুই শতাধিক নিহত হওয়ার কথা শোনা যায়। বিশে^র অনেক গণমাধ্যম এই ঘটনায় নিহতের সংখ্যা হাজারের ওপরে বলে জানিয়েছিল। সেই বিক্ষোভ দমন করে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ক্ষমতার রাশ নিজের হাতে রেখেছিলেন দো-হোয়ান। ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং-হি গোয়েন্দা প্রধানের হাতে নিহত হলে, একই বছরের ডিসেম্বরে দো-হোয়ান সামরিক আইন জারি করেছিলেন। শাসনকে আরও পাকাপোক্ত করতে পরের বছরের মে মাসে তার প্রশাসন ওই নৃশংস হত্যাকা- ঘটায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দক্ষিণ কোরিয়ায় আজ অবধি যে কজন সামরিক আইন জারি করলেন, তাদের বৈধতা আদায়ের পন্থা একই।

১৯৮৭ সালের পরই দক্ষিণ কোরিয়ায় গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হয়। তখন থেকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত এলেও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা অব্যাহত ছিল। উত্তর কোরিয়ার কমিউনিস্ট শাসনের পাশে দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্র পশ্চিমা বিশ্বের মূল্যবোধের প্রতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। প্রাচ্যে দক্ষিণ কোরিয়া হলো মতপ্রকাশ ও মানবাধিকারের মতো পশ্চিমা ‘সফট-পাওয়ার’-এর অন্যতম এক স্টেশন। এশিয়ায় চীন ও উত্তর কোরিয়াসহ সব কর্র্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসকদের বিরুদ্ধে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে বিজ্ঞাপিত করে পশ্চিমারা। কাজেই, এসব দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোয় সামরিক শাসন তাদের জন্য ভালো কিছু নয়।

শুরুতে বিক্ষিপ্ত মনে হলেও, শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলের সামরিক শাসন জারির বিরুদ্ধে যথাযোগ্য প্রতিরোধ তৈরি হয়। প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রি সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতাদের ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপে থমকে যায়। ৩০০ আসনের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ১৯০ জন ভোটাভুটিতে অংশ নিয়ে সামরিক আইন ঠেকিয়ে দেন। বিরোধী নেতা লি জে-ইউং আধা সামরিক বাহিনী ও পুলিশের বাধা ডিঙিয়ে দেওয়াল টপকে পার্লামেন্ট ভবনে হাজির হন। সামরিক আইনের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের অভিমত স্পষ্ট হওয়ার পর সুক-ইওলকে অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বিরোধীরা। অবশ্য সুক-ইওলের দল যেকোনো মূল্যে অভিশংসন ঠেকানোর ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতির এই আড়াআড়ি বিভাজন এখন আরও শানিত হবে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে বিশ্ব গণমাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার নাটকীয় রাজনৈতিক ঘটনাবলি প্রতিনিয়ত বঙ বদলাচ্ছে। 

দক্ষিণ কোরিয়ার এ ঘটনা সত্যিকার অর্থে বিশ্ববাসীর কাছে আচমকা কিছু ঘটে যাওয়ার মতো। দেশটির ইতিহাসে সর্বশেষ সত্তরের দশকের শেষ আর আশির দশকের শুরুতে সামরিক শাসনের কালো ইতিহাসের আগেও সেখানে কর্র্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার ইতিহাস রয়েছে। বর্তমানে ব্যাপক মেরুকরণ আর বিভাজনের বাস্তবতার মধ্যে ক্ষমতাচর্চা, দুর্নীতি, বিচারব্যাবস্থা কুক্ষিগতকরণ ও বিরোধী পক্ষকে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। তিন দশকে সেখানে প্রেসিডেন্টের সাজাপ্রাপ্তি, দায়মুক্তি ও ক্ষমা পাওয়ার বেশ কয়েকটি নজির রয়েছে। সম্ভবত সুক-ইওলের আগামী দিনগুলো স্বস্তির হবে না। ক্ষমতা হারানোর পর তাকেও বিচারের মুখে পড়তে হতে পারে। সামরিক আইন দিয়ে দেশ শাসনের পথে হাঁটতে গিয়ে সুক-ইওল চরম রাজনৈতিক ভুল করলেন বলে মনে করা হচ্ছে। তাকে অভিশংসনের মুখে পড়ে রাজনীতির মাঠও ছাড়তে হতে পারে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিসহ বিস্তর অভিযোগ। তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতিমূলক কাজে জড়ানোর কথাগুলো আবারও সামনে আসতে শুরু করবে।

১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কোরীয় উপদ্বীপে উত্তর ও দক্ষিণের মুখোমুখি লড়াই এখনো দুই অংশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার আধার। বিশেষত দক্ষিণ কোরিয়ার পশ্চিমা ভাবধারার শাসকরা উত্তর কোরিয়া-ভীতিকে রাজনীতির ঢাল বানিয়ে চলেছেন দশকের পর দশক ধরে। পতিত স্বৈরাচারী শাসকরা এভাবে বিভাজনের কার্ড খেলতে পছন্দ করেন, কখনো কখনো টিকেও যান এই পন্থায়। শীতল যুদ্ধের সময় পার হলেও দুই কোরিয়া দ্বিমেরু বিশ্বের বিভাজনের স্মৃতিকে নিজ নিজ ভূখ-ে বহন করে চলেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিকরা নিয়ম করে এই ভীতি আর বিভাজনের রাজনীতিকে পরিপুষ্ট করছেন। অথচ উত্তর কোরিয়ার কল্পিত আক্রমণের দৃশ্যপট এতই অসার যে, ফিকশনকেও হার মানাতে পারে। কারণ দেশটিতে এখন ৩০ হাজারের মতো মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। পিয়ংইয়ংয়ের শাসকরা এতটা বোকা নন যে, মৌচাকে ঢিল দেবেন। সিউলের শাসকদের এসব যাচ্ছেতাই কারবার অতীতেও লজ্জার ইতিহাস তৈরি করেছে। এ বিষয়ে আশির দশকেরই একটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। জেনারেল দো-হোয়ান সামরিক আইন জারির পর ১৯৮০ সালের ১০ মে প্রধানমন্ত্রী শিন হিয়ন-হোয়াক সেনাশাসনের পক্ষে যুক্তি সাজাতে জনসমক্ষে আসেন। তিনি জানান, ‘নিকটতম মিত্র’ দেশ জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার সেনারা এগিয়ে আসছে এবং সেই খবর পেয়েই তারা দেশকে রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছেন। ওই সময় সংবাদমাধ্যমের বেশ কয়েকটি সূত্র জানায়, আশির দশকে সিউলের মিত্র ওয়াশিংটন ও টোকিও ওই ধরনের কোনো হুমকির কথা দুই মিত্রের কেউই জানায়নি। এবার সুক-ইওলের বিষয়টিও তাই ঘটল। পিয়ংইয়ংয়ের সেনাদের কোনো নাড়াচাড়ার কথা শোনা যায়নি। তা ছাড়া পশ্চিমা গণমাধ্যমই দাবি করছে, উত্তর কোরিয়ার সেনাদের একাংশ ইউক্রেনের আক্রমণ ঠেকাতে রাশিয়ায় রয়েছে।

সর্বশেষ আইনসভা নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলের দল পিপল পাওয়ার পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। আইনসভায় বৃহত্তম দল হয় ডেমোক্রেটিক পার্টি। ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের কারণে নির্বাচনের আগে থেকেই তিনি সমালোচিত। তাই সামরিক আইন জারি ভবিষ্যৎ বাঁচানো ছাড়া উপায় ছিল না তার কাছে। তিনি  ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিরোধী মহল ও নাগরিক সমাজ থেকে তদন্তের আহ্বান জানানো হলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়ে আসছে। সুতরাং বিশ্লেষকরা সামরিক শাসনকে প্রেসিডেন্টের টিকে থাকার অস্ত্র হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে, পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বড় বড় সিদ্ধান্ত নিতে বারবার আটকে যাচ্ছিল সুক-ইওলের প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট যখন আইনসভায় নিজের কর্র্তৃত্বের আদেশ বাস্তবায়নের জায়গা পাচ্ছিলেন না, তখনই সামরিক আইন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। সর্বশেষ বিরোধী দলের সঙ্গে বাজেট পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে প্রেসিডেন্টের বিরোধ চলছিল।

লেখক: অনুবাদক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত