গুজব ছড়ানোর পরিণতি ভয়াবহ

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:১৮ এএম

গুজব অর্থ এমন তথ্য ছড়ানো, যার কোনো ভিত্তি নেই। গুজব বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। একটি হলো, উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কোনো ব্যক্তি বা বস্তু সম্পর্কিত কোনো বিষয়, ঘটনা বা তথ্যের বানোয়াট, অমূলক ও বিকৃত বর্ণনা করা। এটি বড় পরিসরের গুজব। এর সঙ্গে প্রচণ্ডভাবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা থাকে। পৃথিবীতে গুজববান্ধব কিছু দেশ আছে। যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গুজব ছড়িয়ে থাকে। মূলত তারা কয়েক প্রজন্ম ধরে মারাত্মকভাবে গুজব উপসর্গে আক্রান্ত। তাই গুজব দিয়ে অন্যদের ওপর আক্রমণ করে। আমাদের দেশের মানুষের মধ্যেও গুজব প্রবণতা কম নয়। তবে সেটা ঘরোয়া পর্যায়ের। কখনো কখনো জাতীয় পর্যায়েও চলে যায়।

আমাদের চারপাশের মানুষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তাদের অনেকেই ছোট পরিসরের গুজবে ভাসমান। তাদের এক বন্ধু অপর বন্ধুকে বলে, ‘অনেক দিন দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। চলো, একদিন আড্ডা দিই, গল্পগুজব করি।’ লক্ষ্য করুন, এ দেশে ‘গল্প’ ও ‘গুজব’ শব্দ দুটি সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে! অফিসে দুই কলিগ কাজের ফাঁকে কথা বলছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এটা দেখে তাদের বললেন, ‘গল্পগুজব রেখে কাজ করো।’ ক্লাসে শিক্ষক এসে দেখলেন, শিক্ষার্থীরা হইচই করছে। তিনি বললেন, ‘গল্পগুজব বাদ দিয়ে পড়াশোনায় মন দাও।’ বাস্তবতা হলো, যেকোনো আড্ডা, আসর, মিটিং, বাড়ি কিংবা অফিস সব জায়গায় প্রায় মানুষ বাস্তব কথাবার্তার সঙ্গে গুজব বা ভিত্তিহীন তথ্যের মিশ্রণ করে থাকে। এটাকে বলা হয় ‘বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলা’। এই বাড়িয়ে বলা বিষয়টি সম্পর্কে অন্যদের জানা থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তারা বলে, ‘আপনি তো আজগুবি কথাবার্তা বলছেন’! আর সেই বিষয়টি যে আজগুবি নয়, সেটা প্রমাণ করার জন্য তাকে আরও গুজব করতে হয়!

গুজব ছড়ানো মারাত্মক গুনাহের কাজ। চাই সেটা বড় পরিসরে হোক বা ছোট পরিসরে। আধুনিক বিশ্বে তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত সহজলভ্য হয়েছে। মুহূর্তেই হাজার মাইল দূরের মানুষটি হতে পারে আমাদের গল্প বা আড্ডার সঙ্গী। তথ্যপ্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহ একদিকে মানুষের জীবনকে করেছে সহজ ও উপভোগ্য, অন্যদিকে এক শ্রেণির অসাধু মানুষ তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে সমাজে ছড়াচ্ছে মিথ্যা ও গুজব, যা মানুষের মধ্যে তৈরি করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, পারস্পরিক বিভেদ এবং বিনষ্ট করে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা। এমনকি মানুষকে ধাবিত করে হত্যা ও গণহত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধে। ইসলামের দৃষ্টিতে তথ্য একটি পবিত্র আমানত। প্রতিটি আমানতের ব্যাপারে মহান আল্লাহর কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। যারা সমাজে গুজব রটিয়ে বা মিথ্যা তথ্য প্রচার করে পারস্পরিক সম্প্রীতি বিনষ্টে প্রয়াসী হয়, তারা খেয়ানতকারী ও ফাসেক। দেশে দিন দিন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও বেড়ে চলেছে। এখন স্মার্টফোন দিয়ে মুহূর্তেই স্পর্শকাতর একটি বিষয়কে ভাইরাল করা সম্ভব। এই প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায় নেতিবাচক ও অপরাধমূলক কাজে। যদিও প্রযুক্তির এই উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজ-সাবলীল করেছে এবং গোটা মানবজাতিকে করেছে গতিশীল। কিন্তু একই সঙ্গে তথ্যের অবাধ প্রবাহ মানুষকে বিভ্রান্তও করছে। এই ভয়াবহতা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন ধর্মীয় মূল্যবোধ, কঠোর আইন, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে আমাদের দেশে সবচেয়ে আলোচিত ও অভিশপ্ত গুজব ছিল ‘পদ্মা সেতুতে শিশুদের মাথা লাগবে’। তখন এই ভয়াল গুজবের ছোবলে বাংলাদেশে ছেলে ধরা আতঙ্কে অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এটি একটি জাতীয় গুজব ছিল। যদিও এই গুজবের চর্চা হাজার বছর ধরে দেশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই হয়ে আসছে। পরিবারের শিশুরা যখন একটু বড় হতে থাকে এবং বাড়ির বাইরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে তখন অনেক অভিভাবক তাদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ভয় দেখিয়ে বলেন, ‘অমুক ব্রিজ বানানো হচ্ছে। সেখানে মানুষের মাথা লাগবে। বাড়ির বাইরে গেলে ছেলে ধরার কবলে পড়তে হবে’। ব্যস! ওই শিশুর মানসপটে গুজবের বীজ বপন হয়ে যায়। এভাবে শিশুকে মিথ্যা ভয় দেখানোর বিষয়টি এক সময় প্রতিষ্ঠিত গুজবে পরিণত হয়ে যায়। মিথ্যা সব সময়ই মিথ্যা। শিশুদের মনে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়া অন্যায়। কেননা তারা ছোটকালে যা শিখে, জানে ও বোঝে সেটার প্রভাব বড় হওয়ার পরও থাকে। একটি ধ্রুব সত্য হলো, আমাদের দেশে মানুষ শিশুকালে প্রথম গুজবের শিকার হয় পরিবার থেকে। এরপর আর তাদের গুজব পিছু ছাড়ে না। একটু বড় হওয়ার পর মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ বা অফিসে সহপাঠী ও সহকর্মীদের সঙ্গে কখনো কখনো ‘গল্পগুজবে’ মত্ত হয়। অতঃপর দৈনন্দিন গল্পের সঙ্গে গুজব চলতে থাকে। বিষয়টি তাদের কাছে খুব উপভোগ্য হয়ে ওঠে। এমনকি দীর্ঘদিন ‘গল্পগুজব’ করতে না পারলে দিন তারিখ ঠিক করে ‘গল্পগুজব’ করতে বসে। এসব ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। কথা বলার ক্ষেত্রে মিথ্যা পরিহার করতে হবে। মিথ্যা হলো সব পাপের মূল। আর মিথ্যা মানুষকে জাহান্নামের পথে টেনে নিয়ে যায়। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে কোনো কথা শোনামাত্রই (সেটার সত্যতা যাচাই না করেই) মানুষের কাছে বলে বেড়ায়।’ (সুনানে আবু দাউদ ৪৯৯২)

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত