আসাদের ভবিষ্যৎ আরও নড়বড়ে

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৪৭ এএম

উত্তর-দক্ষিণ থেকে শহর দখল করতে করতে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের দিকে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন বাশার আল আসাদ সরকার বিরোধীরা। আলেপ্পো দখলের পর দক্ষিণে দারা ও উত্তরে হামাও নিজেদের কবজায় নিয়েছে বিরোধীরা। দখল নিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ শহর হোমস। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের দাবি, দক্ষিণে আলেপ্পো, হামার পর হোমস ঘিরে রাখা সশস্ত্র সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) ও উত্তর থেকে আক্রমণ শুরু করা বিদ্রোহীরা একই গোষ্ঠী নয়। তবে তাদের সবাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সহায়তা পাচ্ছে আর তাদের সবারই একটি লক্ষ্য। তারা এ দফায় বাশার আল আসাদের পতন নিশ্চিত করতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর এই দুর্দশার মধ্যে দেশের পূর্বাঞ্চলে হামলা শুরু করেছে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট কুর্দি বিদ্রোহীরাও। পূর্বাঞ্চলের শহর দেইর আল-জোর দখলের চেষ্টা করছে তারা। অবশ্য পূর্বাঞ্চলের একটি বড় অংশ আগে থেকেই কুর্দি স্বাধীনতাকামীদের দখলে। এই অবস্থায় আসাদের বাহিনী যেমন পিছু হঁটছে তেমনি তার মিত্ররাও ওই সব শহর থেকে নিজেদের প্রত্যাহার শুরু করেছে। আসাদের সম্ভাব্য পতন আশঙ্কা করে সামরিক কর্মকর্তাদের সরানোর ঘোষণা দিয়েছে ইরান।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আলেপ্পোয় বিদ্রোহীদের নতুন হামলা ঘিরে হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠা সিরিয়ার রণাঙ্গনে অপ্রত্যাশিতভাবে দ্রুত বদলাচ্ছে পরিস্থিতি।

প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়েছিল বিদ্রোহীদের সবশেষ দখল করা দারা শহর থেকেই। গত শুক্রবার রাতে বিদ্রোহীরা দাবি করেছিল, আলেপ্পো ও হামা দখলের পর তারা হোমস নগরীর দিকে এগিয়েছে। তার পরপরই গতকাল শনিবার হোমস এবং পাশের দারা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দেয় বিদ্রোহীরা। রয়টার্স লিখেছে, দারা থেকে সুশৃঙ্খলভাবে সেনা প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছে আসাদ বাহিনী। নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, সিরিয়ার পশ্চিমে আসাদ পরিবারের সমর্থকদের শক্ত ঘাঁটি এবং দক্ষিণে রাজধানী দামেস্কে যাওয়ার পথে পড়ে হোমস। তাই এই নগরী দখলে নিলে তা বিদ্রোহীদের জন্য বড় ধরনের জয় হবে। আর তা আসাদের পতনও ডেকে আনতে পারে।

হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) নেতা আবু মোহাম্মদ আল-গোলানি সিএনএন-কে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাদের লক্ষ্য এখন আসাদের শাসন উৎখাত করা। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের এখন বিদ্রোহীদের তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের এই নতুন চেষ্টা রুখে দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না সবার দৃষ্টি এখন সেদিকে। বিবিসি জানায়, সিরিয়ার সেনাবাহিনী বর্তমানে তেমন ভালো অবস্থায় নেই। সেনারা দীর্ঘদিন ধরেই কম বেতন এবং দুর্বল সরঞ্জামের অভাবে হতাশ। প্রেসিডেন্ট আসাদ সেনাবাহিনীতে বেতন ৫০ শতাংশ বাড়ানোর নির্দেশ দিলেও তাতে পরিস্থিতি পাল্টানোর সম্ভাবনা কম।

আসাদের প্রধান দুই মিত্র রাশিয়া ও ইরান তার শাসন টিকিয়ে রাখতে এখনো ভূমিকা পালন করছে। রাশিয়া সিরিয়ার উপকূলীয় শহরে তাদের নৌ ঘাঁটি রক্ষার স্বার্থে আসাদকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তবে ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে রাশিয়াও সামরিক শক্তিতে দুর্বল হয়েছে। সে কারণে যথেষ্ট শক্তি দিয়ে তারা সিরিয়ায় লড়তে পারছে না। অন্যদিকে, ইরান অতীতে অনেকটা আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে আসাদকে সামরিক সহায়তা দিলেও বর্তমানে তারা সরাসরি সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কারণ, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরান এবং তাদের সমর্থনপুষ্ট লেবাননের হিজবুল্লাহর অবস্থানও আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। অবশ্য হিজবুল্লাহ তারপরও আসাদের পাশে দাঁড়াতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে। তবে রয়টার্স লিখেছে, বিদ্রোহীদের এই অগ্রযাত্রায় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং তার একনিষ্ঠ সমর্থক রাশিয়া ও ইরানের জন্য ঝুঁকি বেড়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, বাশার সরকারকে সহযোগিতা করতে আসা সামরিক কর্মকর্তাদের সরিয়ে নিতে শুরু করেছে ইরান। কুদস ফোর্সের শীর্ষ কর্মকর্তারা সিরিয়া থেকে প্রতিবেশী ইরাক ও লেবাননে চলে যাচ্ছেন। অবশ্য হিজবুল্লাহ লেবানন থেকে এরই মধ্যে কিছু যোদ্ধা পাঠিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তবে এতে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, অতীতে আসাদ এই মিত্রদের কাছ থেকে যতটা সহায়তা পেয়েছেন, সেই পূর্ণ মাত্রার সামরিক সহায়তা এখন তিনি তা পাচ্ছেন না।

আসাদের রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা যে কেবল তার সশস্ত্র বাহিনী আর এই মিত্রদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে তাই না, বরং তার বিরোধিতা করা নানা গ্রুপের মধ্যকার বিদ্যমান বিভক্তির ওপরও নির্ভর করছে। অবশ্য তাদের ঐক্য হলে বিষয়টি ভিন্ন হবে। শিগগিরই পতন হতে পারে বাশার আল আসাদের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত