ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে ইঙ্গিত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, ‘চোর প্রধানমন্ত্রী, যার পুরো পরিবার ছিল চোর। এই চোরের মুখের সামনে কেউ কোনো কথা বলতে পারত না। দুদক তার দাসে পরিণত হয়েছিল, বিচার বিভাগ তার দাসে পরিণত হয়েছিল।’
গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘দুর্নীতি এক্সেপ্টেড নর্মে (সাধারণ বিষয়ে) পরিণত হওয়ার কারণ ছিল, দুর্নীতির কোনো বিচার তো হতোই না, বরং দুর্নীতি যে একটা খারাপ জিনিস, এটা ভাবার সংস্কৃতিটাই চলে গিয়েছিল। আমরা গত ১৫ বছর দেখেছি, আমরা দেখেছি ১০০ টাকার বালিশ ৪-৫ হাজার টাকা বিক্রি হয়েছে। আমরা দেখলাম ছয়টা ব্যাংক লুটপাট হয়েছে। দেশের একজন সাধারণ ব্যবসায়ী সিঙ্গাপুরে সবচেয়ে বড়লোকের একজন হয়ে গেছেন। আমরা দেখতাম একটা বেহায়া প্রধানমন্ত্রী তার পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এটা হাসতে হাসতে জাতির সামনে বলছেন।’
আসিফ নজরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কোনো নেতার সঙ্গে দেখা হলে বলতেন, আপা তো আসলে কিছু করতে পারেন না ওনার ছোট বোনের জন্য। বোনের প্রতি কী মায়া! বোন চোর দেখে তিনি কিছু করতে পারেন না। বোন করে, আসলে তিনি করেন না। আমরা বিভিন্ন জায়গার আড্ডায় শুনতাম, শেখ হাসিনার ক্যাশিয়ার কে? রেহানার কে? সালমান কার ক্যাশিয়ার? জয়ের টাকা কার মাধ্যমে যায়? পলক কার টাকা রাখে? দুদক তো ছিল, উচ্চ আদালত ছিল, কোনো বিচার হয়েছে? কিচ্ছু হয় নাই বিচার।’
‘বিচার কার হতো, খালেদা জিয়ার বিচার। খালেদা জিয়া ৩ কোটি টাকা এক জায়গায় রেখেছেন, সেটায় প্রক্রিয়াগত ভুল ছিল। সেখান থেকে একটি টাকাও আত্মসাৎ করেনি। সেই ৩ কোটি টাকা ব্যাংকে থেকে ৬ কোটি টাকা হয়েছে। ওই টাকা কেউ স্পর্শ করে নাই। সেজন্য তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে ১০ বছরের জেল দিয়েছে এই দেশের দুদক-বিচার বিভাগ মিলে। আর সেই চোর প্রধানমন্ত্রী, যার পুরো পরিবার ছিল চোর, সে সারা দেশে বলে বেড়াত এতিমের টাকা নাকি খালেদা জিয়া আত্মসাৎ করেছেন। এই চোরের মুখের সামনে কেউ কোনো কথা বলতে পারত না। দুদক তার দাসে পরিণত হয়েছিল, বিচার বিভাগ তার দাসে পরিণত হয়েছিল।’
তিনি দুদকের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘দুদকের যারা কমিশনার ছিলেন, পদত্যাগ করার আগে তারা গত সরকারের আমলে চুরি করে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া শতাধিক এমপি, মন্ত্রী ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্তের অনুমোদন দিয়ে গেছেন। এখন তদন্ত করুন। প্রমাণ করুন ভালো পরিবেশ পেলে আপনারা কাজ করতে পারেন। এটাই আপনাদের প্রতি আমাদের ও সারা দেশের আকাক্সক্ষা।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘পৃথিবীর কোনো ধর্মই দুর্নীতি ও মানুষের হক মেরে খাওয়া অনুমোদন করে না। একটা ধার্মিক মানুষ অসৎ হয় কীভাবে, কীভাবে অন্যের হক মেরে খায়, আমানতের খেয়ানত করে, নিজের দায়িত্বে অবহেলা করে? আমরা সবাই যদি এমন করে ভাবতে শিখি, আমার মনে হয় কোনো আইন-টাইন দরকার নেই।’
আসিফ নজরুল একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘প্রায় সাত মাস আগে একটা ফ্ল্যাটের নামজারি করতে গিয়েছিলাম। আমার কাছে ১০ লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছে। আমার বাবার কেনা যে ফ্ল্যাটের আমরা ২০ বছর ধরে ভাড়া পাই, সেটা অন্য কারও নামে নামজারি হয়ে গিয়েছিল। এজন্য ১০ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছিল। ভূমি অফিসের লোকজনকে এই ঘুষ নেওয়ার নির্দেশ কি শেখ হাসিনা দিয়ে গিয়েছিলেন?’
আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমার দুঃখ লাগে, আমার সঙ্গে যারা বড় হয়েছেন, ছাত্রজীবন-বিশ^বিদ্যালয়জীবন, সাংবাদিকতাজীবন ও শিল্প-সাহিত্যের জগতে যাদের দেখেছি, তারা যে বড়লোক হয়েছেন, সেটার কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা, দুঃখবোধ বা লজ্জা ছিল না। দুর্নীতি এই সমাজে এক্সেপ্টেড নর্মে পরিণত হয়েছিল। কেউ প্রশ্ন করত না, এত টাকা কোথা থেকে এলো? উল্টো গর্ব করত, খুশি হতো; আরে, তার এত টাকা! অবৈধ বিত্ত নিয়ে অহংকার চলত। এদের কেউ কেউ মসজিদ কমিটিগুলোয় ঢুকে পড়েছিল।’
অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ও দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুদক সংস্কার কমিশনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমরা যে ধরনের তথ্য পাচ্ছি, সেটি অত্যন্ত বিব্রতকর। এত দিন যা শুনে এসেছি, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি। অনিয়ম, অনাচার, বৈষম্য, দুর্নীতি ও লুণ্ঠনতন্ত্র। বুকে হাত দিয়ে বলছি, আমি বিব্রত হচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আদর্শ দুদক হলেও এ প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারবে না, যত দিন পর্যন্ত আমাদের আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন না হবে। এখন দুদক নেই। তিনজন কমিশনার পদত্যাগ করেছেন। দুদক এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে কমিশনারদের ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত হয় না। এক মাসের বেশি হয়েছে কমিশনে কোনো সিদ্ধান্ত হয় না।’
অতীতে দুদকের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির সহযোগী ভূমিকা পালনের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, ‘এ প্রতিষ্ঠানের সংস্কার কেন হবে? দুদকের জন্য এর চেয়ে বড় অবমাননা কি আর হতে পারে? এর কারণ, একদিকে দুদক দুর্নীতির সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে, অন্যদিকে তারা নিজেরাও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল।’
দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন।
