কোন পথে দামেস্কের ভবিষ্যৎ

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:১৪ এএম

আকস্মিক আক্রমণের মাধ্যমে আসাদবিরোধীদের রাজধানী দামেস্ক দখল এবং প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের দেশত্যাগের পর ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটেছে সিরিয়ায়। দীর্ঘদিনের এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। একদিকে রাজনৈতিক পুনর্গঠন, অন্যদিকে আঞ্চলিক নানা জটিলতা সামলাতে হবে সিরিয়াকে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের উপস্থিতি রয়েছে। অতীতে বিদ্রোহী জোটের প্রধান গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল শামের সঙ্গে আল কায়েদার সংযোগ থাকায় বিদ্রোহীগোষ্ঠীর দর্শন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যদিও ২০১৬ সালে আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের পর নিজেদের উগ্র মতাদর্শ বাদ দিয়ে সাম্প্রদায়িক ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে গোষ্ঠীটি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গোষ্ঠীটির এই রূপান্তরকে বরাবরই সন্দেহের চোখে দেখেছেন। ফলে স্বভাবতই দামেস্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে: এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিকল্পনার পরবর্তী লক্ষ্য কে হবে? অঞ্চলের ভবিষ্যৎ এবং বাইরের শক্তিগুলোর ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে, যা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, মধ্যপ্রাচ্য আর আগের মতো থাকবে না।

সিরিয়া ছিল প্রতিরোধ অক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের আঞ্চলিক নীতি অনুসরণকারী সিরিয়া এখন এক বিপদগ্রস্ত দেশ। দেশটি অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক চাপের সামনে হাল ছেড়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাগুলো একটি বড় পরিকল্পনার অংশ। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ পরিবর্তন করা। মস্কোর এইচএসই ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মুরাদ সাদিকজাদের মতে, আগে যে বিষয়গুলো লুকানো ছিল, এখন তা স্পষ্ট হচ্ছে। এটি এমন একটি পরিকল্পনা দেখাচ্ছে যার লক্ষ্য সেই সব দেশকে নতুনভাবে গঠন করা, যেগুলো অনেক দিন ধরে পশ্চিমা দেশের প্রভাব ও বিস্তার প্রতিরোধ করে আসছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধ পরবর্তী সিরিয়ার পুনর্গঠনের বিষয়টির ওপর সিরিয়ার ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করছে। বাশারের অচিন্তনীয় পতনের পর সিরিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু দেশটির জনগণের ওপর নয়, মধ্যপ্রাচ্য তথা গোটা বিশ্বের রাজনীতির ওপরই প্রভাব ফেলেছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষার কেন্দ্রে ছিল আসাদের সিরিয়া। দামেস্কের পতন তাই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিয়েছে। শিয়া প্রধান রাষ্ট্র ইরানের স্বার্থ রক্ষায় পাশাপাশি অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের বাফার রাষ্ট্র ছিল এটি। ফলে আসাদ শাসনের পতন ইরানের দুর্বলতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ইরানের সমর্থন আর রাশিয়ার অস্ত্রে বিদ্রোহীদের দমন করে গত এক দশক ক্ষমতায় টিকে ছিলেন বাশার। ইরান বহু বছর ধরে সিরিয়ার সঙ্গে তার জোটের মাধ্যমে নিজের প্রভাব তৈরি করেছিল। তেহরান সিরিয়াকে প্রতিরোধের অক্ষ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখত। এতে লেবানন, ইয়েমেন, ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী ও ইরাকের মিলিশিয়া গোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত ছিল। সিরিয়া ছিল হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সরবরাহ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তবে দামেস্কের পতন এবং তার পরবর্তী বিশৃঙ্খলা এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে, ইসরায়েল গোলান উচ্চভূমিতে সেনা মোতায়েন করে তার দখলকৃত এলাকা বাড়িয়ে নিয়েছে। এই পদক্ষেপটি ইসরায়েলের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং ইরানকে সিরিয়ায় প্রভাব বিস্তার থেকে দূরে রাখছে।

হিজবুল্লাহর ক্ষতি ইরানের জন্য আরেকটি বড় আঘাত। হিজবুল্লাহ অনেক বছর ধরে ইরানের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ ও অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে হিজবুল্লাহর অবস্থা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ। গোষ্ঠীটির সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। ইরানের জন্য তাই এটি শুধু প্রভাব হারানোর বিষয় নয়, বরং তার বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের একটি বড় ভিত্তি দুর্বল হওয়ারও বিষয়। এই পরিস্থিতিতে তেহরানকে তার পররাষ্ট্র নীতি নতুন করে সাজানোর বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি শুধু ইরানের পররাষ্ট্র নীতির জন্য বিপর্যয় নয়, বরং একটি অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি ইরানের সমাজে পশ্চিমের সঙ্গে সংলাপের পক্ষে থাকা সংস্কারপন্থিদের সঙ্গে কঠোর অবস্থান ধরে রাখা রক্ষণশীলদের বিভাজন আরও তীব্র করতে পারে। সিরিয়ার সরকার পতন ইরানের পদ্ধতিগত সংকটের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে আকার দিচ্ছে।

সিরিয়ার ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা অভ্যন্তরীণ সংকট, বিদেশি চাপ ও ঐতিহাসিক ভুলের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সিরিয়ার সংকট শুরু হয়েছিল সরকার ও কয়েকটি বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে। তবে সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে তা একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষে পরিণত হয়। এতে স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের জটিল মিশ্রণ যুক্ত হয়েছে। বছরব্যাপী কঠোর যুদ্ধ এবং সমঝোতা না হওয়ায় অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো ধ্বংস এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বে ভাঙন ও দুর্নীতির সৃষ্টি হয়। জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতাকে ত্বরান্বিত করে।

শুধু অভ্যন্তরীণ কারণে সিরিয়া আজকের পরিণতির জন্য দায়ী নয়। সিরিয়া আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। পশ্চিমা ও আরব দেশগুলো বিরোধীদের সমর্থন করেছিল। বিদেশি শক্তিগুলো সিরিয়ার মাটিতে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছিল। প্রতিটি পক্ষই নিজেদের লক্ষ্য পূরণের চেষ্টা করেছিল। এতে সংঘর্ষ আরও গভীর হয়ে ওঠে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো, যেমন তুরস্ক, সৌদি আরব ও ইসরায়েল, সিরিয়ার দুর্বলতা দেখেছিল তাদের নিজস্ব প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে। তবে বছর খানেক ধরে, রাশিয়া ও ইরান থেকে সিরিয়া যে দৃঢ় সমর্থন পেয়েছিল, এর কারণে এই পরিকল্পনাগুলো সফল হয়নি। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হস্তক্ষেপ আরও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়ার শাসক গোষ্ঠীর একটি বড় ভুল ছিল তারা রাজনৈতিক আলোচনার প্রতি নজর না দিয়ে শুধু সামরিক সমাধানের ওপর ভরসা করেছিল। এটা আসাদকে অসহায় করে তোলে দৃঢ় ও সুশৃঙ্খল বিরোধীদের কাছে।

সিরিয়ার সংকট শুধু একটি স্থানীয় সংঘর্ষ নয়, এটি আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক সংঘর্ষের আরেকটি উপাদান। এটি স্পষ্ট যে, পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মধ্যপ্রাচ্যের সহযোগীরা বিদ্রোহী, বিরোধীদল এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করছে। বিদ্রোহীদের এই আক্রমণ রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যে স্বার্থকেও লক্ষ্য করেছিল। পশ্চিমা দেশগুলো গত দশকে মধ্যপ্রাচ্যে মস্কোর বৃদ্ধি পাওয়া প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তুষ্ট ছিল। আসাদ সরকারের বড় মিত্র হিসেবে কাজ করে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সফল সম্পর্ক স্থাপন করে, রাশিয়া এই অঞ্চলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সামরিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার সাফল্য এবং সংঘাত সমাধানে ভূমিকা পশ্চিমকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছিল। এটি মস্কোর জন্য একটি আঘাত হতে পারে, তবে এটি বলা সঠিক হবে না যে এটি রাশিয়ার বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য কৌশল বা তার আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ককে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করে।

তুরস্কও এই পরিস্থিতিতে একটি সম্ভাব্য লাভবান পক্ষ হিসেবে সামনে এসেছে। আসাদ সরকারের পতনকে তারা বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে উদযাপন করছে। তবে এটি সম্ভব নয় যে এই ঘটনাগুলো সরাসরি তুরস্কের পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটেছে। বরং তুরস্ক চলমান পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নিজেকে বিরোধী গোষ্ঠীর সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছে। এই ঘটনা রাশিয়া ও তুরস্কের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।

ফলে এই গৃহযুদ্ধের অবসানের মাধ্যমে সিরিয়ার অশান্তির শেষ হলো, এখনই তেমনটা বলা যাচ্ছে না। কারণ লিবিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায় যে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন খুব কমই স্থিতিশীলতা নিয়ে আসে। মুয়াম্মার গাদ্দাফি পতনের পর লিবিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং রক্তাক্ত যুদ্ধ, গোষ্ঠী সংঘাত এবং কোটি কোটি মানুষের আশাভঙ্গ নিয়ে তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সিরিয়াতেও এমন পরিণতি আসতে পারে। সেখানে বিরোধী গোষ্ঠী এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের অর্জিত সংবেদনশীল সাফল্য দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত