বাংলাদেশে ২০১৯ সালেই প্রথম ডেঙ্গুর ধরন ও উপসর্গে পরিবর্তন আসে। ওই বছরই প্রথম এক সঙ্গে দুই ধরনের ডেঙ্গু, অর্থাৎ ডেন-২ ও ডেন-৩-এ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে ও প্রচলিত উপসর্গের বাইরে নতুন উপসর্গ দেখা দেয়। গবেষকরা ধারণা করছেন, এসব পরিবর্তনের কারণেই গত বছর ও এ বছর তীব্র মাত্রার ডেঙ্গু জ্বরে অনেক বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। মৃত্যুও বেশি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসা ও বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘প্লস ওয়ান’-এ প্রকাশিত বাংলাদেশি চিকিৎসা গবেষকদের এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৫ নভেম্বর এই গবেষণা প্রকাশ হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরীর নেতৃত্বে গবেষণায় ১৩ সদস্যের গবেষক দল অংশ নেয়। গবেষকরা বিএসএমএমইউ, ঢামেক হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ও শিক্ষক। ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত ঢাকার তিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১ হাজার ৯৭৮ জন রোগীর ওপর এই গবেষণা করা হয়।
এই গবেষণার ব্যাপারে ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৯ সালেই দেখা যাচ্ছে যে একই সঙ্গে দুই ধরনের সেরোটাইপ বা ধরন বিরাজমান ছিল। ৩০ শতাংশ রোগী একসঙ্গে দুই ধরনের সেরোটাইপ দিয়েই আক্রান্ত হয়েছে। যেহেতু ২০১৯ সাল থেকেই ডেন-২ ও ডেন-৩ ব্যাপক হারে ছিল, সম্ভবত ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এটার সঙ্গে ডেন-১ যুক্ত হওয়ার কারণে সিভিয়ার বা তীব্র মাত্রার ডেঙ্গু হওয়ার প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে।
এই গবেষক আরও বলেন, ডেঙ্গু হলে জ্বর, গায়ে ব্যথা, মাথাব্যথাÑ এগুলো সচরাচর উপসর্গ। কিন্তু ২০১৯ সাল থেকেই দেখা যাচ্ছে যে, ডেঙ্গুতে অন্ত্রজনিত উপসর্গ পেটের ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ ২০১৯ সাল থেকেই ডেঙ্গু রোগীদের ক্লিনিক্যাল উপসর্গে পরিবর্তন এসেছে। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে ও বর্তমানে অন্ত্রে সংক্রমণ যাদের বেশি হয়েছে, তারাই তীব্র মাত্রার ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। আমাদের স্টাডিতে দেখা গেছে, যারা মারা গেছে, তাদের প্রায় সবারই অন্ত্রে সংক্রমণ ছিল।
এই গবেষক সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এখন যাদের ডেঙ্গু হবে, তাদের যদি পেটে ব্যথা, বমি, পাতলা পায়খানা হয়, তা হলে অবশ্যই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে ও রোগীকে কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তাদের ব্যাপারে বেশি সতর্ক থাকতে হবে ও যতœ নিতে হবে। এটাও একটা বার্তা। তিনি আরও বলেন, এবার ও গত বছরের ডেঙ্গুর যে প্রাদুর্ভাব, সেটা ২০১৯ সালেই বোঝা যাচ্ছিল। ডেঙ্গুর উপসর্গ ও ধরনের পরিবর্তন এসেছে। যেটার কারণে গত বছর ও এ বছর তীব্র মাত্রার ডেঙ্গু অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে ও মৃত্যুও বেশি হচ্ছে। তিনি জানান, ২০১৯ সালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কম পেয়েছেন। এখনো অ্যান্টিবায়োটিক কম ব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে বিএসএমএমইউতে বিশেষ ইন্ডিকেশন না থাকলে অ্যান্টিবায়োটিক একদমই ব্যবহার করা হয় না।
কী পাওয়া গেল গবেষণায় : গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সে বছর ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে কোমর্বিডিটি বা সহ-অসুস্থতার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ছিল উচ্চ রক্তচাপে ও ৪ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিল।
গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত শনাক্তকারী উপসর্গের তুলনায় অন্ত্রজনিত উপসর্গগুলো বেশি দেখা গেছে। উপসর্গগুলোর মধ্যে বমি, ডায়রিয়া ও পেটব্যথা উল্লেখযোগ্য। মৃতদের মধ্যে অন্ত্রজনিত উপসর্গ বেশি ছিল। গবেষণায় ডেঙ্গুর ধরনের পরিবর্তনও উঠে এসেছে। সেবারই প্রথম একসঙ্গে দুই ধরনের ডেঙ্গুর সংক্রমণ ধরা পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৯ শতাংশ রোগী ডেন-৩, ১৪ শতাংশ রোগী ডেন-২ ও ডেন-৩ এবং ৭ শতাংশ রোগী ডেন-২ ধরন দ্বারা আক্রান্ত ছিল। গবেষণায় ডেন-৩-কে জিনোটাইপ-১ ও ডেন-২-কে কসমোপলিটান ভ্যারাইটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই দুই ধরন ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। ২০০০ সালের পর বাংলাদেশে এই গবেষণাটি প্রথমবারের মতো একাধিক সেরোটাইপের সহ-সংক্রমণ শনাক্ত করেছে।
গবেষণার তাৎপর্য অংশে বলা হয়, ২০১৯ সাল থেকে ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে প্রচলিত শনাক্তকারী উপসর্গের তুলনায় অন্ত্রজনিত উপসর্গগুলো বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে ডায়রিয়া, বমি ও পেটব্যথা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডেন-১ ও ডেন-৩ সেরোটাইপের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই স্ট্রেইনগুলোর সংক্রমণ মারাত্মক উপসর্গ এবং মৃত্যুহারের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে যুক্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে ২০২৩-২৪ সালে ডেঙ্গু রোগীদের মৃত্যুহার বেড়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
গবেষণায় সুপারিশ : গবেষণার সুপারিশে বলা হয়, প্রতি বছরে ডেঙ্গুর সেরোসার্ভে পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি। এতে ডেঙ্গুর বর্তমান সেরোটাইপ ও সংক্রমণের ধরন বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক কৌশল এবং ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা সম্ভব হবে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি গ্রহণ ভবিষ্যতের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এই গবেষণা ডেঙ্গুর সেরোটাইপ প্রোফাইল, ক্লিনিক্যাল ব্যবস্থাপনা এবং জটিলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছে। এর ফলাফল ভবিষ্যতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কৌশল ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
