মঞ্চে-নেপথ্যে

অনামী

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৪৫ এএম

১৯৪৭ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি ‘দৈনিক আজাদ’-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং পরে বার্তা সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে ‘আজাদ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর সেই বছরই ‘ইত্তেফাক’-এর বার্তা সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে হন নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৬৯-৭০ সালে ‘অনামী’ ছদ্মনামে লেখা অনবদ্য উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ কলামে উঠে এসেছে তৎকালীন রাজনীতির তীক্ষè পর্যবেক্ষণ এবং বিচার-বিশ্লেষণ। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে শান্তিনগর, চামেলীবাগের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর-রাজাকাররা। এরপর এই সাংবাদিকের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের  জনপ্রিয় উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’

এক চেহারায় আসর জমাইয়া ‘টু পাইস’ কামানো সম্ভব নয়, তাই তো ওরা বহুরূপী। রাজনীতির ক্ষেত্রেও ধরা-পড়া চেহারায় যখন আর কার্যসিদ্ধি সম্ভব নয়, তখন মতলবি মানুষের ভোল ও বোল না পাল্টাইয়াই-বা উপায় কী! কখনো গণতন্ত্র, কখনো সমাজতন্ত্র, কখনো ইসলামি, কখনো লাল মার্কা সবকিছুরই সমান প্রবক্তা সাজিতেই-বা তাদের বাধা কোথায়? কিন্তু দুর্ভাগ্য এদেশের, দুর্ভাগ্য জাতির যে, যাহাদের চেহারার দিকে তাকাইলে, যাহাদের মুখামৃত শুনিলে সহজেই মানুষ আকৃষ্ট হয়, তাহাদের মুখের কথা আর অন্তরের কথায় আকাশ-পাতাল ব্যবধান! সর্বাঙ্গে তাহাদের মাকড়সার জাল। এ জালের চক্করে চক্করে কেবল প্রতারণার ফাঁদ।

অশীতিপর বৃদ্ধ মওলানা ভাসানীর রাজনীতি এদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিচিত্র অধ্যায়। ভোল ও বোল পাল্টানোর এমন ‘মহৎ’ চরিত্রের অধিকারী হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। অহরহ বোল পাল্টাইলেও মওলানার অতীত ও বর্তমানের ভূমিকা কিন্তু একই। ‘যখন যেমন তখন তেমন’ নীতিতেই তিনি রাজনৈতিক ডুগডুগি বাজান। তাহার সর্বশেষ ডুগডুগি বাজিয়াছে শাহপুরের ‘কৃষক সমাবেশে’, যে সমাবেশের শতকরা ৬০ ভাগই ছিল নাকি ‘শহুরে কৃষক’। গ্রামবাংলার সমস্যা জর্জরিত কৃষক সম্প্রদায়ের অন্নকষ্টের কথা কাহারও অজানা নহে। তাই মতলবি রাজনীতির সূক্ষ্ম চাল হিসাবে শাহপুরের ‘কৃষক সমাবেশে’ তিনি স্লোগান তুলিয়াছেন ‘ভোটের আগে ভাত চাই’। মওলানা জানেন, এ বড় মোক্ষম দাওয়াই। গ্রামবাংলার নিরক্ষর, অভাবী কৃষক সম্প্রদায়কে সহজে প্রতারিত করার এর চেয়ে বড় দাওয়াই আর কী হইতে পারে! ‘নায়েবে নবি’র চোখেমুখে ‘ভোটের আগে ভাত’ আনিবার ‘দুর্জয়’ শপথের অভিব্যক্তি দেখিয়া কৃষক ভাইয়েরা হয়তো আশ্বস্ত হইয়াই ফিরিয়া গিয়াছেন। কিন্তু কোনপথে কীভাবে কে তাহাদের এই ভাতের বন্দোবস্ত করিবে, মওলানার মুখ হইতে তাহা কিন্তু শুনিয়া যাইবার সৌভাগ্য তাহাদের হয় নাই।

এ কথা সবারই জানা যে, পরাধীন আমলে বাংলার বিশেষ করিয়া পূর্ব বাংলার মানুষ কদাচিৎ কখনো ভাতের কাঙাল হইয়াছে। মাছে ভাতে বাঙালি ইহাই ছিল বাঙালির সর্বকালের পরিচয়। স্বাধীনতা-উত্তর যুগে বাঙালির সে চেহারার পরিবর্তন হইয়াছে। ভাতের অভাব তাহাদের নিত্যকালের সহচরে পরিণত হইয়াছে, কিন্তু কেন? এই কেন’র জবাব মওলানা ভাসানী দেন নাই, দিবেনও না। কেননা, জারিজুরি তাহা হইলে ফাঁস হইয়া যাইবে যে! পাকিস্তানের বিগত ২২ বছরের ইতিহাস, স্বাধীন দেশের কোটি কোটি মানুষের স্বার্থের সমাধির ওপর কায়েমি স্বার্থী ও ষড়যন্ত্রীদের স্বার্থের প্রাসাদ গড়িবার ইতিহাস। ভাত হইতে বঞ্চিত করিয়া জনগণকে কায়েমি স্বার্থের কৃপাদাসে পরিণত করার জন্য ভোটের অধিকার ছিনাইয়া লওয়ার এক জঘন্য ইতিহাস। আর এই ইতিহাস রচনায় বরাবরই শরিক ছিলেন এদেশের একশ্রেণির ‘মজলুম জনদরদিরা’। কথা হইল, ‘ভোটের আগে ভাত’ কী করিয়া সম্ভব? জনগণকে ভাতে মারিয়া শোষণের দ্বার উন্মুক্ত রাখার কারসাজিতেই ভোটকেন্দ্র হইতে তাহাদিগকে যে বরাবর দূরে রাখা হইয়াছে, আর সেই কারণেই যে দেশের আজ এই অবস্থা, এ কথা মওলানা ভাসানী জানিয়াও বলিতে রাজি নন। বলিলে কায়েমি স্বার্থের সহিত তাহার গোপন যোগসূত্রটি যে বন্ধ হইয়া যায়! মজলুম মানুষের দরদে মওলানার চোখে অশ্রুর বন্যা। কিন্তু সে দরদকে গঠনমূলকভাবে কাজে লাগাইতে কেহ কখনো তাহাকে দেখে নাই। দেশব্যাপী খাদ্যসংকটের মুখে অন্য দলের স্কন্ধে সওয়ার হইয়া তার দলেরই কেন্দ্রীয় প্রধান সোহরাওয়ার্দী যখন ক্ষমতাসীন হন, সাতটি দিন না যাইতেই মওলানা তখন প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়াইয়া খাদ্য সমস্যার সমাধানে ব্যর্থতার নামে সেই সোহরাওয়ার্দীরই ‘প্রধানমন্ত্রিত্বের মুখে পদাঘাত’ করেন।

পশ্চিম পাকিস্তানে তিনি ইসলামে বিশ্বাসী আর ইসলামি সমাজতন্ত্রের প্রবক্তা, আবার পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সহচরদের লইয়া তিনি এমন এক সমাজতন্ত্রের সাধনায় মত্ত, যে সমাজতন্ত্রের প্রথম বলি ধর্ম। প্রচ- গণ-অভ্যুত্থানের মুখে জনগণের লুপ্ত অধিকার ফিরাইয়া আনার প্রশ্নে আইয়ুবের আমলে যখন ‘গোলটেবিল’ বসে, মওলানা তখন তার ঘোর বিরুদ্ধে। ‘গোলটেবিলে বসে যারা, আইয়ুবের দালাল তারা’ স্লোগানের পাশাপাশি ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’ ব্যবস্থাপত্র দিয়া তিনি সেদিনই-বা কী বুঝাইতে চাহিয়াছিলেন? গণ-আন্দোলন লক্ষ্যচ্যুত হইয়া কত নিরীহ মানুষের ঘর পুড়িল, বিনা বিচারে কত ‘গরু চোর’ (?) নিহত হইল, কাহার দোষে, কাহার উসকানিতেএ কথার জবাব কে দেবে? দেশের সব নেতাকে তিনি ‘আইয়ুবের দালাল’ বানাইলেন, অথচ এই তিনিই-না সেদিন আইয়ুবের দালালির বিনিময়ে চীন ঘুরিয়া সমাজতন্ত্রী বনিয়াছিলেন, আর এই তিনিই না বিরোধীশিবিরে আইয়ুবের পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র সমঝদার ব্যক্তি ছিলেন? সেই তিনিই আবার দেশকে কত খেল দেখাইতেছেন?

নিজ দলের ৭-দফা ছাড়িয়া ছাত্রদের এগারো দফাকে তিনি তাহার জীবনব্রত করিলেন- যে এগারো দফার অন্যতম প্রধান শর্তই হইল প্রাপ্তবয়স্ক ভোটে অবিলম্বে দেশে সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। আজ আবার বেমালুম সে কথা হজম করিয়া তিনি ‘ভাত চাই, নির্বাচন চাই না’ স্লোগান দিতে পারিলেন কী করিয়া! দ্বিতীয়ত, ভোট আর ভাতের সংঘাতটা কোথায় ইহাও আমাদের বোধগম্য নহে। যারা নির্বাচন চাহিতেছেন, তারা ভাত চাহেন না, এ কথাই-বা মওলানা সাহেব পাইলেন কোথায়? আইয়ুব খান প্রত্যক্ষ ভোটের অধিকার হইতে বঞ্চিত করিয়া উন্নয়নের নামে প্রকৃত প্রস্তাবে দেশের মানুষের মুখের গ্রাসই কি কাড়িয়া লন নাই? ভোট হইলে ভাত মিলিবে না- ইহাই যদি মওলানা সাহেবের বক্তব্য হয়, তবে আইয়ুবের আমলে মানুষের যখন প্রত্যক্ষ ভোটের অধিকার ছিল না তখন দেশে খাদ্যাভাব হইল কেন? কেনই-বা আজ পূর্ব পাকিস্তানকে জীবনের ‘বৃহত্তম খাদ্য ঘাটতির’ সম্মুখীন হইতে হইল? অবস্থা কি ইহাই নয় যে, ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ভাতের নামে জনগণের অধিকার হরণ করিয়া সমগ্র জাতিকে প্রকৃত প্রস্তাবে দাসে পরিণত করিয়া ছাড়িয়াছিলেন। আজ যখন মানুষের অধিকার ফিরাইয়া পাওয়ার সুযোগ আসিয়াছে, তখন ‘ভোটের আগে ভাতের’ স্লোগান তুলিয়া মওলানা কি সমগ্র জাতিকে চিরদিনের জন্য কায়েমিস্বার্থী মহলের দাসানুদাসে পরিণত করিতে চান? অধিকার আদায়ের জন্যই মানুষ সংগ্রাম করে, দাস হইতে নয়। আজ যখন নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরাইয়া দেওয়ার প্রশ্ন উঠিয়াছে, তখন মওলানা সাহেবের তাতে আপত্তি কেন? তবে কি জনগণের হাতে ক্ষমতা আসুক, মওলানা তাহা চাহেন না?

স্বয়ং সামরিক সরকারই যখন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের সংকল্প প্রকাশ করিয়া দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার তাগিদ দিতেছেন, তখন আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পথে পা বাড়াইবার উসকানি দিয়া মওলানা সাহেব কাহার হস্ত শক্তিশালী করিতে চান? অধিকার ফিরাইয়া পাওয়ার জন্য সারা দেশ যখন আজ নির্বাচনের জন্য উন্মুখ, তখন নির্বাচন ত্বরান্বিত করার দাবিতে মওলানা আন্দোলনে নামিলে একটা না হয় অর্থ ছিল, কিন্তু ‘নির্বাচন চাই না’ তার এই কথা বলার আজ অর্থ কী? তবে কি জনগণের হাতে ক্ষমতা আসুক, হৃত অধিকার তারা ফিরিয়া পাক, ইহা তাঁহার কাম্য নহে? বস্তুত যে তন্ত্রে তাঁহারা বিশ্বাসী, সে তন্ত্রের অভিসারীরা জনগণের হাতে ক্ষমতা আসুক, ইহা কখনো চাহিতে পারেন না। অতএব, তাঁহাদের মার্কামারা সমাজতন্ত্রের পথ হইতে তাঁহারা সরিয়া আসিবেন কী করিয়া? পাকিস্তানের ‘দেশপ্রেমিকেরা’ যখন নক্সালবাড়ি আর জ্যোতি বসুর চর্চা করেন, অন্যের তখন দালাল না বনিয়া আর উপায় কী? জিজ্ঞাসা করি, শাহপুরের সেই সমাবেশে ‘নক্সালবাড়ি’ আর ‘জ্যোতি বসুর’ নামে যে সেøাগান দিলেন, তাতে এদেশের কজন গ্রামীণ কৃষক কণ্ঠ দিয়াছিলেন? মওলানা সাহেবদের খেলোয়াড়দের স্মরণ রাখা দরকার যে নক্সালবাড়ি, জ্যোতি বসু অথবা কোনো মার্কা মারা তন্ত্রমন্ত্র আমদানির জন্য এদেশের মানুষ পাকিস্তান আনেন নাই। কায়েমি স্বার্থ আর মওলানার দলের মঞ্জিল দুই হইলেও পথ কিন্তু এক। অর্থাৎ জনগণকে ক্ষমতায় আসিতে না দেওয়া। তারা উভয়েই জানেন, ভোট আসিলে দেশে জনগণের সরকার কায়েম হইবে। দেশবাসী তাহাদের অধিকার ফিরিয়া পাইবে, আর ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই গণজীবনের সমস্যা নিরসনের কলকাঠি হাতে পাইবেন। সে অবস্থায় গরিবের ভাত মারিয়া তাহাদের অসহায়তার সুযোগে নির্বিঘ্নে শোষণ চালাইয়া যাওয়ার মহাজনি পথ কায়েমিস্বার্থীদের জন্য রুদ্ধ হইয়া যাইবে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঘোষণা করিয়াছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের হাতে তিনি ক্ষমতা ফিরাইয়া দিতে চান। প্রেসিডেন্টের এই সংকল্পের সার্থক বাস্তবায়ন কেবল সম্ভব বিশৃঙ্খলার উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক শিবিরের হস্ত শক্তিশালী করিয়া। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরই যখন সরকারের ইচ্ছা এবং এজন্য শান্তি ও শৃঙ্খলাই যখন তাহাদের কাম্য, তখন অবিলম্বে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করিয়া প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় গণতান্ত্রিক শিবিরের হস্ত শক্তিশালী করা আজ আশু প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে। আমরা আশা করি, সরকার অবিলম্বে এই প্রস্তাবে সাড়া দিয়া বিশৃঙ্খলাকারীদের সকল চেষ্টা বানচাল করিতে যত্নবান হইবেন। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)

লেখক: সিরাজুদ্দীন হোসেন নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক

১০-১০-১৯৬৯

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত