কোনো কোনো জিনিস আছে যা অমূল্য, স্বাধীনতাও তাই। স্বাধীনতার দাম কষা কঠিন, মূল্য নিরূপণও তাই। একটা কথা আছে যে, স্বাধীনতার জন্য যে মূল্য পরিশোধ করতে হয় তা হলো অন্তহীন সতর্কতা। অসতর্ক হলে আর রক্ষা নেই, স্বাধীনতা বিপদগ্রস্ত হবে, চলে যাবে, হয়তো-বা শিকার হবে অপহরণের কিংবা ধ্বংসের। কিন্তু ওই কথাটার একটা সীমা আছে। ওর মধ্যে এমন ইঙ্গিত আছে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়ে গেছে, সেটি একটি সম্পত্তি হয়ে উঠেছে, এখন প্রশ্ন তাকে রক্ষা করা যায় কী করে। অর্জনের পরেই অবশ্য সংরক্ষণের প্রশ্ন আসে। তবে স্বাধীনতা অর্জনটা যে সহজ তা মোটেই নয়। স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য মূল্য দিতে হয়, আর সে মূল্য কখনোই সামান্য হয় না।
আসলে স্বাধীনতাকে সম্পত্তি হিসেবে দেখাটাই ভুল। স্বাধীনতা একটা জমি কিংবা দালান নয় যে, তাকে পাহারা দিয়ে রক্ষা করা যাবে। স্বাধীনতা আকাশের মতো, বলা যায় আলোর মতোও বাতাসের মতোও। হয়তো তার চেয়েও বেশি, স্বাধীনতা হচ্ছে বন্ধনহীনভাবে আলো-বাতাস-আকাশকে উপভোগ করার অধিকার। নদীর সঙ্গেও তার তুলনা চলে। নদী যতক্ষণ প্রবহমান থাকে, ততক্ষণই সে নদী; তাকে আটকে রাখলে সে আর নদী থাকে না, খাল কিংবা বিলে পরিণত হয়, হারিয়েও যেতে পারে শুকনো ভূমিতে পড়ে গিয়ে।
তবে সব স্বাধীনতা এক নয়। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা বলে একটা জিনিস আছে। যেটাকে ঠিকই পাহারা দিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু কে দেবে সেই পাহারা? দেবে কি রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী? সেটা তাদের দেওয়ার কথা, কিন্তু তারা দেয় না, অনেক সময় পারেও না দিতে। যেমন একাত্তর সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চেয়েছিল পাহারা দিতে, দেওয়ার অজুহাতে তারা গণহত্যা ঘটিয়েছে, কিন্তু পাহারা দিয়ে পারেনি তাদের রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে, সেটা ভেঙে পড়েছে। রক্ষা করতে যাওয়াটাই ভাঙার কারণ হয়েছে। তা ছাড়া মীরজাফর বলে যে এক ধরনের প্রাণী আছে, ইতিহাসে পড়া যায়, বাস্তবেও দেখা যায়, সেই বিশ্বাসঘাতকরাও সাধারণত সেনাবাহিনীতেই থাকে। আধুনিক ইরাকে একটি দুর্র্ধষ সেনাবাহিনী ছিল বলে জানা ছিল আমাদের। কিন্তু সেই সেনাবাহিনী ইরাককে রক্ষা করতে পারেনি; তাদের অস্ত্রবল সীমিত ছিল এটা ঠিকই, কিন্তু তাদের ভেতর যে মীরজাফরও লুকিয়ে ছিল না তা নয়, ছিল বলেই তা এখন জানা যাচ্ছে। ইরাকের ভরসা ইরাকের মানুষেরাই। জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার শত্রুদের তারাই বিতাড়িত করতে পারবে, যদি কেউ পারে। কেবল ইরাক কেন, সব দেশের বেলাতেই সেটা সত্য। স্বাধীনতা দেশের মানুষই প্রতিষ্ঠা করে, তারাই রক্ষা করে। বাংলাদেশের বেলাতেও তা-ই ঘটেছে। আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছি, এখন তাকে রক্ষা করার যে-দায়িত্ব সেটাও আমাদেরই জনসমষ্টির কোনো বিশেষ অংশের নয়।
আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে সকলেরই অংশগ্রহণ ছিল, নইলে তা অর্জিত হতো না। তবে সকলে যে এর জন্য সমান মূল্য দিয়েছে তা অবশ্য নয়। যেমন মেয়েদের দিক থেকে নির্যাতন সহ্য এবং অংশগ্রহণের ব্যাপারটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। এর প্রধান কারণ পুরুষতান্ত্রিকতা। সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতা একটা বীভৎস সত্য। এটি আগেও ছিল, এখনো আছে। সামন্তবাদ পুরুষতান্ত্রিক, পুঁজিবাদও তাই, যদিও পুঁজিবাদকে অনেকটা অগ্রসর ও আধুনিক বলে বিবেচনা করার অবকাশ রয়েছে কোনো কোনো দিক দিয়ে। পুরুষতান্ত্রিকতা স্বাধীনতার মিত্র নয়, শত্রু বটে। কেননা সে চায় সমাজের অর্ধাংশকে বন্দি করে রাখতে। পুরুষতান্ত্রিকতাকে অক্ষুন্ন রেখে নারীর ভূমিকার প্রকৃত মূল্যায়ন অসম্ভব যেমন পরিবারে, তেমনি সমাজে। করার চেষ্টা করলেও অনেক সময়ে ওই মূল্যায়ন ব্যর্থ হয়েছে, কখনোবা উল্টো ফল বহন করে নিয়ে আসে। যেমন ধরা যাক, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নির্যাতিত হয়েছেন যে মেয়েরা, তাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দেওয়া। কাজটা যারা করেছিলেন তাদের উদ্দেশ্য যে মহৎ ছিল সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সে-উদ্দেশ্য অর্জিত হয়নি বরঞ্চ হিতে বিপরীত হয়েছে, বীরাঙ্গনা উপাধি গৌরবের স্মারক হয়নি, উল্টো নতুন অপমানের কারণ হয়েছে। নির্যাতিত মেয়েরা ওই উপাধি অবলুপ্ত করতে পারলে বাঁচেন। পুরুষতান্ত্রিকতার কারণেই ব্যাপারটা ঘটেছে; পীড়িত মেয়েরা সম্মান তো দূরের কথা, সহানুভূতিও পায়নি, পাত্র হচ্ছেন বিড়ম্বনা ও বিদ্রুপের।
পুরুষতান্ত্রিকতা মেয়েদের নানাভাবেই লাঞ্ছিত করে, এমনকি যখন ভাব করে সম্মান দেখাবার তখনো করে। ধরা যাক, বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার ব্যাপারটা। ভঙ্গিটা এই রকমের যে, নারীকে উচ্চমূল্য দিচ্ছে, আসলে যা করছে তা হলো আরেক ভাবে, প্রকাশ্যেই নারীকে বস্তু করে তুলছে গণ-উপভোগের। যারা এর আয়োজন করে তারা ব্যবসায়ী। নারী ব্যবহৃত হচ্ছে পণ্য হিসেবে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীন আধুনিক হওয়ার নামে কোনদিকে যে নেমে যাচ্ছে এবং সেখানে মেয়েরা কোন ধরনের ‘স্বাধীনতা’ যে ভোগ করছে তা বিলক্ষণ টের পাওয়া যাচ্ছে সেখানে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানের ‘মহতী’ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। চীনে যে ধর্ষণ, নারীদেহ বিক্রয়, এইডস ইত্যাদি মহামাররী আকার ধারণ করেছে তা নিশ্চয়ই মেয়েদের স্বাধীনতা-বৃদ্ধির নিদর্শন নয়, লাঞ্ছনার স্বাক্ষর বটে। পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিকতার অভাবের কারণেই এমনকি আধুনিক নারীবাদীদের একাংশও বলে যে তারা মানুষের মতো হওয়াটাকে লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত না করে পুরুষের মতো হওয়াটাকেও যথেষ্ট পাওয়া বলে মনে করে।
পুরুষতান্ত্রিকতার নিষ্ঠুরতা ধনীদের অত্যাচারের তুলনায় কম নয়। বাংলাদেশের সমাজে এখন উভয় প্রকার অত্যাচার বড়ই প্রবল। এ দেশ এখন দুর্নীতিতে সারা পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। সেটা একটা ব্যাপার; নিষ্ঠুরতার দিক থেকেও যে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে তা বলা যাবে না। ডাকাতি এ দেশে কবে না ছিল। কিন্তু কবে, কখন, কে শুনেছে যে সংখ্যালঘু সাধারণ গৃহস্থ বাড়িতে ডাকাতরা হানা দিয়ে বাড়ির সব মানুষকে একত্রে পুড়িয়ে মেরেছে। খুন খারাবি আগেও ছিল। কিন্তু আগে কখনো খুন করার পর পারিবারিকভাবে লাশটিকে টুকরো টুকরো কাটার খবর পাওয়া যায়নি। সাম্প্রদায়িক ঝগড়া ফ্যাসাদও নতুন নয়, কিন্তু আমাদের চতুর্দশ পুরুষের কেউ এমনটা দেখেনি যে, একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ ভিন্ন মতাবলম্বী নিরীহ মানুষদের মসজিদ দখল করার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে। সমস্তটাই ঘটছে বিষয়-সম্পত্তির লোভে। বাঁশখালীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে পোড়ানো হয়েছে এই আশায় যে তারা দেশত্যাগ করবে এবং এখন তাদের জায়গাজমি দখল করে নেওয়া সম্ভব হবে। ঢাকায় যে গৃহবধূ প্রেমিকের সাহায্যে স্বামীকে হত্যা করে তার লাশ টুকরো টুকরো করেছিল সে যে কেবল প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আশার দ্বারা উদ্দীপ্ত ছিল তা নয়, তার গোপন আশা ছিল স্বামীর টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়া। ঢাকায় আহম্মদিয়া মসজিদ যারা দখল করতে চেয়েছিল তাদের অনুপ্রেরণাটাও একই রকমের বৈষয়িক বটে।
নিষ্ঠুরতা বাঙালি ১৯৪৭-এর আগের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দেখেছে; তারপরও দাঙ্গা হয়েছে, সব ঘটনাই বর্বরতার পরিচয় বহন করেছে। কিন্তু একাত্তরে যে নিষ্ঠুরতা সে প্রত্যক্ষ করেছে তেমনটি আগে কখনো তাকে সহ্য করতে হয়নি। যুদ্ধমাত্রই ধ্বংসের ব্যাপার, কিন্তু অমন ধ্বংস ছিল অকল্পনীয়। বাঙালি নিজেও যে তখন নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেয়নি তা নয়, নিরীহ অবাঙালি নিধন সেও করেছে, যদিও পরিমাণে তা অল্প বটে। কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে এটা যে, যে নিষ্ঠুরতা সে দেখেছে এবং যাতে সে অংশ নিয়েছে তা নতুন সৃষ্টিশীলতার নিচে যে চাপা পড়ে যাবে তেমনটা ঘটেনি। যে নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটল একাত্তরে সে-রাষ্ট্র হিংসা ভুলল না। দমন চালাল। রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার তারা কি করে ভুলবে যারা ভুক্তভোগী? বামপন্থিদের রাষ্ট্র যেভাবে নিগৃহীত করেছে তা তুলনাবিরহিত। বামপন্থিদের একাংশও আবার নিজেরাও লিপ্ত ছিল শ্রেণি সংগ্রামের নামে গলাকাটার রাজনীতিতে। মূলধারার রাজনীতি যারা করেছে তারা ক্রমশ লুণ্ঠনবাদী হয়ে উঠেছে। উৎপাদন বা সৃষ্টিতে তাদের আগ্রহ দেখা যায়নি, উন্মত্ত উৎসাহ প্রকাশ পেয়েছে জবরদখলে। যে ভাষায় তারা কথা বলে তা ভদ্র তো নয়ই, একেবারেই ফ্যাসিবাদী বটে। বীরাঙ্গনারা যে তাদের উপাধি নিয়ে বিব্রত তা সামাজিক নিষ্ঠুরতার কারণেই। সমাজে ন্যায় বিচার নেই, আদালতে নেই, আদালতের বাইরেও নেই। পুলিশবাহিনী পরিণত হয়েছে নিষ্ঠুরতার জ্বলন্ত প্রতিভূতে। সেনাবাহিনী একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে এবং ক্ষেত্র বিশেষে সন্ত্রাসীদের দমন করার কাজে নিয়োজিত হয়ে নিরীহ মানুষের জন্য যন্ত্রণার কারণ হয়েছে। বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা হ্রাসের ফলে অন্তর্গত নিষ্ঠুরতা প্রবল হয়ে গণপিটুনির রূপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশ যে দুর্নীতিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এটা বাইরের কাউকে বলে দিতে হয় না, দেশবাসী নিজেরাই তা জানে প্রতিদিন জানতে বাধ্য হয়। দুর্নীতির সূচনা একেবারে শুরু থেকেই। আগে যে ছিল তা নয়, আমরা নতুন সূচনার কথাটা ভাবছি।
একাত্তরে খাঁটি রাজাকার ছিল এমন মানুষদের মধ্যে রাঘববোয়াল যারা পুনর্বাসিত হয়ে গেল, অর্থ ও সামাজিক প্রতিপত্তির জোরে; প্রত্যক্ষে মুক্তিযুদ্ধের আশপাশেও ছিল না, এমন লোকেরা মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র সংগ্রহ করে চাকরিসহ নানা সুযোগ করতলগত করে নিল। কথা ছিল বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র; ঘটনা ঘটল উল্টো দিকে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আরও গভীর ও শক্ত হয়ে উঠল। আর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা হচ্ছে দুর্নীতির আখড়া, সেখানে আইন তৈরি হয় সুবিধাপ্রাপ্তদের জন্য এবং বেআইনি কাজ করে কেবল পারই পায় না, ধনী হয় তারাই যাদের টাকা আছে। ওই ব্যবস্থার আবরণটা ভদ্রতার, বাস্তবতাটা জঙ্গলের।
নিষ্ঠুরতা ও দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে এখন কোনো মানুষই আর নিরাপদ নয়। দেয়াল উঠছে, পাহারাদার বসানো হচ্ছে, কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা মোটেই বৃদ্ধি পাচ্ছে না, বরঞ্চ নেমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে। এমনকি চলাফেরার যে স্বাধীনতা সেটাও নেই। মেয়েরা ভয় পায় দুর্বৃত্তদের; সবাই আতঙ্কে থাকে দুর্ঘটনার জন্য। যানজট ও পরিবেশ দূষণ পদে পদে বাধা দেয় চলাচলে। শাসকরা বলেন, চুম্বক রেলওয়ে চালু করবেন, সাধারণ মানুষ বলে চুম্বকের দরকার নেই, সাধারণ যানবাহনের ব্যবস্থা করুন, না পারলে হেঁটে নিরাপদে চলাফেরার নিশ্চয়তাটুকু অন্তত দিন। বলা বাহুল্য সেটাও পাওয়া যায় না। এ দেশে চিকিৎসক আছেন, কিন্তু চিকিৎসা নেই; বিদ্যালয় আছে, কিন্তু শিক্ষা নেই।
একাত্তরে এবং তারপর অল্প কিছুদিন হলেও সারা বিশ্বে বাংলাদেশের স্থানটি ছিল সম্মানের। বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিয়ে লোকের বুক ফুলতো গর্বে, এখন এই পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে লজ্জার। স্বাধীনতার জন্য বাঙালি রক্ত দিয়েছে, মূল্য দিতে কার্পণ্য করেনি, কিন্তু স্বাধীনতা সে পায়নি। রাষ্ট্র তাকে স্বাধীনতা দেয়নি, কেননা রাষ্ট্র নিজেই স্বাধীন নয়, সে পরিণত হয়েছে বিশ্ব পুঁজিবাদের দাসানুদাসে। ঋণে সে জর্জর; পরামর্শ শুনতে শুনতে হয়রান। দেশের সম্পদ যা আছে বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে এ-রাষ্ট্রের ভয়ংকর আগ্রহ। আর নিরাপত্তা? সে তো দিচ্ছেই না। কর্মের সংস্থান হচ্ছে না। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে তো বাড়ছেই।
মানুষের আস্থা গেছে নষ্ট হয়ে। আগের রাষ্ট্রগুলো ছিল ঔপনিবেশিক, তারা ছিল ঘোষিত রূপেই পীড়নকারী; তাদের প্রতি মানুষের আস্থা থাকার কোনো কারণই ছিল না। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রও তো আস্থা অর্জন করতে পারেনি মানুষের। তার আচরণ মিত্রের নয়, তার চেহারা শত্রুর মতো ভয়ংকর। রাষ্ট্রের ওপর যখন মানুষ আস্থা হারায় তখন আর কার ওপর সে আস্থা রাখবে। রাষ্ট্রই তো সমস্ত কিছুর নিয়ন্ত্রক, তার হাতেই তো ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি।
সমাজ আছে। কিন্তু এ সমাজ সেই পুরনো সমাজই। মানুষকে সে আশ্রয় দেয় না, দুর্বলকে সে পীড়ন করে, লালন করে প্রবলকে। সমাজে ভালো মানুষ আছে নিশ্চয়ই, তাদের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু তারা চোখে পড়ে না, তারা কার্যকরও নয়। খারাপ লোকেরাই দাপট দেখায়, তারাই মালিক, তারাই শাসক। অনুসরণ করার এবং ভরসা রাখার দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না। মানুষ আশা রাখবে কেমন করে, কোথায় তার ভরসা?
সার কথাটা হলো এই যে, স্বাধীনতা আসেনি। কিন্তু তাকে আনার জন্য মূল্য আমরা কম দিই-নি। মূল্য আরও দিতে হবে, নইলে স্বাধীনতা পাওয়া যাবে না। সে মূল্যটা কী? এক কথায় সেটি হচ্ছে আন্দোলন। আমরা রক্তদানের কথা শুনি। রক্ত তো দিয়েছি, অহরহ দিচ্ছি। কিন্তু তাতে লোকসান ছাড়া লাভ নেই। যেটা প্রয়োজন তা হলো অব্যাহত আন্দোলন। স্বাধীনতার জন্য এবং মুক্তির লক্ষ্যে। বলা বাহুল্য, মুক্তি স্বাধীনতার চেয়েও বড়; বলা যায় প্রকৃত স্বাধীনতার মুক্তি না-এলে আসে না। এই আন্দোলনে প্রাণদানটা বড় ব্যাপার নয়। প্রাণ মানুষের একটাই, একবার দিলে আবার পাওয়া যাবে এমন কোনো উপায় নেই। বড় ব্যাপার হচ্ছে, আন্দোলন, আন্দোলনই পারে প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখতে, তাকে প্রাণবন্ত করতে।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
