বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের ল্যাসিক মেশিনটি দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বিকল অবস্থায় রয়েছে। বরিশাল বিভাগের কোটি কোটি মানুষ আধুনিক চোখের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি ক্লিনিক বা ঢাকার বড় হাসপাতালে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসা ব্যয় যেমন বাড়ছে তেমনি দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষকে ভুগতে হচ্ছে। চোখের জটিল সমস্যাগুলোর চিকিৎসা বাইরে করতে হচ্ছে, যেখানে প্রতি অপারেশনে কয়েকগুণ বেশি খরচ গুনতে হয়। ল্যাসিক মেশিনটির পাশাপাশি চোখের ছানি অপারেশনের জন্য ব্যবহৃত ফ্যাকো মেশিনটিও সাত মাস ধরে অচল, যা রোগীদের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত অত্যাধুনিক লেজার অ্যাসিস্টেড ইন সিটু কেরাটোমাইলিউসিস, সংক্ষেপে ল্যাসিক মেশিনটি সিএমএসডি থেকে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু মেশিনটি চালানোর জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি। মাত্র সাত দিনের একটি প্রশিক্ষণ দিয়ে দায় সেরেছিল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। সূত্র জানায়, ল্যাসিক মেশিনটি স্থাপন করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। শুরুতে ভালোভাবে কাজ করলেও ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে এটি বিকল হয়ে যায়। এরপর একাধিকবার মেরামত করেও মেশিনটি দীর্ঘস্থায়ীভাবে সচল রাখা যায়নি। ২০১৯ সাল থেকে এটি পুরোপুরি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।
হাসপাতালের কর্মীরা বলছেন, এক সময় রোগীদের চাপ এতটাই বেশি ছিল যে, বারান্দা পর্যন্ত ভিড় দেখা যেত।
এখন ল্যাসিক মেশিন এবং ফ্যাকো মেশিন বিকল থাকায় বড় ধরনের কোনো চিকিৎসা এখানে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
চিকিৎসা নিতে আসা হোসনেয়ারা বেগম বলেন, ‘গত বছর ছানি অপারেশন করেছিলাম। এখন আবার চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিন্তু ডাক্তার বলেছেন, বাইরে গিয়ে অপারেশন করাতে হবে, কারণ মেশিন নষ্ট হয়ে আছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের দুই নার্স জানিয়েছেন, অন্যান্য ওয়ার্ডের তুলনায় চক্ষু বিভাগে রোগীর চাপ এখন অনেক কম। মেশিন বিকল থাকায় গুরুত্বপূর্ণ অনেক চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকায় রোগীরা বিকল্প খুঁজছেন।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে যদি এসব মেশিন সচল থাকত, তবে গরিব রোগীরা কম খরচে উন্নত চিকিৎসা পেতে পারতেন। তাই ল্যাসিক মেশিন ও ফ্যাকো মেশিন মেরামত এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে বরিশাল বিভাগসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা সংকট নিরসন হবে বলে মনে করেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।
চক্ষু বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ল্যাসিক মেশিনটি মেরামতের জন্য অন্তত ১ কোটি টাকা প্রয়োজন। শুধু মেরামত করলেই চলবে না, এটি চালু রাখতে প্রিমিক্স গ্যাস, প্রিপেইড কার্ড এবং প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধান প্রয়োজন, যা আমাদের হাসপাতালে নেই।’ তিনি বলেন, ‘এই মেশিনের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ চোখের উন্নত চিকিৎসার সুবিধা পেতেন। অনেক শিক্ষার্থী ল্যাসিক ট্রিটমেন্ট নিয়ে সামরিক বাহিনীর উচ্চপদে কাজ করছেন। অথচ ছাত্রজীবনে তারা ঠিকমতো দেখতে পেতেন না।’
সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনির বলেন, ‘শেবাচিম হাসপাতাল দেশের অন্যতম প্রাচীন হাসপাতাল হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি পিছিয়ে রয়েছে। এখানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং জনবলের অভাব রয়েছে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ফাইল প্রস্তুত করেছি। মন্ত্রণালয় ও সিএমএসডি-তে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি।’
