পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্বের খবর পেলেই ছুটে যান ওবায়দুল কাদের। এরপর জমির মূল মালিকের সঙ্গে বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ নারীর সঙ্গে ভাব জমান। ধীরে ধীরে ওই নারীর ‘অতি আপনজন’ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন ওবায়দুল। এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষকে মামলা মোকদ্দমায় জড়িয়ে ‘সাইজ’ করার বলে জমির মালিকের যাবতীয় দলিল দস্তাবেজ হাতিয়ে নেন তিনি। এরপর কৌশলে ‘বায়নানামা’ দলিল সৃষ্টি করে নিজেই ওই নারীর সম্পত্তির মালিক বলে দাবি করে বসেন ওবায়দুল কাদের।
সম্প্রতি কথিত এই প্রতারক ও তার এক সহযোগীর বিরুদ্ধে আদালতে হওয়া একটি মামলা তদন্ত করতে গিয়ে চট্টগ্রামের হালিশহরে কীভাবে বয়োবৃদ্ধ অবসরপ্রাপ্ত এক স্কুল শিক্ষিকার ছয়তলা ভবন হাতিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকার তথ্য—প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। অভিযুক্ত প্রতারক ওবায়দুল কাদেরের বাড়ি নোয়াখালী জেলার কোম্পানিগঞ্জ থানাধীন পাটোয়ারী হাট চর কাঁকড়া গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত আবদুল হালিম। তার সহযোগি মো. বেলায়েত হোসেনও একই এলাকার মৃত আবদুল হালিমের ছেলে।
প্রতারণার মাধ্যমে উক্ত নারীর ৬ কোটি টাকা মূল্যের ছয়তলা ভবন আত্মসাতের চেষ্টার প্রমাণ পেয়ে ওবায়দুল ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি দন্ডবিধির ৪০৬/৪২০/৫০৬/৩৪ ধারায় আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেছে পুলিশ। চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট চতুর্থ আদালতে ওই দুই প্রতারকের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদনও জমা দিয়েছেন নগরের হালিশহর থানার উপপরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম।
শুধু চট্টগ্রাম নয়, একই কায়দায় ঢাকার বাড্ডা থানা এলাকায় ফ্ল্যাট বাড়ি আত্মসাতের অভিযোগ ঢাকার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হওয়ায় প্রতারক ওবায়দুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি সাজা পরোয়ানা জারি করেছেন ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত।
প্রতারক ওবায়দুল কাদেরকে পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজছে বলে জানিয়ে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্পত্তি নিয়ে মা—ছেলের দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়েছে প্রতারক ওবায়দুল কাদের। তাকে আমরা খুঁজছি। তার বিরুদ্ধে প্রতারণা করে সম্পত্তির আত্মসাত চেষ্টার একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে।’
জানা গেছে, ভুক্তভোগী অবসরপ্রাপ্ত ওই স্কুল শিক্ষিকার নাম সাহিদা দেলোয়ার (৬৫)। তার মালিকানাধীন ভবনটি চট্টগ্রাম নগরের উত্তর হালিশহর মৌজার হালিশহর হাউজিং এস্টেটে (প্লট নং—১৮, লেইন নং ১৫, রোড নং ২ ব্লক সি) নামজারি জমাভাগ বিএস ০৮/৫৪৯ নং খতিয়ানের বিএস ২৬৬০ দাগের আন্দর ০.০৪৮০ একর বা ২.৮৮ কাঠা। তার স্বামী মৃত দেলোয়ার হোসেন। তিনি ‘ট্রাস্টি ট্রেডিং’ নামের একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন। ২০১৪ সালের ১৮ আগস্ট তিনি (দেলোয়ার) মারা যান।
জানা গেছে, উক্ত জমি ১৯৮৬ সালের ১ জুন রেজিস্ট্রিকৃত ৩৮৮৬ নং সাফ কবলা মূলে এবং ১৯৯৪ সালের ১৯ সেপেটম্বর রেজিস্ট্রিকৃত ১১৮৩ নং ইজারা দলিল মুলে ক্রয় করেন সাহিদা। ক্রয় করা ওই জমিতে ছয়তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করে ৩৮ বছর ধরে ভোগ দখল করে আসছেন। দাম্পত্য জীবনে নিঃসন্তান হওয়ায় আপন বোনের গর্ভজাত ছেলে মেহেদী হোসেনকে দত্তক নিয়ে লালন পালন করেন সাহিদা। প্রকৌশল বিদ্যায় পিএইচডি করার জন্য মেহেদীকে জার্মানি পাঠান সাহিদা।
জানা গেছে, স্বামী মারা যাওয়ার পর সাহিদার মালিকানাধীন ভবন ও স্বামীর রেখে যাওয়া স্থাবর ও অস্থার সম্পত্তির ওপর কুনজর পড়ে পালক ছেলে মেহেদী, তার মা পারভীন আক্তার এবং তার শ্বশুর—শাশুড়ির। এক পর্যায়ে এসব সম্পত্তি আত্মসাতের ষড়যন্ত্র শুরু করে তারা। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সাহিদার সম্পত্তির দলিল ও ব্যাংক চেক বই নিয়ে নেন মেহেদী। এরপর সাহিদার ছয়তলা ভবন আত্মসাতের উদ্দেশ্যে সাহিদার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা (৩৩২/২০২১) করেন মেহেদী।
২০২০ সালের ৬ ডিসেম্বর সাহিদাকে তার ভবন থেকে বের করে দেন পালক ছেলে মেহেদী। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সাহিদার পাশে এসে দাঁড়ান ‘প্রতারক’ ওবায়দুল কাদের ও তার সহযোগী বেলায়েত। এক পর্যায়ে সাহিদাকে নিজের হেফাজতে নেয় ওবায়দুল কাদের। পালক ছেলে মেহেদী হোসেন শাওন কর্তৃক ভবন আত্মসাতের ষড়যন্ত্রের কথা ওবায়দুলকে জানান সাহিদা। পারিবারিক সম্পত্তির বিষয় নিয়ে সাহিদার সাথে পালক ছেলে মেহেদীর মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। মেহেদীর বিরুদ্ধে ২০২১ সালে চট্টগ্রামের যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা (১১৯) করেন সাহিদা।
এরপর সাহিদার বিরুদ্ধে পালক ছেলের কথিত ‘ষড়যন্ত্র’ থেকে রক্ষা এবং ভবনের ভাড়া তোলার ব্যবস্থা করে দেওয়ার নামে সাহিদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় প্রতারক ওবায়দুল কাদের ও বেলায়েত হোসেন। এক পর্যায়ে আইনগত সহযোগিতা পেতে সাহিদা পাশে থাকার কথাও জানান ওবায়েদুল কাদের। এদিকে ভবনটি বিক্রির উদ্যোগ নেন সাহিদা। আর এই সুযোগে প্রতারণার ফাঁদ পাততে শুরু করেন ওবায়দুল কাদের ও তার সহযোগি বেলায়েত। ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের সদর রেকর্ড রুমে সাহিদাকে নিয়ে গিয়ে ভবনের ভাড়া আদায়ের ক্ষমতা প্রদানের কাগজপত্রে সই নেওয়ার কথা বলে ৬ কোটি টাকা দামের ভবনটি ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্য ধার্য করে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা পরিশোধ মর্মে দেখিয়ে সাহিদার কাছ থেকে একটি বায়নানামা দলিল সম্পাদন করে নেন প্রতারক ওবায়দুল কাদের।
সাহিদাকে সহায়তার নামে তার (সাহিদা) মালিকানাধীন ভবনের একটি ফ্ল্যাট বসবাস শুরু করেন ওবায়দুল ও তার সহযোগি। ২০২১ সাল থেকে ভবনের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে ভাড়া বাবদ ২২ লাখ টাকা তুলে আত্মসাত করেন ওবায়দুল কাদের। পালক ছেলে মেহেদীর বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার কথা বলে সাহিদার কাছ থেকে আরও ছয় লাখ টাকা নেন ‘প্রতারক’ ওবায়দুল কাদের। এক পর্যায়ে ভাড়াটিয়াদের থেকে ভাড়া তুলে নিজের নামে রশিদ ইস্যু করাও শুরু করেন ওবায়দুল। পরে এই টাকা ফেরত চাইলে সাহিদাকে হত্যার হুমকিও দেন ওবায়দুল।
এই প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী নারী সাহিদা দেলোয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওবায়দুল একজন বড়মাপের প্রতারক। সে আমাকে সহায়তার কথা বলে আমার সাথে প্রতারণা করে দলিল করেছে। আমি আমার ভবনটি পালক ছেলে এবং প্রতারক ওবায়দুলের কাছ থেকে উদ্ধার করে বিক্রি করতে চাই।’
দাঁড়িয়ে থাকা করিমনে ট্রাকের ধাক্কা, প্রাণ গেল ৩ শ্রমিকের
পানির ট্যাংকের ভেতরে লুকিয়েও রক্ষা পেলেন না আওয়ামী লীগ নেত্রী
বোনের বিয়ে খেতে এসে ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার
একনজরে আজকের দেশ রূপান্তর (২৭ ডিসেম্বর)