চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার বিএনপি নেতাকর্মীরা গত দেড় দশক এলাকায় আসতে পারেননি। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর দাপটে ঘরবাড়িছাড়া হয়েছিলেন। তবে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন বিএনপি নেতাকর্মীরা বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ হয়ে দখল আর আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিদিনই সংঘাতে জড়াচ্ছেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারীদের মধ্যে প্রতিদিনই ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা। কখনো গোলাগুলি, কখনো মারামারি, কখনো প্রকাশ্যে তুলে নিয়ে মারধরের ঘটনায় জড়াচ্ছেন দুপক্ষের অনুসারীরা। গেল প্রায় চার মাসে এই উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত তিন ডজন সংঘর্ষ, হামলা ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ গত শনিবারও উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের ব্রাহ্মণহাট বাজারে বিএনপির পাঁচ নেতাকর্মীকে মারধরের পর তাদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ আছে, গোলাম আকবর খন্দকারের অনুসারীরা এ হামলা চালিয়েছে।
গত ১৫ ডিসেম্বর উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের সোমবাইজ্জে হাট এলাকায় আনোয়ার হোসেন (৩৮) নামে এক যুবদল নেতাকে গুলি করে পালিয়ে যায় অস্ত্রধারীরা। এর আগে ৬ ডিসেম্বর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের সামনে বিজয় মেলা নিয়ে বিরোধে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। ২৯ নভেম্বর দলীয় বিরোধে তিন যুবককে অপহরণ করা হয়। ১৬ নভেম্বর নোয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান খায়েজ আহমদের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। আগের দিন ১৪ নভেম্বর একই ইউনিয়নের নিরামিশপাড়ার আসদ আলী মাতব্বরপাড়া মসজিদ এলাকায় মুখোশধারীর গুলিতে ১২ থেকে ১৫ জন গুলিবিদ্ধ হন। ১০ নভেম্বর সকালে উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত খায়েজ আহমদের বাড়িতে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ছররা গুলিতে দুই ব্যক্তি আহত হন। তারা দুজনই বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। ৮ নভেম্বর বিকেলে উপজেলার পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের ইসলামাবাদ গ্রামে আরব আমিরাতপ্রবাসী জানে আলমের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, চাঁদা না দেওয়ায় বাড়িতে হামলা চালানো হয়।
১২ অক্টোবর বিকেলে নোয়াপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নিরামিশ গ্রামে দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে যুবদলের দুই কর্মী আহত হন। ২৮ সেপ্টেম্বর ভোরে দুই ছাত্রদল নেতাকে তুলে নিয়ে মারধরের পর মৃত ভেবে নদীর চরে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় রাউজান থানায় বিএনপির এক নেতার ১৬ জন অনুসারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের পথেরহাট বাজারে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে মুহাম্মদ ফরিদ নামে যুবদলের এক নেতা গুলিবিদ্ধ হন। ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় উরকিরচর ইউনিয়নের জিয়া বাজার এলাকায় গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সমর্থনে ডাকা পথসভা শেষ করে ফেরার পথে হামলায় আহত হন বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ১০ নেতাকর্মী। ১৮ আগস্ট দুই পক্ষের সংঘর্ষে আহত হন অন্তত ১২ জন। দলীয় কর্মীদের দাবি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারীরা ওই হামলা চালান।
এ বিষয়ে কথা বলতে, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও গোলাম আকবর খোন্দকারকে ফোন করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাউজানে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। ভুক্তভোগী যে কাউকে আইনি সহায়তা দিতে প্রস্তুত পুলিশ।’ তিনি বলেন, ‘এখন তো আওয়ামী লীগ নেই। বিএনপি নিজেরাই মারামারি করছে। তবে পুলিশ দুই পক্ষকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে।’
